“ঠিক আছে চলুন। তা যশোদাবাবু, বাসটা থেকে আমরা দুজন মাত্র নামলাম এখানে। আর তো কেউ নামল না।”
“ওইরকমই। এক-আধজনই লামে এখানে। হাটের দিনে অবশ্য ভিড় হয়। ওই ওপাশে মঙ্গলঘাটা বলে একটা জায়গায় হাট বসে রবিবার। পাইকাররা আসে। অন্যদিন ভোঁ-ভা।”
“অনাথালয়টা কাদের?”
“মিশনারি সাহেব বাবুদের পয়সায় তৈরি। শুনেছি কোন এক নামকরা বিদেশি মেমসাহেব এদিকে একবার বেড়াতে এসে টাকা-পয়সার ব্যবস্থা করে দিয়ে গিয়েছিলেন। অন্যরাও টাকা দেয়। ওদের নিজেদের একটা পুরনো জিপগাড়ি আছে। কাজেকর্মে বাইরে যায়।”
কিকিরারা হাঁটতে শুরু করেছিলেন। কাঁচা রাস্তা। হাত-কয়েক চওড়া মাত্র। জল কাদায় পা রাখা দায়। মাঝে মাঝে ইটের টুকরো, ভাঙা পাথরের চাঁই ফেলা রয়েছে। দু’পাশে নিচু জমি। কোথাও কোথাও আধখাপচাভাবে চাষ হয়েছে, কোথাও সবজি বাগান, ছোট একটা নার্সারিও চোখে পড়ল।
তারাপদ তেমন খুশি হচ্ছিল না। কিকিরা দিন-দিন যেন ছেলেমানুষ হয়ে যাচ্ছেন। কোথাকার কে হীরালাল বলে এক ভদ্রলোক দিন চার-পাঁচ হল তাঁর বাগান থেকে উধাও। ভদ্রলোক নাকি বড়সড় কারবারি, কলকাতা শহরে তিনটে আর হাওড়ায় একটা কাপড়ের দোকান। ছোটখাটো দোকান নয়। মস্ত দোকান। বেশ নামডাক আছে দোকানগুলোর, হাজার হাজার টাকার কারবার করেন। তা করুন কারবার, ভাল কথা। তা ওই ভদ্রলোক–হীরালালবাবু,–বছর তিন-চার আগে এদিকে অনেকটা জমি কিনে তাঁর শখের কৃষ্ণধাম’ বলে একটা বাগানবাড়ি তৈরি করিয়েছিলেন। বাগানবাড়ি বলতে ঠিক যা বোঝায়–তেমন বাড়ি অবশ্য নয়। একটা ছোট বাড়ি, আর আশপাশে বাগান–ফলফুলুরির। লোকজন রেখেছিলেন নিজের পছন্দ মতন। প্রত্যেক হপ্তায় শুক্রবারে হীরালাল তাঁর কৃষ্ণধামে চলে আসতেন। থাকতেন সোমবার পর্যন্ত। ওঁর স্ত্রী বিগত। সংসারে ছেলেমেয়েরা আছে। তাদের বয়েসও কম হল না। বাবার ব্যবসা ছেলেরাই দেখে। হীরালালবাবু নিজে ব্যবসাপত্র থেকে ধীরে ধীরে সরে এসেছেন। তবু তিনি থাকা মানে মাথার ওপর ছাতা থাকা। ইদানীং ভদ্রলোক কেমন যেন হয়ে যাচ্ছিলেন। উদাস, নিস্পৃহ। তিনি কোনও ব্যাপারেই মন বা নজর দিতে চাইতেন না। একেই বোধ হয় বলে বৃদ্ধ বয়সের সংসার বৈরাগ্য।
গত শুক্রবার হীরালাল যথারীতি তাঁর কৃষ্ণধামে চলে আসেন। সঙ্গে যশোদা। যশোদা হীরালালের নিত্যসঙ্গী। বন্ধু নয়, কর্মচারী। হীরালালের যৌবনকাল থেকে পাশে পাশে আছেন। দুঃখের দিনের সঙ্গীকে সুখের দিনেও ছাড়েননি হীরালাল। সম্পর্কটা প্রায় বন্ধুর মতন হয়ে উঠেছিল। লোকে জানে, যশোদা হলেন হীরালালের ম্যানেজার এবং বিশ্বস্ত বান্ধব।
গত শনিবার বিকেল থেকে হীরালালকে কৃষ্ণধামে পাওয়া যাচ্ছে না। পাওয়া যাচ্ছে না–সে অন্য কথা। কিন্তু হীরালালের হাতে লেখা যে তিনটি চিরকুট পাওয়া গিয়েছে–সেটাই মারাত্মক।
চিরকুটগুলো পড়লে ধাঁধা লেগে যায়। মনে হয়: (১) হীরালাল আত্মহত্যা করার কথা ভাবছিলেন, (২) আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত তিনি নিয়ে নেন সম্প্রতি, (৩) সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর হীরালাল আত্মহত্যা করতে যাচ্ছেন বলে একটা চিরকুট লিখে রেখে উধাও হয়ে গিয়েছেন।
শনিবার বেলার দিকে হীরালাল যশোদাকে একটা কাজে পাঠিয়েছিলেন। কাজটা মোটেই জরুরি নয়। মাইল চারেক দূরে ‘বৈকুণ্ঠ নার্সারি’-তে গিয়ে খোঁজ করতে হবে তারা সত্যি সত্যি নার্সারি বিক্রি করার কথা ভাবছে কিনা! যদি বিক্রি করাই ঠিক করে থাকে–তবে জমিজায়গা নার্সারি সমেত দরদাম কী পড়তে পারে।
যশোদা যেতে চাননি। কী হবে নার্সারিতে, বা জমিজায়গায়! ঈশ্বরের কৃপায় বড়বাবু–মানে হীরালালের তত কম সম্পদ নেই; তা হলে অযথা আর সম্পত্তি বাড়ানো কেন? তা ছাড়া একটা পড়তি নার্সারি সম্পত্তি হিসেবেও কেনার কোনও মানে হয় না। আপত্তি সত্ত্বেও যেতে হল যশোদাকে; হাজার হোক বড়বাবুর হুকুম।
মেঠো রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে যশোদা বৈকুণ্ঠ নার্সারিতে গিয়েছিলেন। ফিরতে ফিরতে বিকেল। ফিরে এসে আর বড়বাবুকে দেখেননি।
আশপাশে কোথাও আছেন ভেবে যশোদাও আর হীরালালের খোঁজ করেননি তখন। যশোদারও বয়েস হয়েছে; যাওয়া-আসায় আট মাইল। তাও মেঠো পথে। সাইকেল চালাবার ধকল সামলে যশোদা যখন খানিকটা সামলে নিয়েছেন নিজেকে, তখন বড়বাবুর খোঁজ করলেন। ভাদ্রমাসের বিকেল ততক্ষণে মরে গিয়ে অন্ধকার নেমে এসেছে। এখানে ইলেকট্রিক নেই! কেরোসিনের বাতিতেই কাজ চালাতে হয়। মাঝে মাঝে বড়বাবুর খেয়ালে কৃষ্ণধামের বারান্দায় একটা ছোট পেট্রম্যাক্স বাতি জ্বালানো হয়। চতুর্দিক ফাঁকা, যেদিকে তাকাও মাঠ আর গাছপালা আর অন্ধকার। ওর মধ্যে পেট্রম্যাক্স বাতিটা যেন আকাশের তারার মতন দেখায়। অবশ্য জ্যোৎস্নার দিনে বাতি জ্বালানো হয় না বাইরে। তখন অঢেল জ্যোৎস্না আর জোনাকির নৃত্যই যেন কৃষ্ণধামকে ঘিরে থাকে।
সন্ধের মুখেও হীরালালকে দেখতে না পেয়ে যশোদা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। কাজের লোক তিনজন। একজন রান্নাবান্না নিয়ে থাকে, অন্যজন ঘরদোর সাফসুফ রাখে। তৃতীয়জনের কাজ হল জল তোলা আর চৌকিদারি। বাড়তি দু’জন মালি আসে হপ্তায় তিনদিন। তারা বিকেল-বিকেল চলে যায়।
কাজের লোকরা বলতে পারল না বড়বাবু কোথায় গিয়েছেন। তাঁকে বিকেলের পরে তারা দেখেছে। তারপর আর দেখেনি।
