কিকিরা মাথা নাড়লেন ধীরে ধীরে, চন্দনের দিকে তাকালেন। তারপর পকেটে হাত ডুবিয়ে একটা কাগজ বার করলেন। কৃষ্ণকান্তর দিকে তাকালেন এবার। বললেন, “না কৃষ্ণকান্তবাবু, দশ-পনেরো হাজারের ব্যাপার নয়। টাকার দিক থেকে লাখ সওয়া লাখও হতে পারত। তবে টাকাটাও এখানে বড় কথা নয়। অন্য ভ্যালু আছে ঘড়িটার। এই কাগজটাটাইপ করা কাগজটা–আজ লাজোস কোম্পানির ম্যানেজারসাহেব আমায় দিয়েছেন। এতে ঘড়িটার কথা মোটামুটি লেখা আছে। দেখবেন?”
“আপনিই বলুন।”
কিকিরা কাগজের লেখাটা দেখে-দেখে বলতে লাগলেন :
“ঘড়িটার মালিক ছিলেন আদতে এক ইটালিয়ান ধনী। ভদ্রলোক পরে হাঙ্গেরিতে চলে যান। ১৯১৪ সালে ভদ্রলোক বুদাপেস্ট শহর থেকে নিখোঁজ হন। কেউ তাঁকে খুন করে। পরে এক জাহাজের বরফঘরে তাঁর মৃতদেহ পাওয়া যায়। জাহাজটা ভারতের দিকে আসছিল। ভদ্রলোকের নাম ফিলিপপো। তাঁর স্ত্রী এবং মেয়ে ছাড়া আর কেউ ছিল না। স্ত্রী হাঙ্গেরিয়ান। স্ত্রী এবং মেয়ে মিলে “লাজোস কোম্পানি চালাতে থাকেন। মেয়ের ছেলেমানে নাতির নাম লাজোস এজরি। এই পরিবার একসময়, হাঙ্গেরির জুবা ইহুদিদের মধ্যে গোপনে অনেক কাজ করত। সাঁইত্রিশ সালের আগেই অনেক ইহুদিকে এরা বিদেশে সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা করেছিল। পরে, হিটলারের সময় গোটা পরিবারকে হাঙ্গেরি থেকে তাড়িয়ে, আরও হাজার হাজার ইহুদির সঙ্গে লেবার ক্যাম্পে রেখে, অত্যাচার করে মেরে ফেলা হয়। মাত্র একজন পালিয়ে বেঁচে গিয়েছিল। তিনিই এখন লাজোস কোম্পানির মালিক। এঁর নাম মোর। লাজোসদের পারিবারিক সংগ্রহে অনেক কিছুই একে-একে জোগাড় করা হয়েছে খুঁজে পেতে। আদিপুরুষের ঘড়িটার খবর পেয়ে এখন তাঁরা সেটি ফেরত পেতে চান।”
সিনহার যেন বিশ্বাস হল না। বললেন, “আশ্চর্য ব্যাপার, মিস্টার রায়। ঘড়িটা কলকাতায় আছে এ-খবর ওরা পাবে কেমন করে?”
“কলকাতাতেই আছে তা হয়ত পায়নি। তবে এদেশের কোনো বড় শহরে রেয়ার ওয়াচ ডিলারদের কাছে আছে, জানতে পেরেছিল। সব বড় শহরের কাগজে বিজ্ঞাপনটা বেরিয়েছে–এ কথা ম্যানেজার সাহেব আমাদের বলেছেন। আরও বলেছেন, দিল্লির এক রেয়ার কালেকশা ডিলারের কাছ থেকে বোধ হয় ওঁরা শুনেছেন ঘড়িটা কলকাতায় থাকতে পারে।” কিকিরা বললেন।
সকলেই চুপ করে থাকল।
রাত হয়ে যাচ্ছে। কিকিরা ওঠার জন্য প্রায় দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন। কী মনে করে বাবলুকে বললেন, “তোমার ওই ফক্স, অক্স, বক্স লেখার মানে কী, বাবা?”
বাবলু বলল, “কাগজটায় লেখা নেই?”
কিকিরা হাসলেন। “আছে। বলব? এই কাগজ দেখে বলছি। বলি। ঘড়ি যদি আসল হয় তবে তার পেছনে একেবারে খুদে-খুদে অক্ষরে একটা মনোগ্রাম খোদাই করা আছে। গায়ে-গায়ে জড়ানো। তাতে এফ. ও. বি লেখা। মানে সেই মৃত বৃদ্ধের পুরো নামের আদ্যাক্ষর ফিলিপপো ও.বি। তুমি সেটা সাঁটে ফক্স, অক্স, বক্স করেছ?”
বাবলু মাথা দুলিয়ে বলল, “মাথায় এল, করে ফেললাম।” অত ভাবিনি। ফক্স, অক্স, বক্স মিলে যাচ্ছিল–তাই!”
রাত হয়ে যাচ্ছিল। কিকিরা এবার উঠে দাঁড়ালেন।
“এবার আমাদের যেতে হয়, কৃষ্ণকান্তবাবু। চলুন সিনহাসাহেব! আপনাকে স্যার ধন্যবাদ। আপনার টোটো সত্যিই ওয়ান্ডারফুল।”
তারাপদরাও উঠে দাঁড়াল।
চন্দন সিনহাসাহেবকে বলল, “ওই দুগারের কী হবে?”
সিনহা বললেন, “আজকের মতন তো তাকে আমার হোটেলের দরোয়ানদের জিম্মায় দিয়ে এসেছি। কাল দুগারের অফিস আর থানা-পুলিশ করতে হবে।”
ওঁরা বাইরে এলেন। কৃষ্ণকান্ত গাড়ি দাঁড় কক্কিয়ে রেখেছেন বাইরে। কিকিরাদের বাড়ি পৌঁছে দেবে গাড়ি।
“চলি মশাই, নমস্কার।”
“নমস্কার। আপনাদের কী বলে ধন্যবাদ দেব, জানি না। “ কৃষ্ণকান্ত বললেন, কৃতজ্ঞতার যেন শেষ নেই তাঁর। “আমি আপনার সঙ্গে কালই দেখা করব।”
সিনহা মজা করে বললেন, “উপায় নেই, দেখা করতেই হবে।”
কিকিরা, তারাপদরা গাড়িতে উঠে পড়লেন।
৩.১ কৃষ্ণধাম কথা
বাসটা ঠিক জায়গাতেই নামিয়ে দিল। রাস্তা ঘেঁষে বটগাছ। একটার গায়ে গায়ে আরেকটা। বাসস্টপের নাম ‘জোড়া বটতলা’। বৃষ্টি পড়ছে তখনও। তবে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। আকাশে মেঘ। চেহারা দেখে মনে হয় সারাদিনেও এই বাদলা ঘুচবে না। আশপাশে গাছগাছালি, ঝোঁপ, জংলা লতাপাতা। একপাশে একটা ভাঙা মন্দির। অন্যপাশে, সামান্য তফাতে, কোন এক মিশনারিদের অনাথালয়। চারদিকে পাঁচিল তোলা। ফটকটাও দেখা যায়।
বটগাছের তলায় ছাতা হাতে যশোদাজীবন দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরনে ধুতি, মালকোঁচা মেরে পরেছেন যেন। গায়ে একরঙা শার্ট। পায়ে বর্ষা-জুতো, আজকাল বাজারে যা দেখা যায়।
কিকিরা দেখতে পেয়েছিলেন যশোদাকে।
“আমি আধঘণ্টাখানেক দাঁড়িয়ে আছি,” যশোদা কয়েক পা এগিয়ে এলেন। “বাসটা তাহলে পেয়েছেন! দিনটা বড় খারাপ আজ।”
কিকিরা বললেন, “কেন, সময়েই তো পৌঁছে গেলাম। ক’টা বাজে এখন? দশটার বেশি নাকি?”
“না, না, ওইরকমই হবে।…এদিককার বাস কম। গোটা তিন-চার। খারাপ হয়ে গেলে তাও কমে যায়। তার ওপর দিন বুঝে বাস চালায়। আজ দিনটা একেবারে পুরো বর্ষার মতন। আসুন–।”
কিকিরা তারাপদকে ইশারা করলেন এগিয়ে যেতে। যশোদাকে বললেন, “কত দূর যেতে হবে?”
“বেশি নয়। মিনিটবিশেক হাঁটতে হবে। রাস্তা ভাল নয়, কাঁচা। কাদায় পা ডুবে যায়…”
