তারাপদ বলল, “আপনি ওপরে লোহার ঘোরানো সিঁড়ির সামনে লবঙ্গ পেয়েছেন সার, আমি সিঁড়ির নীচের ধাপেও গোটা দুয়েক পেয়েছি।”
“ভদ্রলোক যাওয়ার আগে ঠাকুরঘরে ঢুকেছিলেন। হয়তো ঠাকুর প্রণাম করতে। তারপর কাঁচের আলমারি থেকে এক মুঠো লবঙ্গ তুলে নিয়ে সিঁড়ির পথ ধরে কলাঝোঁপ আর বাঁশঝাড়ের আড়াল দিয়ে পালিয়ে গিয়েছেন কোথাও।”
তারাপদ মাথা নাড়ল। বলল, “বেশ বুদ্ধি করেই পালিয়েছেন। যশোদাবাবুকে কোন এক নার্সারি দেখে আসতে বলে, কাজের লোকদের চোখে ধুলো দিয়ে দিব্যি গা-ঢাকা দিলেন! কিন্তু সার, ওই বুড়োমানুষ কোথায় যেতে পারেন! এখানে কাছাকাছি লুকিয়ে থাকার জায়গা কোথায় পাবেন? সবই তো ফাঁকা।”
কিকিরা মাথা দোলাতে লাগলেন। ভাবছিলেন। পরে বললেন, “শোনো বাপু, আমাকে একটু ভাবতে দাও। হীরালাল আত্মহত্যা করেননি বলেই আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু তিনি কোথায় লুকিয়ে আছেন বুঝতে পারছি না। আরও বুঝতে পারছি
, ভদ্রলোক কেন, কীসের জন্যে এই নাটক করছেন! বাড়ির গণ্ডগোল একটা কারণ হতে পারে। সেই গণ্ডগোল কেমন? কে বা কারা করেছে? কেনই বা?…তা আপাতত আমরাও আর এখানে থাকছি না। কালই ফিরে যাব কলকাতায়। আবার আসব আসছে হপ্তায়। শুক্র বা শনিবার। চাঁদুও ততদিনে ফিরে আসছে। তখন একবার চেষ্টা করা যাবে।”
তারাপদ বলল, “এই কদিন কী করবেন?”
“দাশবাবুর পারিবারিক খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করব। দোকানগুলো দেখব। আর ফন্দিফিকির খুঁজব।”
“দেখুন চেষ্টা করে।”
“তুমি একবার যশোদাবাবুকে ডেকে আনে। কথা বলব।”
তারাপদ বাইরে গেল যশোদাজীবনকে ডাকতে।
ক’মুহূর্ত পরেই যশোদা এলেন।
কিকিরা বললেন, “যশোদাবাবু, আপনাকে একটা কাজ করতে হবে।”
“বলুন।”
“আমরা কাল ফিরে যাব!..না, না, আসব আবার, আসছে হপ্তায়–শুক্র বা শনিবার। এর মধ্যে আপনি যেভাবে খবরটা চেপেচুপে আছেন সেইভাবে থাকবেন। থানা-পুলিশ করবেন না। মেজোবাবু ছোটবাবুকে সামলে রাখবেন।”
“বড়দা?”
“তাঁকে আলাদা করে খবর না দিলেই ভাল। তবে তিনি যদি নিজেই ফিরে আসেন কাশী থেকে অন্য কথা।…ক’টা দিন সবুর করে থাকুন, হইচই করবেন না। একটা কথা জানবেন, আপনার বড়বাবু সত্যি সত্যি আত্মহত্যা করেননি। আর যদি করেও থাকেন তবে এখানে কোথাও নয়। বুঝলেন!”
মাথা নাড়লেন যশোদাজীবন।
.
॥ ৫ ॥
পরের শুক্রবারই এলেন কিকিরা। একা।
বর্ষাবাদলা নেই। ভাদ্রমাসের চড়া রোদ থাকছে দিনভর। গাছপালার সেঁতানি ভাব শুকিয়ে এসেছে অনেকটা। রাত্রে হালকা জ্যোৎস্না। শুক্লপক্ষ চলছে।
এসেই বললেন, “আপনাদের বড়দা ফিরেছেন নাকি?”
“না। দু’-চারদিনের মধ্যেই আসছেন।”
“বাড়িতে হইচই হচ্ছে?”
“আজ্ঞে তা তো হবেই। মেজদাকে আমি সামলে রেখেছি। কিন্তু ছোড়দা আর শুনতে চাইছে না। বলছে, বাবার আত্মহত্যা করার কথাটা না হয় চেপে গেলুম। হারিয়ে যাওয়ার কথাটা তো পুলিশকে জানাতে পারি।”
কিকিরা একটু হাসলেন। বললেন, “মিসিং! তা অবশ্য জানাতে পারেন; তবে মিসিংয়ের সঙ্গে অনেক ফ্যাকড়া জড়িয়ে আছে। সুতোর জট খুলতে গেলে ব্যাপারটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে আপনাদের ছোড়দার জানা নেই।”
যশোদা মাথা হেলালেন। মানে, তিনি বোঝেন সবই। সামান্য চুপচাপ থাকার পর কিকিরা হঠাৎ বললেন, “আপনাদের এখানে শুকনো খড় পাওয়া যাবে। খড়ের আঁটি?”
যশোদা অবাক! হকচকিয়ে যাওয়ার মতন অবস্থা। “আজ্ঞে খড়?”
“খড়ের আঁটি! গোরু গোয়ালঘর যখন রয়েছে এখানে আপনাদের কৃষ্ণধামে তখন খড় পাওয়া সহজ! না কি!”
“পাওয়া যাবে।”
“ধরুন একটু বেশিই লাগবে।”
“দেখি। খড়ের গাড়ি এ হপ্তায় আসেনি। জোগাড় হয়ে যাবে!”
“আপনাদের এখানে কেরোসিন তেল দিয়েই লণ্ঠন জ্বলে। চার-পাঁচ বোতল বা ধরুন দু’-চার লিটার তেল পাব নিশ্চয়।”
যশোদা কিছুই বুঝলেন না। তাকিয়ে থাকেন হাঁ করে।
কিকিরা মুচকি হাসলেন। ঠাট্টার গলায় বললেন, “ঘাবড়ে যাবেন না। ভয়ের কিছু নেই।…শুনুন, কাল আমার জনা দুই লোক লাগবে। মালি আসবে না?”
“আসতে পারে।”
“ঠিক আছে।..না এলে আপনাদের এখানে কাজের লোক আছে। দুটো ঠিকে মজুর ধরে দিতে পারবেন না?”
যশোদা কিছু না বুঝলেও মাথা নাড়লেন। পরে বললেন, “তারাপদবাবু এলেন।?”
“কাল আসবে। অফিস সেরে। আমি আগে আগে এলুম কাজ খানিকটা গুছিয়ে রাখতে। একটাই শুধু আমার ভয় মশাই, হঠাৎ করে যদি বৃষ্টি নেমে যায় কাল-পরশু-তবেই বিপদ।”
.
“আর এখন নামবে বলে মনে হয় না। ক’টা দিন একটু মাঠঘাট শুকুক। তবে ভাদ্রমাস, বলা যায় না কিছুই।”
পরের দিন তারাপদ এল। বিকেল বিকেল। কাঁধে কিটব্যাগ, হাতেও একটা নাইলনের ছোট হাত-ঝোলা।
কিকিরা বাগানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বোধ হয় অপেক্ষা করছিলেন তারাপদর। বললেন, “সংবাদ কী?”
“ভাল।”
“চাঁদু?”
“সারের অ্যাডভাইস জানিয়ে এসেছি। হাজির থাকবে সময়মতন। আপনার কাজ কতটা এগুল?”
কিকিরা আঙুল দিয়ে কৃষ্ণধামের কম্পাউন্ড-ওয়ালের দিকটা দেখালেন। বললেন, “দুটো পাশ হয়ে গিয়েছে। বাকি দু’পাশ কাল দুপুরের মধ্যেই হয়ে যাবে। যাও না, একবার দেখে এসো।”
তারাপদ এগিয়ে গিয়ে দেখে এল। বলল, “সার, গর্তগুলো আগুপিছু কেন?” কিকিরা মুচকি হাসলেন। “একে বলে জিগজাগ ট্রেঞ্চ। অবশ্য এটা ট্রেঞ্চ নয়। মানে, মাটি কাটা নালা নয় হে, ফুট তিনেক অন্তর একটা করে গর্ত। তা গর্তগুলো ফুট দুই-আড়াই হবে, তলার দিকে, ডিপ আর কী! আর গোললাইয়ের মাপও মোটামুটি ওইরকম।…আগুপিছু জিগজাগ করার মানে হল, তফাত থেকে দেখলে চোখের ভুল হবে। বোঝা যাবে না, একটা গর্ত থেকে আর-একটা গর্তের মধ্যে হাত কয়েক তফাত। আগুন যখন জ্বলবে, দূর থেকে দেখলে মনে হবে, একটানা দাউদাউ করে জ্বলছে।”
