যশোদা তখন হীরালালের শোয়ার ঘরে খোঁজ করতে আসেন। এসে দেখেন বিছানার ওপর তিনটুকরো কাগজ রাখা। প্রত্যেকটি কাগজের ওপর ভারী কিছু চাপা দেওয়া–যেন না বাতাসে উড়ে যায় কাগজগুলো।
কাগজের লেখাগুলো পড়েই যশোদার মাথা ঘুরে যায়। তিনি বিশ্বাস করতেও পারেননি। তারপর খোঁজ খোঁজ পড়ে যায় আবার। এবার যশোদা নিজে বাড়ির কাজের তিনটে লোককে নিয়ে মাঠেঘাটেও খুঁজে বেড়াতে শুরু করেন বড়বাবুকে। আত্মহত্যা করুন আর না করুন, কোথাও হয়তো পড়ে আছেন মাথা ঘুরে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে, সাপেখোপেও কামড়াতে পারে।
লণ্ঠন আর টর্চ নিয়ে ঘণ্টাখানেকের বেশি খোঁজ চলল। রাত্রে আর কত খোঁজ করা যায়। এদিকে কলকাতা যাওয়ার শেষ বাস চলে গিয়েছে সোওয়া সাতটা নাগাদ। কলকাতায় যাওয়ারও উপায় নেই।
রাতটা উদ্বেগে আর দুর্ভাবনায় কাটিয়ে পরের দিন যশোদা ছুটলেন কলকাতায়। বড়বাবুর বাড়ি বাগবাজারে। তেতলা বাড়ি। ছেলেরা সকলেই একসঙ্গে থাকে। বৃহৎ একান্নবর্তী পরিবার।
বড়বাবুর বড় ছেলে বড়দা–মানে কানাইলাল। মেজো ছেলে শ্যামলাল। তিনি হলেন মেজদা। ছোটর নাম কুমারলাল। বড়দা এখন বেনারসে, পুজোর মরশুমে কাশীর চকপট্টি আর তাঁত-মহল্লায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন ব্যবসার কাজে। এখন থেকে
ব্যবস্থা করে রাখলে বিয়ের মরশুমে মনের মতন বেনারসি পাবেন না। তা ছাড়া আজকাল সুতি কাপড়েও বেনারসি ধরনের কাজ হয় কাশীতে। মালের অর্ডার দিয়ে দু-একদিনের মধ্যেই ফিরবেন। তাঁকে হুট করে এ-সময় একটা দুঃসংবাদ দেওয়া যায় না। আর না-জেনে না-দেখে–কেমন করে বড়দাকে খবর দেওয়া যায় যে, বাবা আত্মহত্যা করেছেন, তুমি পত্রপাঠ ফিরে এসো।
মেজো শ্যামলাল স্বভাবে ভিতু আর সাবধানী। তার মোটেই ইচ্ছে নয়, ব্যাপারটা নিয়ে হুট করে থানাপুলিশ করা। বাবা যদি আত্মহত্যা না করে থাকেন– আর থানা-পুলিশ করতে ছোটে বাড়ির লোকে–তবে ভবিষ্যতে বিরাট একটা গোলমাল হবে। আত্মহত্যা করতে চলেছি–এই ব্যাপারটা পুলিশকে জানালেও সেটা বিশ্রী অপরাধ বলে গণ্য হবে। আইনের কত না ফ্যাকড়া!
কুমারলাল এখন ছুটেছে বর্ধমান, আসানসোল, কালনা–যেখানে যেখানে জ্ঞাতি, গোষ্ঠী আছে তাদের সকলের কাছে গিয়ে বাবার খোঁজ নিতে। মানুষ বুড়ো হলে ভীমরতি ধরে। বাবারও যে ধরেনি কে বলবে!
শ্যামলালের সঙ্গে পরামর্শ করে যশোদা এসে ধরেছিলেন কিকিরাকে। রায়বাবুর সঙ্গে মোটামুটি একটা পরিচয় ছিল যশোদার। অনেককাল আগে একই পাড়ায় থাকতেন দু’জনে।
কিকিরা মন দিয়ে সব শুনেছিলেন ঘটনাটা। কৌতুক এবং কৌতূহল–দুই-ই বোধ করেছিলেন। শেষমেশ রাজিও হয়ে গেলেন।
.
মাথায় ছাতা। গায়ে রেনকোট। মাঠঘাট, জলকাদা ভেঙে, মাঝে মাঝে বুনন ঝোঁপ সরিয়ে কিকিরারা শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণধামে পৌঁছে গেলেন।
দূর থেকে ভাল করে বোঝা যায় না, আন্দাজ করা চলে। তার ওপর বৃষ্টির বিরাম নেই। কাছে এসে বোঝা গেল, কৃষ্ণধামের কম্পাউন্ড-ওয়াল তেমন উঁচু নয়, হাত তিনেক হবে। তার ওপর অবশ্য ছোট ছোট লোহার খুঁটি জড়িয়ে তারকাঁটা লাগানো। গাছপালাই নজরে পড়ে বেশি, সামনের দিকে। বড় বড় গাছও রয়েছে অনেক: আম, জাম, পেয়ারারা। পেছন দিকে কৃষ্ণধাম। বাড়িটা বড় নয়। ছোট। দেড়তলার মতন লাগে তফাত থেকে দেখলে। বাড়ির ছাঁদ অনেকটা মন্দিরের মতন। মানে নকশাটা মন্দির ধরনের। আশপাশে ফুলগাছ, সরু সরু পথ, মোরাম আর নুড়ি পাথর বিছানো পথ।
ভালই লাগে দেখতে।
তারাপদ বলল, “কিকিরা সার, আপনি বললেন বর্ষায় একটু ‘ফিশিং’ করতে যাবেন! এই আপনার ফিশিং?”
কিকিরা বললেন, “দ্যাখো তারাবাবু, আমি অনেক কিছু জানি; তার চেয়েও বেশি হল যা জানি না। পৃথিবীর একভাগ স্থল, তিনভাগ জল। আমার ব্রেনেরও সেই অবস্থা, সার বস্তু ওয়ান পার্ট ওনলি! ফিশিংটা আমার শেখা হয়নি বাপু। ছিপ আমি দেখেছি; মাছ ধরতেও দেখেছি বাবুদের। কিন্তু জীবনে কখনও ছিপ ধরিনি।…তা সে যাই হোক, তোমাকে আমি ফিশিংয়ের ব্যাপারটা বলেছি আগেই।”
“তা অবশ্য বলেছেন।”
“তবে?”
“ব্যাপারটা আমার কাছে বাজে বলে মনে হচ্ছে। এই বৃষ্টিবাদলায় কেউ এমন অজগাঁয়ে আসে! চাঁদু বেঁচে গিয়েছে।”
“বেঁচে গেল, কিন্তু মজাটা জানতে পারল না। চাঁদু কথায় কথায় বাড়ি ছোটে কেন বলতে পারো?”
“ও বোধ হয় হাসপাতালের চাকরি ছেড়ে দেবে। বাড়ি গিয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিস নিয়ে বসবে।”
“পারবে?”
“পারবে। মন বসাতে পারলে। চাঁদু দারুণ ছেলে। তবে কিকিরা, চাঁদু কলকাতা ছেড়ে চলে গেলে আমি মরে যাব। ও আমার বন্ধু, ভাই, গার্জেন…”
কিকিরা হেসে বললেন, “তুমি এক কাজ করো।”
তারাপদ তাকিয়ে থাকল।
কিকিরা মজার গলায় বললেন, “কম্পাউন্ডারিটা শিখে নাও। চাঁদুর ‘কম্প’ হয়ে পাশে পাশে থাকতে পারবে।”
তারাপদ হেসে ফেলল। বলল, “তা ঠিক।…তবে আমি একটা চিরকুট রেখে এসেছি চাঁদুর কোয়ার্টারে। কাল পরশু ফিরলেই জানতে পারবে।”
.
৷৷ ২ ৷৷
হাত-পা ধুয়ে ভিজে পোশাক পালটে কিকিরারা চা খেতে বসলেন। বেলা প্রায় এগারোটা। বৃষ্টি ধরে রয়েছে, তবে আবার নামবে।
চা খেতে খেতে কিকিরা যশোদাকে বললেন, “কই, সেই কাগজগুলো দিন, দেখি।”
যশোদা আগেই নিয়ে এসেছেন কাগজের চিরকুটগুলো। জামার পকেটেই ছিল। এগিয়ে দিলেন।
কিকিরা হাত বাড়িয়ে নিলেন কাগজগুলো। দেখলেন একবার। একই ধরনের কাগজ। এক্সারসাইজ খাতার সাদা পাতা। লেখার কালি কলমও এক। হীরালালের হাতের লেখা চলনসই।
