তারাপদ হেসে বলল, “এটা কি আপনার ম্যাজিশিয়ানের টেকনিক?”
“খানিকটা তো বটেই,” বলে আবার হাত তুলে একটা জায়গা দেখালেন, “ওই যে দেখছ জায়গাটা, ওখানে যত রাজ্যের গাছের শুকনো পাতা ঝেটিয়ে এনে জমানো হয়েছে। আরও দু-চার ঝুড়ি কাল জমানো যাবে। খড় রেডি। কেরোসিন তেল মজুত। আর তুমি তো অন্য মালমশলাও এনেছ!” অন্য মালমশলা বলতে খানিকটা গন্ধক।
বাগান থেকে বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে তারাপদ বলল, “সবই না হয় হল। আপনি লঙ্কাদহন পর্বটা সারলেন, কিন্তু যার জন্য এত–সেই ভদ্রলোক যদি ধরা না দেন!”
“না দিলে করার কিছু নেই। আমরা যশোদাবাবুকে বলব, আপনারা থানা-পুলিশ করুন, আমাদের দিয়ে হল না।”
তারাপদ যশোদাজীবনকে দেখতে পেল, বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। বলল কিকিরাকে।
কিকিরা গলা নামিয়ে বললেন, “তারাপদ, কাল তুমি যশোদাবাবুর ওপর নজর রাখবে। উনি যেন এই বাড়ির চৌহদ্দির বাইরে যেতে না পারেন। এমনিতেই ভদ্রলোক ভ্যাবাচাকা খেয়ে গিয়েছেন। মগজে কিছুই ঢুকছে না ওঁর। তার ওপর কাল সন্ধের ঝোঁকে যখন বাড়ির চারপাশে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠবে, উনি বোধ হয় পাগলামি শুরু করবেন।”
তারাপদ সেকথার কোনও জবাব দিল না। শুধু বলল, “হীরালালবাবু এখানেই কাছাকাছি কোথাও আছেন বলে আপনার ধারণা। যদি না থাকেন?”
“না থাকেন? দ্যাখো তারাবাবু, আমি ফিশিং এক্সপার্ট নই, তবে শুনেছি এক-একরকম মাছের জন্যে এক-একরকম চার কাজে লাগে। বঁড়শিরও হেরফের হয়। হীরালালবাবুর এই কৃষ্ণধামই আমার টোপ। এই টোপে হয় তিনি ধরা দেবেন, না হয় আমরা হার মেনে নিয়ে ফিরে যাব।…যাক গে, চাঁদুকে সব ভাল করে বুঝিয়ে দিয়েছ তো?”
“দিয়েছি। ও জায়গাটা আন্দাজ করতে পেরেছে। এদিকে একবার ওদের ক্যাম্প বসেছিল। ডাক্তারদের ক্যাম্প।…ও ঠিক সময়ে হাজির হয়ে নিজের পজিশন নেবে।” তারাপদ হাসল।
“ভাল কথা। দেখা যাক কী হয়?” বারান্দায় উঠে এলেন কিকিরা। যশোদাজীবন দাঁড়িয়ে আছেন। দেখলেন তারাপদকে। কিকিরা হেসে বললেন, “যশোদাবাবু, আমার চেলা এসে গিয়েছে। বলেছিলুম না, সময় মতন চলে আসবে।”
যশোদা বললেন, “দেখেছি ওঁকে। আসুন, চা তৈরি, ডাকতেই এসেছিলাম আপনাকে।”
“চলুন।”
.
॥ ৬ ॥
দূর থেকে দেখলে মনে হবে, সত্যি সত্যি কৃষ্ণধামে আগুন লেগে গিয়েছে। কম্পাউন্ড-ওয়ালের কাছাকাছি মাটি খুঁড়ে করা গর্তগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া
শুকনো খড়, গাছের পাতা জ্বলে উঠেছে দাউদাউ করে। ভাদ্রমাসের বাতাসে দমকা নেই, তবু যেটুকু হাওয়া দিচ্ছিল ফাঁকা মাঠে তাতেই শিখা উঠেছে আগুনের, ধোঁয়ায় ভরে যাচ্ছে আশপাশ। বোঝা যাচ্ছে না, একটা গর্তের সঙ্গে অন্য গর্তের হাত কয়েক ফাঁক আছে। এই মাঠে, দু’-পাঁচটা ঝোঁপঝাড় গাছপালার মধ্যে সামান্য আগুনেই কম হলকা ছড়ায় না। আর এই সন্ধেবেলার মুখেই ঝাপসা জ্যোৎস্নার মধ্যে কৃষ্ণধামের আগুন কার না নজরে পড়বে। কাছাকাছি গাঁ-গ্রাম নেই, তবু সামান্য তফাতে দু-চার ঘরের বসতি তো আছেই, আছে এক-আধটা ছোট নার্সারি বাগান। লোকজন সাকুল্যে হয়তো দশ-পনেরোজন। প্রথমটায় হয়তো এরা হকচকিয়ে গিয়েছিল। তারপর মাঠ ভেঙে ছুটে আসতে লাগল।
যশোদাজীবন হতবাক! কী যে হচ্ছে তিনি বুঝতেই পারছিলেন না। ভয়ে আতঙ্কে দিশেহারা অবস্থা তাঁর। কৃষ্ণধামের কাজের লোক তো তিনটি–তারাও বোকার মতন এই অগ্নিকাণ্ড দেখছিল।
ঠিক যে কতক্ষণ সময় কাটল, বোঝা গেল না। হঠাৎ চন্দনের গলা পাওয়া গেল, চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে, “তারা, ধরে ফেলেছি, শিগগির আয়, ধরা পড়ে গিয়েছেন।”
তারাপদ ফটকের দিকে দৌড়ে গেল। খোলাই ছিল ফটক। চন্দনকে দেখতে পেল তারাপদ, বুড়োমতন এক ভদ্রলোককে জাপটে ধরে রেখেছে চন্দন।
হীরালাল।
.
বারান্দায় একটা চেয়ার বসানো হল হীরালালকে। ভদ্রলোকের যেন হুঁশ নেই। কী দেখছেন, কাদের দেখছেন–বোঝাই যায় না। কাঁপছেন তখনও। কপালে ঘাম। চন্দন একবার নাড়ি দেখল ভদ্রলোকের। বলল, “আগে জল দিন ওঁকে, একটা পাখা এনে বাতাস করুন কেউ।”
যশোদা প্রায় কেঁদে ফেললেন, “বড়বাবু!”
জল এল, পাখাও এল।
হীরালাল জল খেলেন, চোখেমুখে দিলেন। একজন পাখার বাতাস করতে লাগল।
আগুন ধরেছে দেখে যারা ছুটে এসেছিল তারা দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ, তারপর যশোদার কথায় চলে গেল একে একে। কৃষ্ণধামের গায়ে কোথাও আগুনের চিহ্ন নেই, বাগান ছাড়িয়ে পাঁচিলের গায়ে গায়ে যা আগুন জ্বলছে তখন, তাও নিভে এসেছে বারোআনা।
হীরালাল কাশছিলেন। যশোদা বড়বাবুর জন্যে লবঙ্গ আনতে বললেন।
প্রায় মিনিট পনেরো পরে হীরালাল খানিকটা সুস্থ হলেন। যশোদাকে বললেন, “এসব কী? এঁরা কারা?”
কিকিরাই কথা বললেন, “আমরা আপনার খোঁজেই এসেছিলাম। আমি কিঙ্করকিশোর রায়, লোকে বলে কিকিরা। এরা দু’জন আমার চেলা, তারাপদ আর চন্দন।…আমরা নিজের গরজে আসিনি মশাই, যশোদাবাবু আমার চেনা লোক, উনিই আমায় ধরে এনেছিলেন।”
“আপনারা পুলিশ…?”
“না। আপনি যা করেছিলেন তাতে থানা-পুলিশ করা যেত। করা হয়নি। আপনি বুড়োমানুষ, আপনার মতন মানুষের কাণ্ডজ্ঞান থাকার কথা। তবু এমন ভীমরতি ধরল কেন? আপনি কি জানেন না, আত্মহত্যা করার শাসানিও পুলিশ ভাল নজরে দেখে না। কেন আপনি এসব থিয়েটার করতে গিয়েছিলেন! কেন?”
