.
তেকোনা নেড়া ছোট পার্কের একপাশে গাড়িটা দাঁড়াল।
ততক্ষণে সন্ধে হয়ে গিয়েছে। গলির মধ্যে আলো কম। বরং অন্ধকারই বেশি। জায়গাটা অদ্ভুত! সাড়াশব্দ কম। লোক চলাচলও তেমন নয়। মাঝেসাঝে একটা গাড়ি চলে যায়, সাইকেল, স্কুটার। গ্যারাজটা পুরনো, ভাঙাচোরা চেহারা, তার গায়ে মস্ত এক নিমগাছ, গাছের প্রায় গায়গায় সেই পুরনো বাড়ি। এক্স সেলাস হোমই হয়ত। বাড়িটার চেহারা, এই ঝাপসা অন্ধকারেও জরাজীর্ণ মনে হল। কেউ যে ওবাড়িতে থাকে তাও মনে হয় না। তবু ছিটেফোঁটা আলো চোখে পড়ছিল।
তারাপদ আর চন্দন এসে হাজির।
তারাপদ বলল, “দোকানের লোকটা এখনো আসেনি।”
রাস্তায় নেমে পড়েছিলেন কিকিরা। সিনহা তখনো নামেননি। তিনি সারাটা পথই প্রায় টোটোর নাকের সামনে বাবলুর পুরনো জামাটা ধরে ছিলেন।
চন্দন বলল, “স্যার, বাড়িটার ফটক দিয়ে না গিয়ে আমরা বরং গ্যারাজের পেছন দিয়ে দিয়ে যেতে পারি।”
“কেন?”
“ওদিকে বাড়ির পাঁচিল ভাঙাচোরা। আমি দেখে এসেছি।”
সিনহা নেমে পড়লেন টোটোকে নিয়ে। বললেন, “ভাল সাজেশান। গোলমাল না করে ঢুকে পড়াই ভাল।”
গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখে সিনহা তাঁর কুকুর নিয়ে এগিয়ে চললেন। জামাটা আর হাতে নেই। এক সাইকেলঅলা আসছিল। বিরাট কুকুর দেখে ভয়ে তফাতে সরে পালিয়ে গেল।
গ্যারাজ চুপচাপ। এখন বন্ধ। সামনের দিকে বোধ হয় দরোয়ান গোছের কেউ থাকে। সে নিজের মনে উনুন জ্বালিয়ে রান্নাবান্না শুরু করেছে। চারটে লোক আর বাঘের মতন এক কুকুর দেখে ভয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।
কিকিরা কী মনে করে তার দিকে এগিয়ে গেলেন। কথা বললেন তার সঙ্গে।
“তুম দরোয়ানজি?”
“জি।“
“উয়ো মোকান?”
“মালুম নেহি।” দরোয়ানের ভয় আর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হল, সে ধরেই নিয়েছে এই লোকগুলো নিশ্চয়ই পুলিশের লোক, নয়ত কুকুর নিয়ে এমন
সময় আসে!
কিকিরা ধমক দিলেন। “ঝুটা মত্ বোলো! ঠিক সে বাতাও”
এর পর লোকটা যা বলল, তাতে বোঝা গেল, বাড়িটা প্রায় পরিত্যক্ত। দু-চারজন যারা থাকে, তারা হয় আজেবাজে লোক, না হয় মাতাল। বাড়িটায় গুন্ডা-বদমাশের আসা যাওয়া আছে। জুয়াখেলা চলে। হল্লাও হয় কখনো কখনো। একটা খুনও হয়েছিল বছর দুয়েক আগে।
সিনহা বললেন, “আমরা ওবাড়িতে যাব।”
দরোয়ান বলল, “ইয়ে কারখানাকো ভিতর সে চলে যাইয়ে, সাব।”
কারখানার ভেতর দিয়ে ভাঙা পাঁচিল টপকে বাড়িটার মধ্যে যাওয়া যায়।
সিনহা এগিয়ে গেলেন।
ভাঙাচোরা দু-একটা গাড়ি, একটা মিনিবাসের খাঁচা, দু-একটা সারাই গাড়ি, লোহার জঞ্জাল, আরও কত আবর্জনা পেরিয়ে ভাঙা পাঁচিলের ফাঁক-ফোঁকর পাওয়া গেল।
কিকিরারা ঢুকে পড়লেন বাড়িটার ভেতর।
সামান্য খোলা জায়গা, আগাছায় ভরতি। দুটো গাছ। বাড়িটা ভূতের মতন দাঁড়িয়ে। টিমটিমে আলো দু-চার জায়গায়। ভাঙা টিউবওয়েল। বড় একটা পাথরের পাশে একটা কল।
সাড়াশব্দ বিশেষ নেই।
সিনহাসাহেব টোটোকে এগিয়ে দিলেন।
টোটোই টেনে নিয়ে চলল। কাঠের ভাঙা সিঁড়ি। শুঁটকি মাছের মতন এক গন্ধ। ধুলো, ময়লা। ছেঁড়া কাগজ। একটা মাতালের চিল্লানি।
দোতলার শেষদিকের ঘরের কাছে এসে টোটো ঝাঁপিয়ে পড়ল।
দরজা তালাবন্ধ।
দরজায় ধাক্কা দিয়ে সিনহা ডাকলেন, “বাবলু! বাবলু!”
ভেতর থেকে সাড়া এল।
“একটু দাঁড়াও, আমরা আসছি।” বলে কিকিরাদের দিকে তাকালেন। “তালাটা ভাঙতে হবে।” টোটো অনবরত দরজার গায়ে আঁচড়াচ্ছে, ধাক্কা মারছে, মুখে চামড়ার স্ট্যাপের গার্ড পরানো, তবু আওয়াজ করছিল চাপা।
কিকিরা ভাবলেন, পকেট হাতড়ালেন। বাড়িতে তাঁর কাছে কতরকমের চাবি আছে। হ্যান্ড কাপ খোলারও চাবি পাওয়া যাবে এখনো। ম্যাজিশিয়াস “কী। কিন্তু এখন পকেটে কিছুই নেই। তাঁর চাবির রিংয়ের সঙ্গে দাঁত খোঁটার একটা ছোট আঁকশি অবশ্য আছে। মেটাল টুথ পিক। ছোটখাট একটা স্ক্রু ড্রাইভার পেলে হত। অন্তত একটু শক্ত তারের টুকরো।
“সবাই মিলে ধাক্কা মেরে দরজাটা ভাঙব?” তারাপদ বলল।
“না না,” কিকিরা বারণ করলেন। “শব্দ হবে। যারা এখানে দু-চারজন আছে, ধাক্কাধাক্কি শুনে এসে পড়বে। দাঁড়াও দেখি, কী করা যায় বলে কিকিরা দেশলাই বা লাইটার জ্বালাতে বললেন। “একটা টর্চ থাকলে ভাল হত। তারা, দেখো তো আশেপাশে যদি তারের টুকরো কিবা সরু মতন কিছু কুড়িয়ে পাও। .নিন, সিনহাসাহেব, ওকে একটু সরান, আর লাইটারটা চন্দনের হাতে দিন।”
“আপনি তালা খুলবেন?”
“চেষ্টা করে দেখি। আপনার টোটোর নাক আছে মানতেই হবে। আমি ম্যাজিশিয়ান, ওল্ড অ্যান্ড রিটায়ার্ড, তবু আমার হাত আছে, ম্যাজিশিয়ান্স হ্যান্ড…!” কিকিরা রসিকতা করে বললেন।
চন্দন লাইটারটা জ্বেলে ধরে থাকল তালার সামনে। এক নাগাড়ে বেশিক্ষণ জ্বালিয়ে রেখে ধরে থাকা যায় না, আঙুলে তাত লাগে। নিভিয়ে ফেলতে হয়। আবার জ্বালতে হয় সামান্য পরে।
কিকিরা চেষ্টা করেই যাচ্ছিলেন। তার পাওয়া গেল না কোথাও, একটা পুরনো পেরেক পাওয়া গেল। দাঁত খোঁচানো আঁকশি আর পেরেক দিয়ে চেষ্টা করতে-করতে শেষপর্যন্ত তালাটা খুলে গেল। কিকিরা বললেন, “জয় মা তারা।”
দরজায় ধাক্কা মারতেই পাল্লা দুটো দু পাশে যেন ছিটকে গেল। কিকিরা ঢুকে পড়লেন ঘরে।
অন্ধকার ঘর। কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। খোলা জানলা দিয়ে যেটুকু আলোর আভা আসছে ঘরের বাইরে থেকে, তাতেও কিছু দেখা যায় না।
