যশোদা বললেন, “পর পর গুছোনো আছে। ওপরেরটা প্রথম…।” কিকিরা লেখাটা পড়লেন মনে মনে। “আমার বয়েস আটষট্টি হইয়া গিয়াছে। দেশ ছাড়া হইয়া যখন আসি, উনিশ কুড়ি বয়েস ছিল। লেখাপড়া ঠিকঠাক শেখা হইয়া উঠে নাই। পাঁচ ঘাটের জল খাইয়া কাটা কাপড়ের ব্যবসা শুরু করি। তাহার পর কাপড়ের গাঁঠরি পিঠে করিয়া বাড়ি বাড়ি তাঁতের শাড়ি বিক্রি করিতাম। পরিশ্রম অনেক করিয়াছি। অবশেষে শ্যামবাজারে একটি কাপড়ের দোকান দিতে পারি। ঈশ্বরের কৃপায় ইহা সম্ভব হইয়াছিল। সৎভাবে ব্যবসা করিয়াছি। ভাগ্যও সহায় হইয়াছে। ক্রমে ক্রমে আমাদের ব্যবসা বাড়িল। তিন-তিনটি দোকান দিলাম। এখন তো অভাব অনটন কিছুই আর নাই। ছেলেরাও দাঁড়াইয়া গিয়াছে। আমার মনে কিন্তু সুখ নাই। অনর্থক আর বাঁচিতে ইচ্ছা করে না। শ্রীকৃষ্ণচরণে শরণ লইতে ইচ্ছা করে।”
লেখাটা বার দুই-তিন পড়ে কাগজটা তারাপদকে পড়তে দিলেন কিকিরা। দ্বিতীয় চিঠিটা ছোট। তাতে লেখা: “অনেক ভাবিয়া দেখিলাম, এবার সংসার হইতে বিদায় লওয়াই আমার উচিত। বাঁচিয়া থাকিলে না জানি কত অধর্ম অন্যায় দেখিতে হইবে। মহাভারতে পড়িয়াছি, স্বয়ং মহাজ্ঞানী ভীষ্মও নিজের ইচ্ছামৃত্যুর জন্য অনুতাপ করিতেন। ভাবিতেন, উহা যেন অভিশাপ। আমি সামান্য মানুষ। আমার আর কতটুকু ক্ষমতা। আমি মনস্থির করিয়া ফেলিয়াছি। আমার যাওয়া আর কে আটকায়।”
চিঠিটা তারাপদকে পড়তে দিলেন কিকিরা। শেষ টুকরোটা হাতে নিয়ে যশোদাকে বললেন, “এইটেই শেষ?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।” চিঠিটা খুবই ছোট। কয়েকটি মাত্র কথা। “আমি শেষ যাত্রায় চলিলাম। স্বেচ্ছায়। আমার পরিণতির জন্য কাহাকেও আমি দায়ী করি না। ঈশ্বর উহাদের মঙ্গল করুন।”
বার দুই-তিন শেষ চিঠিটা পড়ে কিকিরা কাগজের টুকরোটা তারাপদকে এগিয়ে দিলেন।
সামান্য চুপচাপ। পকেট থেকে কিকিরা চুরুট বার করলেন। সরু আঙুলের মতন চুরুট। দেশলাইটা স্যাঁতসেঁতে হয়ে গিয়েছে। চুরুট ধরাতে দশ-বারোটা কাঠি নষ্ট হল।
“যশোদাবাবু?”
“বলুন?”
“চিঠি তিনটের হাতের লেখা তো একই লোকের মনে হচ্ছে। হীরালালবাবুর। চিঠির শেষে নামও লিখেছেন, হীরালাল দাশ। আপনি কী বলেন?”
“হাতের লেখা বড়বাবুরই।”
“নকল নয় তো?”
“আজ্ঞে না।”
“কালির রং, কলমও একই বলে মনে হচ্ছে।”
“ঠিকই বলেছেন। আমিও কোনও তফাত দেখিনি।”
কিকিরা এবার তারাপদর দিকে তাকালেন। বললেন, “তারা, তুমি একটা জিনিস নজর করে দেখেছ? চিঠিতে কাটাকুটি বোধ হয় মাত্র দু’-তিন জায়গায়। হাতের লেখা স্পষ্ট। কোথাও হাত কাঁপেনি, এলোমেলো হয়নি লেখা। দেখেছ?”
তারাপদ দেখল। মাথা হেলিয়ে বলল, “হ্যাঁ–কথাটা ঠিকই।”
কিকিরা বললেন, “একজন লোক যখন সুইসাইড নোটের মতন চিঠি লেখে তখন তার মাথা কতটা ঠাণ্ডা হতে পারে? তার কোথাও একটু আবেগ থাকবে না, দুঃখ থাকবে না? তোমার কী মনে হয়?”
“থাকা বোধ হয় উচিত।”
“বেশ, উচিত বাদ দিলাম। হয়তো হীরালালবাবুর মাথা বেজায় ঠাণ্ডা ছিল। স্ট্রং নার্ভ। তিনি বেশ গুছিয়ে নিজের কথাগুলো লিখেছেন। মনে মনে মশও করে থাকতে পারেন। কিন্তু আমার যে ধোঁকা লাগছে হে!” বলে কিকিরা যশোদার দিকে তাকালেন। “যশোদাবাবু, আপনাকে খোলাখুলি ক’টা কথা জিজ্ঞেস করি। যা জানেন বলবেন, কথা লুকোবেন না।”
“লুকোব কেন! বলুন।”
“হীরালালবাবুর সঙ্গে আপনি অনেকদিন ধরে আছেন, আমি জানি। তবু ঠিক কত বছর রয়েছেন জানা নেই।” ।
“আঠাশ-তিরিশ বছর। বড়বাবু যখন শ্যামবাজারে তাঁর প্রথম দোকান করেন তখন থেকেই আমি তাঁর কর্মচারী। বাবু আমি আর বিনোদ বলে একটা ছেলে দোকান দেখতাম।”
“দ্বিতীয় দোকানটা কবে হয়?”
“পাক্কা দশ বছর পরে। কলেজ স্ট্রিট মার্কেটে।”
“তৃতীয়টা?”
“ভবানীপুরে। সেটা হয়েছিল মেজদার বিয়ের আগে।”
“আর হাওড়ার দোকান?”
“ওটা তেমন পুরনো নয়। বছর পাঁচ-সাত আগে হয়েছে।”
“দোকানগুলোর মালিকানা?”
“আগে সবই বড়বাবুর ছিল। পরে তিনি ভাগ করে দেন। আদি দোকান পায় বড়দা, কলেজ স্ট্রিটের দোকান দেওয়া হয় মেজদাকে। ভবানীপুরের দোকানের মালিকানা ছোড়দার।”
“আর হাওড়ার দোকান?”
“ওটা বড়বাবু অন্যরকম ব্যবস্থা করেন। তাঁর শ্যালক ও শ্যালকের ছেলেদের লিখে দেন। অবশ্য ওই দোকানটায় শালাবাবুদেরও টাকা খাটত।”
“আপনার মনিবই বলুন আর বড়বাবুই বলুন–মানুষ কেমন ছিলেন?”
“বাবু বড় ভাল লোক ছিলেন। সাদামাঠা, সরল। সৎ মানুষ। ব্যবসাদার হলেও তিনি শুধু লাভের দিকে চোখ রাখতেন না। বরং দশ পয়সার জায়গায় আট পয়সা লাভেই সন্তুষ্ট থাকতেন। ঠাকুর দেবতায় অগাধ ভক্তি ছিল। বউ ঠাকুরণ গত হওয়ার পর পুরোপুরি নিরামিষ আহার করতেন। আর গত তিন-চার বছর দোকানের ব্যাপারে মাথা ঘামাতেন না বিশেষ। বাড়ির কাছে বলে শ্যামবাজারের আদি দোকানটায় সন্ধের মুখে এক-আধ ঘণ্টা বসতেন। পুরনো লোকজন এলে কথাবার্তা বলতেন সুখদুঃখের।”
কিকিরা চুরুট টানতে টানতে মাথা নেড়ে যাচ্ছিলেন।
তারাপদ হঠাৎ কিকিরাকে বললেন, “সার, ছেলেদের সঙ্গে মন কষাকষি হয়নি তো? বুড়োমানুষ, কোনও ব্যাপারে মান-অভিমান হতে পারে।”
যশোদাই জবাব দিলেন। বললেন, “না, তেমন কিছু নয়। তবে বড়দা শ্যামবাজারের দোকানটা বাড়িয়ে নিয়েছিল। পাশের একটা ছোট হোসিয়ারি দোকান কিনে নেয়। আর আজকাল যা ফ্যাশান, দোকানটা হাল কায়দায় সাজিয়ে ঠাণ্ডা-মেশিন চালু করে দোকানে। বড়বাবুর এটা পছন্দ হয়নি। তিনি সাবেকি মানুষ, নিজের হাতে গড়া দোকান, অত ঝকমকি তিনি মেনে নিতে পারেননি।”
