“ও! তা এ নিয়ে ছেলের সঙ্গে মন কষাকষি হয়েছিল?”
“না। বড়বাবু চুপ করেই থাকতেন। মুখে কিছুই বলেননি। মনে লেগেছিল।”
“দোকান সাজানোর পর বিক্রিবাটা কমেছিল, না, বেড়েছিল?”
“বেড়েছিল।”
“তবে আর কী! অন্য দোকানগুলোর বেলায় কী হয়েছিল?”
“না, সেগুলো আগের মতনই ছিল।”
“কেমন চলত?”
“খারাপ নয়। মেজদার কলেজ স্ট্রিটের দোকানে তিন-চার মাস খুব বেচাকেনা হত–এই পুজোর টাইমে। ভবানীপুরের দোকানও ভাল চলত। ছোড়দা তার দোকানে রেডিমেড পোশাক রাখত। বাচ্চাদেরই বেশি।”
“আর হাওড়ার দোকান?”
“আজ্ঞে, ওটা আজকাল ভাল চলত না। তবে দোকানটা তো বড়বাবু শালাবাবুকে দান করেছিলেন। কাজেই ওটা হীরালাল দাশ অ্যান্ড সন্সের মধ্যে পড়ে না।”
বেলা হয়ে আসছিল। আবার বৃষ্টি নামল। কিকিরা বললেন, “যশোদাবাবু, এখন থাক। এবার স্নান-খাওয়া সেরে নিই। দুপুরে একটু জিরিয়ে, বিকেলে কৃষ্ণধামের ঘরদোর দেখা যাবে। চোখে সব দেখে নেওয়া ভাল। আজ আমরা কিন্তু রাত্তিরেও আছি এখানে। মনে আছে তো?”
যশোদা বললেন, “ও-কথা কেন বলছেন! আপনাদের জন্যে সবরকম ব্যবস্থা করা আছে। যতদিন খুশি থাকতে পারেন!”
চুরুট নিভে গিয়েছিল কিকিরার। সেঁতিয়ে গিয়েছে। তারাপদর কাছে একটা সিগারেট চাইলেন কিকিরা।
সিগারেট ধরাতে ধরাতে হঠাৎ যশোদাকে বললেন, “আপনার বড়বাবু পান-তামাক খেতেন না?”
“আজ্ঞে না। ওঁর কোনও নেশা ছিল না। দু’বেলা দু’ পেয়ালা চা খেতেন মাত্র। আর গলা খুসখুস করে কাশি আসত বলে লবঙ্গ মুখে রাখতেন বেশিরভাগ সময়। বড়বাজার থেকে বাবুর জন্যে বাছাই করা ভাল লবঙ্গ আসত। আমিই আনতাম।”
“চলুন ওঠা যাক।” কিকিরা উঠে পড়লেন।
.
৷৷ ৩ ৷৷
বিকেলে কৃষ্ণধামের ঘরগুলো দেখলেন কিকিরারা। নীচের তলায় চার-পাঁচটি ঘর। মাঝারি মাপের। রান্না খাওয়ার ব্যবস্থা সামান্য তফাতে, একপাশে। বারান্দা প্রায় চারপাশেই। বারান্দার তলায় লতাপাতা আর ফুলগাছের ঝোঁপ। হাসনুহানা, টগর, বেল–আরও কত। ঘরগুলো পাকাঁপোক্তভাবে তৈরি। তবে বাহুল্য নেই, বিলাসিতা নেই। একটা ঘরে দু’আলমারি ধর্মগ্রন্থ। দেওয়ালে দুর্গা, কালী, শ্রীকৃষ্ণ আর শ্রীগৌরাঙ্গর পট। সরল সাদাসিধে ঘরদোর। কিন্তু বেশ লাগে।
শেষে হীরালালের শোয়ার ঘরে এলেন কিকিরারা। অবাকই হলেন ঘরটি দেখে। আসবাব যৎসামান্য। একটি পুরনো পালঙ্ক, ড্রয়ার একটি, কাঠের আলমারি, আলনা। দুটি মাত্র চেয়ার টেবিল নেই। ঘরে চারটি জানলা। কাঠের পাল্লা, গ্রিলও রয়েছে।
যশোদা পালঙ্কটি দেখিয়ে বললেন, “চিঠির টুকরো তিনটি এই বিছানার ওপরেই ছিল।”
কিকিরা আর তারাপদ নজর করে ঘর দেখছিলেন। কিকিরা বললেন, “যশোদাবাবু, অনেককাল আগে আপনার সঙ্গে দোকানে বেড়াতে গিয়ে একবার হীরালালবাবুকে দেখেছিলাম। চেহারাটি ঠিক মনে নেই। বেঁটে রোগা মতন ভদ্রলোক না?”
“আজ্ঞে বেঁটে ঠিক নয়, তবে মাথায় খাটো। গায়ের রং ছিল ধবধবে। মাথায় চুল অল্প। ইদানীং সবই পেকে সাদা হয়ে গিয়েছিল।”
“সাজপোশাকও সাধারণ ছিল না?”
“ধুতি-পাঞ্জাবি। গায়ে ফতুয়া পরতেন। গেঞ্জি কখনও পরেননি। চামড়ার জুতোও পায়ে দিতে পারতেন না।”
“কেন?”
“পায়ে অনেক কড়া ছিল। ওষুধবিষুধ করেছেন। কাটিয়েছেন। আবার গজিয়ে যেত। ক্যাম্বিসের পা-ঢাকা জুতো পরতেন।”
“একটা হারমোনিয়াম দেখছি যে মশাই?”
যশোদা বললেন, “এখানে থাকলে নিজের মনে একটু গান গাইতেন। রামপ্রসাদী গানই বেশি।”
তারাপদ বলল, “ধার্মিক মানুষ।”
“তা ঠিকই। অমন মানুষ কেন যে…” কথা থামিয়ে কিকিরা বললেন, “চলুন, এবার ওপরে যাওয়া যাক।” সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠলে দক্ষিণ দিকে দুটি ঘর। উত্তরে ঘর নেই, ফাঁকা ছাদ। বাড়িটাকে তাই দোতলা না বলে দেড়তলা বলাই ভাল। আকাশে মেঘ রয়েছে। তবে ছেঁড়া ভেঁড়া। বৃষ্টি আপাতত বন্ধ। আলো মরে এসেছে। টুকরো মেঘগুলো জমে গেলেই আবার অন্ধকার হয়ে যাবে।
যশোদা বললেন, “আসুন, ঘরদুটো দেখুন।” কিকিরারা এগিয়ে গেলেন। পাশাপাশি দুটি ঘর। একটি একেবারে ফাঁকা। মাটিতে একপাশে একটি কার্পেট পাতা। দেওয়ালে মস্ত বড় এক শ্রীগৌরাঙ্গর পট।
যশোদা বললেন, “এটিতে বড়বাবু কখনও কখনও কীর্তনগানের আসর বসাতেন। বরানগর থেকে বাণীবাবু আসতেন কীর্তন গাইতে। তাঁর দলবল থাকত। আর আমরা থাকতাম। আশপাশের দু’-পাঁচজন।”
কিকিরা দেখলেন ঘরটা। পরিচ্ছন্ন। হীরালাল নেই, তবু ঘরটি যে ঝাঁট পড়েছে, মোছা হয়েছে–বুঝতে কষ্ট হয় না।
পাশের ঘরটি হীরালালের ঠাকুরঘর। একপাশে উঁচু বেদি। বেদির ওপর সাদা মার্বেল পাথরের স্ল্যাব। মাঝখানে রাধাকৃষ্ণ বিগ্রহ। কালো পাথরের। আন্দাজে মনে হয়, হাত দুই উঁচু বিগ্রহ। দেখতে সুন্দর। চিৎপুরের পাথর বাজারে যা বিক্রি হয়–সেরকম মামুলি জিনিস নয়। বিগ্রহের দু’পাশে দুটি লম্বা বাতিদান। পেতলের। ঝকঝক করছে। ঘরের ঘোলাটে আলোতেও সেটা চোখে পড়ে। বেদির তিন পাশে গ্লাস ফাইবার, ধোঁয়া রঙের; সামনের দিকটা খোলা। বেদির তলায় দু’ ধাপ সিঁড়ি। সিঁড়ির ধারগুলো আলপনার নকশায় রং করা। দেওয়ালের একটি পাশে দেওয়াল-তাক, কাঁচের পাল্লা, ভেতরে কয়েকটা রুপোর বাসন, বাটি, চন্দন কাঠ, আরতির পঞ্চপ্রদীপ–এইরকম কত কী! আর গোল গোল কাঁচের শিশি। শিশির মধ্যে বাতাসা, কিশমিশ, শুকনো খেজুর, মিছরি৷ একটা শিশিতে লবঙ্গও রয়েছে। শিশিটা কাত হয়ে গিয়েছে একপাশে।
