“বাবলু?”
বাবলু বুঝি আশাই করেনি এভাবে আচমকা তাকে কেউ বাঁচাতে আসবে! বিহ্বল হয়ে থাকল। মুখে কথা আসে না।
“বাতিটা জ্বেলে দিন। …আজ বাতি জ্বালতেও লোক আসেনি।” বাবলু শেষমেশ বলল।
লাইটারের আলোয় আধভাঙা সুইচ খুঁজে বাতিটা জ্বেলে দিল চন্দন। বাতি জ্বালার পর বাবলুকে চোখে পড়ল।
হাসপাতালের লোহার খাটের মতন একটা খাট একপাশে, তার ওপর মামুলি শতরঞ্জি, চাদরটাদর নেই। খাটের পায়ার সঙ্গে বাবলুর একটা পা নাইলনের দড়ি দিয়ে বাঁধা। এমনভাবে চালাকি করে বাঁধা যে, গিটটা খোলা যাবে না সহজে। জলের একটা জা মাটিতে নামানো। ঘরের এককোণে একটা এঁটো থালা, টিফিন কেরিয়ার।
বাবলুর পরনে বেখাপ্পা ময়লা পাজামা, গায়ে হাফহাতা বুশ শার্ট, সেটাও ময়লা। ওর চোখমুখ অসম্ভব শুকনো, নোংরা দেখাচ্ছিল। গালে দাড়ি গজিয়েছে ক’দিনে। রুক্ষ চুল মাথায়।
বাবলু সিহাকে চিনতে পারল। অন্য কাউকে সে চেনে না। অবাক হয়ে বোকার মতন তাকিয়ে থাকল। যেন তার বিশ্বাসই হচ্ছিল না এত লোক তার ঘরে আসতে পেরেছে! টোটোকে সামলানো যাচ্ছে না। সিনহা ধমক দিলেন।
সিনহাই কথা বললেন, “বাবলু, এঁরা তোমার বাবার পাঠানো লোক। তাঁর হয়ে তোমায় খুঁজে বেড়াচ্ছেন ক’দিন। কী হয়েছিল তোমার?”
বাবলু জল খেতে চাইল। জাগে আর জল নেই। কোনো রকমে গলা ভেজানো গেল।
বাবলু বলল, “অন্যদিন সন্ধেবেলায় একটা লোক এসে আলো জ্বেলে দিয়ে যায়। জল দেয়, খাবার। আজ আসেনি।”
“খেতে দেয় না?”
“দেয়। দু বেলাই দেয়। চা-পাউরুটি দিয়ে যায়। আজ বিকেলে এসে চা দিয়ে গেল। আর এই..” বলে নাইলন দড়ির বাঁধন দেখাল।
ছোট ঘর। একটিমাত্র জানলা। লোহার শিক দেওয়া জানলা। শিকগুলো মোটা। বাইরের দিকে ভাঙা খড়খড়ি।
তারাপদ সরে গিয়ে ঘরের লাগোয়া বারান্দার দিকে গেল। সরু একটু বারান্দা। লোহার তারের জালি দিয়ে ঘেরা। ছোট্ট একটু কলঘর। বালতিতে জল নেই। ফুরিয়ে গিয়েছে।
কিকিরা বাবলুর বাঁধন খুলে দিতে লাগলেন। দিতে-দিতে মনে মনে হাসলেন। ভাল ম্যাজিশিয়ানরা বিশরকমের নট মানে গিঁট দেওয়া আর খোলা জানে। এ তো নেহাতই ছেলেখেলা তাঁর কাছে!
সিনহা কিকিরাকে বললেন, “এখানে আর দাঁড়িয়ে কাজ নেই, জায়গা ভাল নয়; চলুন আমরা চলে যাই। ফিরে গিয়ে যা শোনার শোনা যাবে।”
কিকিরা রাজি।
বাইরে এসে সিঁড়ি নামার মুখেই দেখা গেল দু-তিনটে লোক। তার মধ্যে হীরা দুগারও রয়েছে। লোক দুটো পাকা গুন্ডা গোছের। বোঝাই যায়, দুগার কোনো মতলব নিয়ে এসেছে। হয়ত সরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছে বাবলুকে।
সিঁড়ির মুখে এত লোক আর কুকুর দেখে দুগাররা হকচকিয়ে গিয়েছিল। তারপর তারা আচমকা পিছু হটে পালাবার চেষ্টা করল।
দুগার পালাতে পারল না। সিনহা টোটোকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। চোখের পলকে সে দুগারের গায়ে গিয়ে ঝাঁপ মারল। অন্যজন গড়িয়ে পড়ল সিঁড়ি দিয়ে। একজন পালিয়ে গেল।
আচমকা হট্টগোল শুনে দু-চারজন– যারা ওই বাড়িটায় মাথা গুঁজে থাকে, তারা বেরিয়ে পড়েছিল।
দুগার আর এক-পাও নড়তে পারছিল না। টোটো তার বুকের সামনে দু পা তুলে দাঁড়িয়ে। অন্য দুটো পা দুগারের কাঁধে।
কিকিরা বললেন, “সিনহাসাহেব, এই সেই দুগার। হীরা দুর্গার। …বাবলু, এই লোকটা তোমাকে ধরে এনেছিল না?”
বাবলু মাথা নাড়ল। বলল, “না। ও গাড়িতে ছিল। গাড়ি চালিয়েছে ও। অন্য দুটো গুন্ডা আমাকে আচমকা ধরে ফেলে গাড়ির মধ্যে নিয়ে গিয়ে ঢুকিয়ে দেয়। তারপর একজন আমায় ওষুধ শুকিয়ে অজ্ঞান করে ফেলে।”
দুগার কিছু বলবার চেষ্টাও করল না। কুকুরটার বিশাল মুখ যেন দুগারের নাক ছুঁয়ে আছে।
“এই লোকটা তোমাকে এখানে এনে আটকে রেখেছিল না?” কিকিরা বললেন।
“হ্যাঁ” বাবলু বলল। “ও আমাকে প্রথমে অন্য এক জায়গায় নিয়ে গিয়ে আটকে রেখেছিল। তারপর এখানে এনেছে।”
“এরা তোমায় মারধোর করত?”
“করেছে বার কয়েক।”
সিনহা বললেন, “ঠিক আছে। এর ব্যবস্থা হবে। জায়গাটা ভাল নয়। গুড়ার দল এসে বোমা ছোঁড়াছুড়ি করতে পারে। এখন বাড়ি চলল।” বলে টোটোকে ডাকলেন।
টোটো তার শিকার যেন ছাড়তেই চায় না। শেষে ছেড়ে দিল।
দুগার আর পালাবার চেষ্টা করল না।
.
১২.
কৃষ্ণকান্ত যেন ভাবতেই পারেননি এইভাবে ছেলেকে তিনি ফেরত পাবেন। বাড়ির মধ্যে হট্টগোল পড়ে গেল। চুপচাপ বিমর্ষ বাড়ি জেগে উঠল আবার।
কৃষ্ণকান্তর বসার ঘরে ওঁরা সকলেই বসে : কিকিরা, তারাপদ, চন্দন এমনকি সিহাসাহেবও। কৃষ্ণকান্ত বসে আছেন। আবেগে, কৃতজ্ঞতায় তাঁর চোখে জল জমে আছে। জল, মিষ্টি খাওয়া শেষ। চা-সিগারেট খেতে-খেতে কিকিরা সময় জানতে চাইলেন। সাড়ে আটটা বেজে গিয়েছে। কৃষ্ণকান্ত বললেন, “বাবলু আসছে; আর-একটু বসুন দয়া করে। রাত হলেও ভাববেন না; আমার গাড়ি গিয়ে আপনাদের পোঁছে দিয়ে আসবে। মিস্টার সিনহার তো কোনো তাড়াই নেই, কাছেই বাড়ি।”
সিনহাসাহেব বাবলুদের নামিয়ে দিয়ে বাড়ি ঘুরেই এসেছেন। রেখে এসেছেন টোটোকে।
বাবলু এল। তাড়াতাড়িতে স্নান সেরে এসেছ। তবু তাকে বেশ অবসন্ন দেখাচ্ছিল।
কিকিরা ডাকলেন বাবলুকে। বললেন, “এসো৷ বসো ওখানে।…কদিন ধরে ভোগালে খুব! কী হয়েছিল বলো তো, বাবা।”
বাবলু বসল না। কেমন যেন কুণ্ঠিত। অপর ঘটনাগুলো বলতে লাগল।
