যশোদা বললেন, “এসব ঠাকুরের।” ।
“বোঝাই যায়।..আচ্ছা যশোদাবাবু, ওই ফাইবার গ্লাসগুলো লাগানো হয়েছিল কেন?”
“ঠাকুরের গায়ে ধুলোময়লা যাতে না পড়ে!”
“ও!” বলে কিকিরা মাথার ওপর তাকালেন, তারপর তারাপদকে বললেন, “দেখেছ?”
তারাপদ আগেই দেখেছে। এই ঘরের ছাদের ধাঁচটা যেন মন্দিরের চুড়োর মতন।
“চলুন বাইরে যাই,” কিকিরা বললেন। বাইরে, ঠাকুরঘরের পেছনের আর পাশের খানিকটা লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা। গ্রিলের রেলিং। হাতকয়েক চওড়া ফাঁকা বারান্দা। ব্যালকনি মতন। ঠাকুরঘরের পেছন দিকের ব্যালকনি থেকে একটা ঘোরানো লোহার সিঁড়ি নীচে নেমে গিয়েছে। সিঁড়িটা শেষ হয়েছে যেখানে তার চারপাশে কলাঝোঁপ আর পাতকুয়ো। কলাঝোঁপ যথেষ্ট ঘন তার ওপর বর্ষায় পাতাগুলো যেন বিস্তর বেড়ে উঠেছে। ঝোঁপ ছাড়ালেই একটা জামগাছ। জামগাছের ওপাশে ঢালু জমি। বাঁশঝোঁপ। তারপর কৃষ্ণধামের পেছন দিকের পাঁচিল।
কিকিরা মন দিয়ে দেখছিলেন। তারাপদও নজর করে দেখছিল আশপাশ। কিকিরা বললেন, “যশোদাবাবু, এই সিঁড়িটা দিয়ে নেমে গেলেই কলাঝোঁপ?”
“আজ্ঞে।”
“কুয়োর জল কেমন?”
“ভাল।”
“একটাই কুয়ো নাকি?”
“না, আরও একটা আছে! গোয়ালঘরের দিকে।”
তারাপদ কী বলতে যাচ্ছিল তার আগেই কিকিরা পায়ের তলা থেকে কী যেন কুড়িয়ে নেওয়ার জন্যে ঝুঁকে পড়লেন। কাঁচের টুকরো। পায়ে লাগতে পারত। টুকরোটা তুলে নিতে গিয়ে কিকিরার চোখে পড়ল, কয়েকটা লবঙ্গ ছড়িয়ে আছে। বৃষ্টিতে ভিজে একেবারে অন্যরকম দেখায়।
লবঙ্গগুলো তুলে নিলেন কিকিরা। তারপর চোখের ইশারায় তারাপদকে কিছু বললেন।
তারাপদ বুঝতে পারল।
কিকিরা যশোদাকে নিয়ে অন্যপাশে সরে গেলেন। তারাপদ লোহার সিঁড়ি বরাবর কী যেন খুঁজতে লাগল হেঁট হয়ে।
অন্যপাশে সরে গিয়ে কিকিরা যশোদাকে বললেন, “আপনি হীরালালবাবুর সবচেয়ে বিশ্বস্ত লোক। উনি যে এরকম একটা কাজ করতে পারেন–আপনাকে আভাসমাত্র দেননি!”
“না।”
“আপনিও বুঝতে পারেননি?”
“না। শুধু বুঝতে পেরেছিলাম উনি মনে মনে কেমন যেন ভেঙে পড়েছেন। কথায়বার্তায় আফসোস। দুঃখ করতেন।”
“কীসের আফসোস?”
যশোদাজীবন ইতস্তত করেছিলেন; শেষে বললেন, “সেভাবে সরাসরি আমায় কিছু বলেননি। বোধ হয় বলতে চাইতেন, পারতেন না। তবে বুঝতে পারতাম, তিনি যা চান না, ভাবতেও পারেন না–এমন একটা ব্যাপার বাড়ির মধ্যে কোথাও
কিকিরা নজর করে দেখলেন যশোদাকে। মনে হল, হীরালালের এই বিশ্বস্ত বন্ধু এবং কর্মচারীটি সঠিক জবাব দিলেন না। কথা লুকোলেন।
কথা পালটে নিলেন কিকিরা। সহজভাবে বললেন, “বাড়িতে তিন ছেলের মধ্যে সদ্ভাব কেমন?”
“আজ্ঞে, হাতের পাঁচ আঙুল যেমন সমান হয় না, সংসারে ভাইবোনরাও সকলে সমান হয় কি! ফারাক থাকবেই।”
“যেমন?”
“যেমন ধরুন, বুদ্ধি-বিবেচনা, সাহস, জেদ, এইরকম আর কী! কেউ ধূর্ত হয় বেশি, লোভী; কেউ যেমন আছে তেমনই থাকতে চায়। কেউ ভিতু, সাবধানী। কেউ বা হালকা স্বভাবের। নিজেরটি নিয়ে থাকে।”
“কথাটা ঠিকই যশোদাবাবু, পাঁচ আঙুল সমান হয় না।…তা ছেলেদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান কে?”
“বড়দা কানাইলাল। অতিশয় বুদ্ধিমান বলতে পারেন। সাহসী।”
“মেজো ছেলে?”
“শ্যামলাল–মানে মেজদার কথা আগেই বলেছি। ভিতু ধরনের। শখশৌখিনতাও নেই। সাদামাটা।”
“আর ছোট ছেলে?”
“কুমারলাল এখনও ঝোঁকের মাথায় চলে। হালকা স্বভাবের, বয়েসও কম। তবে হাল কায়দায় চলতে চায়। তা সে যাই করুক, ভবানীপুরের দোকানের ব্যবসাটা মন্দ চালায় না।”
তারাপদ ততক্ষণে ফিরে এসেছে।
কিকিরা আর কথা বাড়ালেন না। “চলুন, নীচে যাই।…ভাল কথা, হীরালালবাবু চলে যাওয়ার পর ওপরতলার ঠাকুরঘর, বাইরের এই জায়গাগুলো ঝাঁট পড়েনি? মোছামুছি করেছে তো?”
“মনে হয় করেনি। সকলেই বড়বাবুকে খোঁজাখুঁজিতে ব্যস্ত। আমি না হয় জিজ্ঞেস করব ওদের?”
“করবেন?…আপনিও তো ব্যস্ত। চলুন যাই, চা-টা খেতে হবে।” কিকিরারা নীচে নেমে গেলেন।
.
৷৷ ৪ ॥
কিকিরা আর তারাপদ মুখোমুখি বসে কথা বলছিল। ঘরে লণ্ঠন জ্বলছে। সন্ধে পেরিয়ে গিয়েছে, তবে রাত নয়। তবুও, এই ফাঁকা জায়গায় সন্ধে-রাতই যেন অনেক। বাইরে বৃষ্টি নেই, ঝিঁঝি ডাকছে। বাঁশবাগান আর কলাঝোঁপের দিক থেকে ক্রমাগত ব্যাঙ ডেকে যাচ্ছিল।
কিকিরা বললেন, “তারা, চিঠিগুলো–মানে, হীরালালবাবুর লেখাগুলো আমি বারবার পড়েছি। আমার কী মনে হয় জানো?”
“কী?”
“ভদ্রলোক ব্যবসাদার হলেও সৎ সরল মানুষ। তিনি শুধু ধর্মকর্ম করতেন না, মনে মনেও অধর্ম করার কথা ভাবতেন না। তাঁর কাছে ধর্ম ভেক ছিল না। অথচ নিজের সংসারের মধ্যেই এমন কোনও অন্যায় অধর্ম হচ্ছিল যা তিনি সহ্য করতে পারছিলেন না। আবার মুখ ফুটে বলতেও পারছিলেন না।”
“কেন?”
“এরকম হয়। বুড়োমানুষ, সংসারের সাতপাঁচে থাকতেন না। বলতে গিয়ে যদি বিপত্তি হয়। তা ছাড়া আমার ধারণা, বলার মতন জোর প্রমাণও তাঁর হাতে ছিল না। হয়তো সন্দেহ করেছিলেন। কানাঘুষো শুনেছিলেন…”
“হতে পারে। তবে কীসের সন্দেহ?”
“সেটাই ভাবছি। যশোদাবাবুর পেটে এখনও কথা আছে। বলতে পারছেন না।”
“তা হলে মামলা ছেড়ে দিন, সার। আমার মনে হয়, আত্মহত্যা করার কথাটা বাজে। এখানে কেউ আত্মহত্যা করলে আজ ক’দিনে তার কোনও হদিস মিলবে না?”
“তোমার কথাটা ঠিকই। আমারও মনে হয় না, হীরালালবাবু সত্যি সত্যি আত্মহত্যা করেছেন। …আরে, একটা মানুষ যখন আত্মহত্যা করতে যায় তখন কি সে ঠাকুরঘরের লবঙ্গর শিশি থেকে এক মুঠো লবঙ্গ তুলে নিয়ে চলে যায়। অসম্ভব! তখন তার মনের সে-অবস্থা থাকে না।”
