চন্দন কী যেন বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই কিকিরা তার বাঁ হাতটা দেখালেন। সত্যিই শুকনো মতন দেখতে। আঙুলগুলো বেঁকা বেঁকা, চামড়া কেমন পোড়া পোড়া রঙের। হাতটা কাঁপছিল। কোট থাকার জন্যে কব্জির ওপর দেখা গেল না ।
চন্দন বলল, “আপনি ডাক্তার-টাক্তার দেখাননি?”
“দেখিয়েছি, কত ডাক্তার দেখিয়েছি, ওষুধ খেয়েছি, ইনজেকশান নিয়েছি, কিছু হয়নি। ডাক্তাররা ধরতে পারছে না। কেউ বলছে, নার্ভের রোগ;কেউ বলছে কোনো বিষাক্ত জিনিস থেকে হয়েছে, কেউ আবার অন্য কিছু বলছে–।”
তারাপদ চন্দনকে দেখিয়ে কিকিরাকে বলল, “ও হল ডাক্তার।“
চন্দন যেন সামান্য লজ্জা পেল। বলল, “না না, এখনো পুরো ডাক্তার হইনি, সবে পাশ করেছি।”
তারাপদ রগড় করে বলল, “চন্দন এখনও দশ বিশটা কেন, একটাও মানুষ মারেনি। কাঁচা হাত। দু-চার বছর আরও যাক তারপর ডাক্তার হবে।”
তিনজনেই হেসে উঠল।
হাসি-ঠাট্টার কথা বলতে বলতে রাত বাড়তে লাগল। গাড়ি মাঝে মাঝে থামছে, আবার চলছে। শীতের জন্যে জানলা সব বন্ধ। কামরার লোকজন কথাবার্তা বলতে বলতে ক্রমশই নিস্তেজ হয়ে আসছে। দু-একজন ঘুমিয়েও পড়েছে। কিকিরা ততক্ষণে তারাপদদের নামধাম জেনে গিয়েছেন। শুধু জানতে পারেননি তারাপদরা ঠিক কোথায় যাচ্ছে। ওরা সেই যে বলেছিল মধুপুর-ধুপুর, তার বেশি আর কিছু বলেনি।
বর্ধমানের পর গোটা কামরাটাই যেন ঘুমিয়ে পড়ল।
তারাপদর ঘুম পাচ্ছিল। হাই উঠছিল তার।
হাই তুলতে তুলতে চন্দন হঠাৎ কিকিরাকে বলল, “আপনি তো একজন এক্স-ম্যাজিশিয়ান আচ্ছা এই যে লোকে মন্ত্রটন্ত্রর কথা বলে, আপনি ওসব বিশ্বাস করেন?
মাথা নাড়লেন কিকিরা, “না, ম্যাজিক হল খেলা, তার সঙ্গে মন্ত্রটন্ত্রর কোনো সম্পর্ক নেই। তবে আমি হিপ্নোটিজম, মেসম্যারিজম্ এ-সব বিশ্বাস করি । নিজে করেছি একসময়। আমাদের দেশে অনেকে যোগ অভ্যাস করে অনেকে কিছু করতে পারেন। আমার গুরু মাটির তলায় চাপা দেওয়া অবস্থায় দু-তিন ঘণ্টা থাকতে পারতেন।”
তারাপদ আর বসে থাকতে পারছিল না, বড় ঘুম পাচ্ছে। শুয়ে পড়ার জন্যে তৈরি হতে হতে বলল, “আপনার দু-চারটে ম্যাজিক কাল সকালে উঠে দেখব।”
কিকিরা তারাপদকে দেখতে দেখতে হেসে বললেন, “কাল পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন, না এখনই দেখবেন?”
“এখন?”
কিকিরা যেন মজা করছেন এমন চোখমুখ করে বললেন, “একটা স্যাম্পল দেখিয়ে দিই, কী বলেন?” বলে কয়েক পলকের জন্যে চোখ বুজলেন, তারপর বললেন, “আপনি আপনারা মধুপুর যাচ্ছেন না। কোথায় যাচ্ছেন জানি না–তবে মধুপুর নয়, এমন কোনো জায়গায় যাচ্ছেন যার নামের প্রথমে ‘এস্’ অক্ষর আছে। রাইট? যার কাছে যাচ্ছেন তার নামের প্রথমে ‘বি’ অক্ষর থাকবে। রাইট?”
তারাপদ যেন চমকে উঠল। চন্দনও। দুজনেই হতভম্ব; অপলকে কিকিরার দিকে তাকিয়ে থাকল, নিশ্বাস নিতেই যেন ভুলে গেছে ।
শেষে তারাপদ বলল, “আপনি–আপনি কে?”
কিকিরা খক খক্ করে বিচিত্র হাসি হেসে বললেন, “আমি কিকিরা দি গ্রেট, কিকিরা দি ম্যাজিশিয়ান।”
তারাপদ মাথায় পাশে তার কিট ব্যাগের দিকে তাকাল। ওই ব্যাগের মধ্যে ভুজঙ্গভূষণকে দেবার জন্যে সিলমোহর করা চিঠি আর প্যাকেট আছে একটা। খুব দরকারি জিনিস। মৃণাল দত্ত বার বার সাবধান করে দিয়েছেন। ও দুটো যদি খোয়া যায় সর্বনাশ হবে। তারাপদ যেজন্য শংকরপুর যাচ্ছে তা ব্যর্থ হবে। এই কিকিরা লোকটা কি সেটা জানে? সে কি সমস্ত জেনেশুনে তারাপদদের পিছু ধরেছে? লোকটার উদ্দেশ্য কী? কোন মতলব নিয়ে সে তাদের সঙ্গী হয়েছে?
তারাপদ ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। চন্দনও বিচলিত, বিমূঢ়।
.
চার
অনেকক্ষণ আর কেউ কোনো কথা বলল না। তারাপদ ভাল করে আর কিকিরার দিকে তাকাচ্ছিল না, তার সাহস নেই তাকাবার। ভীষণ সন্দেহ হচ্ছে। লোকটাকে। মুখে যতই হাসি থাক, মজার মজার কথা বলুক–তবু কিকিরা যে বড় রকমের ঘুঘু তাতে সন্দেহ কী।
আড়চোখে তাকিয়ে তারাপদ চন্দনকে ব্যাপারটার গুরুত্ব বোঝাবার প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল। তার মুখের ভাব, চোখের সাবধানী দৃষ্টি বলছিল : চাঁদু, বি কেয়ারফুল; লোকটা ঘুঘু ।
চন্দন নিজেও সন্দিগ্ধ হয়ে উঠেছিল। কিকিরা যত বড় ম্যাজিশিয়ানই হোক, ওরা কোথায় যাচ্ছে, কার কাছে যাচ্ছে–এটা মুখ দেখে ঠাহর করতে কিছুতেই পারে না। অসম্ভব। থট রিডিং না কী যেন বলে একটা–কিকিরা কি সেই মনের কথা জানতে পারার খেলা দেখাল? বোগা। চন্দন ওসব বিশ্বাস করে না। তবে এটা বিশ্বাস করতে বাধ্য হচ্ছে, কিকিরা প্রচণ্ড ধূর্ত। সে কেমন কায়দা করে পুরো শংকরপুর, কিংবা সোজাসুজি ভুজঙ্গভূষণ না বলে রহস্যময় ভাবে বলল, প্রথমটা অক্ষর ‘এস’ আর ‘বি’। ও যে সবই জানে তাতে চন্দনের সন্দেহ হচ্ছিল না। অন্তত, কিকিরা নিশ্চয় জানে চন্দনরা শংকরপুরে যাচ্ছে, ভুজঙ্গভূষণের কাছে।
চন্দন চোখে চোখে তারাপদকে বোঝাবার চেষ্টা করল : সবই বুঝতে পারছি। সাবধান হতে হবে।
কিকিরা কিন্তু একই রকম হাসিমুখে তারাপদদের দেখছিলেন। বরং তাঁর চোখ দেখে মনে হচ্ছিল, কিকিরা এরকম একটা খেলা দেখাবার পর যেন তারাপদদের হাততালি আশা করেছিলেন, না পেয়ে একটু দুঃখবোধ করছেন।
চন্দন মনে মনে ভেবে দেখল, আর বেশিক্ষণ চুপচাপ থাকা উচিত নয়। ওরা ভয় পেয়েছে কিকিরা সেটা বুঝে ফেলবে। বার দুই শুকনো কাশি কেশে তারাপদকে বলল, “অনেক রাত হয়ে গেল: তুই শুয়ে পড়। আমি জেগে আছি। ট্রেনে আমার ঘুম হয় না। “
