প্রথম দিকের ঘটনা সবই মিলে গেল। নিজেদের ক্লাবে বসে চা-মুড়ি খাওয়া, খবরের কাগজের পাতায় একটা বিজ্ঞাপন দেখা–সবই ঠিক। এটাও ঠিক যে, বাবলু বিজ্ঞাপনের পাতার টুকরোটুকু ছিঁড়ে নিয়ে এসেছিল। কারণ সে দেখতে চাইছিল, তাদের বাড়িতে ঠাকুরদার যে পকেট ঘড়িটা পড়ে আছে–সেই ঘড়ি আর এই কাগজের লেখা ঘড়িটা একই কিনা!
পরের দিন সে আলমারি থেকে ঠাকুরদার ঘড়িটা বার করে নেয়।
“দেখলে একই ঘড়ি?” কিকিরা বললেন।
“হ্যাঁ। কিন্তু কাগজে যা বেরিয়েছিল তাতে পুরোটা–ডিটেল ছিল না অত। মোটামুটি ছিল। বোঝা যায় একই ঘড়ি।”
“তবু পুরোপুরি শিওর হওয়া যায় না!”
“খটকা থাকে।”
“তোমাদের ক্লাবে আড্ডাখানায় চা-মুড়ি খেতে-খেতে হঠাৎ বিজ্ঞাপনটা তোমাদের চোখে পড়ায় তুমি বন্ধুদের বলেছিলেএরকম একটা ঘড়ি তোমাদের বাড়িতে আছে?”
“বলেছিলাম। ওরা তেমন কেউ কান দেয়নি।”
“পরের দিন ঘড়িটা বার করলে। দেখলে। কাগজের সঙ্গে মিলিয়ে নিলে। খুকু সেদিনই দেখল তোমার কাছে ঘড়িটা। সেদিনই আবার তুমি পবনের কাছে গিয়েছিলে বিকেলের দিকে, ধীরাজের সঙ্গেও দেখা হয়েছিল। তখন আর ঘড়ির কথা বলোনি?”
“না।”
তারাপদ কিছু জিজ্ঞেস করবে ভাবছিল। করল না। চন্দনও চুপ। সিহাসাহেব আরও একটা সিগারেট ধরালেন।
“তারপর?”
“সেদিন সন্ধের দিকে বাড়ি ফিরে এসে আমি একটা ফোন করি। কাগজে ফোন নম্বর ছিল। নিচে, পাশের অফিস ঘর থেকে ফোন করেছিলাম। ভেবেছিলাম, কাউকে পাব না। পেয়ে গেলাম। একটা লোক ফোন ধরল।”
কিকিরা তাকালেন তারাপদদের দিকে। এই পর্যন্ত তিনি ঠিকই অনুমান করেছিলেন।
বাবলু নিজেই পরের ঘটনাগুলো বলে চলল। ফোনে যাকে পেল, সে স্পষ্ট বাংলা বললেও তার কথায় একটু অন্যরকম টান ছিল। লোকটার কথাবার্তা বলার ভঙ্গি থেকে বাবলুর কেমন সন্দেহ হচ্ছিল। মনে হল, লোট্টা ধূর্ত; ভালও নয়।
“কী বলল সে?” কিকিরা জিজ্ঞেস করলেন।
“বলল, জিনিসটা আগে দেখা দরকার। আরও দু-একজন যোগাযোগ করেছিল, পরে দেখা গেছে, তাদের কথা ঠিক নয়। কাজেই আগে জিনিসটা দেখতে হবে। অযথা কথাবার্তা বলার জন্যে ওই ঠিকানায় দেখা করে লাভ নেই।”
“তোমার নাম-ঠিকানা জানতে চেয়েছিল?”
“হ্যাঁ। আমি আমাদের ঠিকানা দিলাম না, শুধু বললাম লেক গার্ডেন্সে থাকি। নাম বলেছিলাম। …ও তখন বলল, ঘড়িটা আগে একবার দেখা দরকার। তাতে অসুবিধে হবে না ওর পক্ষে, ও নিজেও কাছাকাছি থাকে। একসময়ে জিনিসটা দেখতে পারে।” বলে বাবলু একটু যেন ইতস্তত করল, দেখল বাবাকে। পরে নিচু গলায় বলল, “আমার একটু ভুল হয়ে গেল। আমি লোকটাকে দেখতে চাইছিলাম। ভাবছিলাম, ওকে বাজিয়ে দেখতে হবে, ধরব ওকে।”
“বুঝেছি! তুমি ওকে দেখা করতে বললে সকালবেলায়, লেকের কাছে?”
“বললাম, আমি রোজ সকালে লেকে দৌড়তে যাই। আমার গায়ে নীল-সাদা ট্রাকসুট থাকে। কাল সকাল সওয়া ছটা নাগাদ আমি স্টেডিয়ামের দিকে দৌড়ব। ঘড়ি আমার কাছে থাকবে সে যদি চায়, দেখতে পারে। তবে ঘড়ি যদি মিলে যায় বাকি কাজটা আমার বাবা ঠিকানামতন জায়গায় গিয়ে করবেন। ও রাজি হয়ে গেল। ভাবল, সত্যি-সত্যি ঘড়িটা আমার কাছে পাবে।…আমি বুঝতে পারিনি, লোকটা আমার চেয়েও বেশি চালাক। সে আমাকে ওইভাবে তুলে নিয়ে যাবে, গুণ্ডা এনে! ভীষণ ভুল হয়ে গিয়েছিল!”
“ছেলেমানুষের মতন কাজ করেছিলে, হঠকারিতা।”
বাবলু মুখ নিচু করে থাকল। বলল, “কী করে বুঝব, আমার পাড়ায় এসে ও আমাকে ওভাবে তুলে নিয়ে যাবে! আমি ভাবতেই পারিনি। আমার মনে হয়েছিল লোকটা ভাল নয়। চি। বদমায়েশ। হয়ত লোক ঠকিয়ে বেড়ায়। ওকে ধরব।”।
“তোমার সঙ্গে সিনহাসাহেবের দেখা হয়েছিল সকালে খানিকটা আগে; তাঁকেও তো একবার বলে রাখলে পারতে যে, তুমি…”
“না, আমি বলিনি।”
“ওভার কনফিডেন্ট ছিল আর কী!” সিনহাসাহেব বললেন।
কিকিরা বললেন, “যাক গে, ঘড়িটা কোথায়?
বাবলু মাথা চুলকে বলল, “আমার ঘরেই আছে। পলিথিনের ব্যাগে মোড়া আমার ছোট গামবুটের মধ্যে।”
কৃষ্ণকান্ত অবাক হয়ে বললেন, “সে কী রে! আমরা এত খুঁজলাম। গামবুটের মধ্যে ঘড়ি রাখবি, ভাবতেই পারিনি!..ওখানে কেন রেখেছিলি?”
“খুকুর ভয়ে। ও আমার ঘরে সব জিনিস হাতড়ায়। ওর হাতে পড়লে তোমাদের দিয়ে দেবে। গামবুটের মধ্যে ঘড়ি! ওর মাথায় অত বুদ্ধি হবে না যে, জুতো হাতড়াবে।”
কৃষ্ণকান্ত আর কী বলবেন! কিকিরা হাসলেন।
“যারা তোমায় ধরে নিয়ে গিয়েছিল,” কিকিরা বললেন, “তার মধ্যে ওই লোকটার নাম হীরা দুগার। জানো তুমি?”
“পরে জেনেছি। আগে জানতাম না।…ফোনে ও আমায় ওর নাম বলেনি, বলেছিল, নাম জেনে কী হবে, ও অফিস-এজেন্ট, আমায় খুঁজে নেবে আমার ট্রাকসুট দেখে।”
“তোমায় ওরা সোজা ওই বাড়িটায় নিয়ে যায়!”
“না। প্রথমে তিনদিন অন্য জায়গায় রেখেছিল। তারপর ওই বাড়িটায় নিয়ে যায়।” বলে বাবলু নিজেই বলল, “আমায় ওরা ভয় দেখাত। বলত, খুন করে ফেলবে। চড়চাপড়, ঘুষি মারত। ওরা চাইত, আমি একটা কাগজে লিখে দিবাবা যেন ঘড়িটা নিয়ে হীরার কথামতন জায়গায় তার সঙ্গে দেখা করে। আমি লিখে দিতাম না।…তবে ওরা যেমন আমায় নজরে-নজরে রাখত সব সময়, স্নান খাওয়াও করতে দিত।”
বাবলু চুপ করে গেল।
কৃষ্ণকান্ত বললেন, “একটা সোনার অচল ঘড়ির জন্যে এত! কী এর দাম! দশ-পনেরো হাজার। ব্যাঙ্ক লুঠ নয়, লাখ দু লাখ টাকার গয়না চুরি নয়–মাত্র দশ বারো হাজার টাকার জন্যে ছেলেটাকে কিডন্যাপ করল! মানুষ যে। আজকাল কী হয়ে গিয়েছে!”
