তারাপদ দেখছিল। বাড়িটার জানলাগুলো খড়খড়ির। রং আর চেনা যায় না! দোতলা বাড়ি। বাইরের দিকে বারান্দা বলে কিছু নেই। দেওয়ালের ফাটাফুটি জায়গা দিয়ে জল পড়ে-পড়ে শ্যাওলা ধরেছে, গাছের সরু ডাল, পাতা।
তারাপদ দেখছিল। চোখে পড়ল হঠাৎ সেই লোকটা ফিরে আসছে আবার বাড়িটার দিকে।
নিজেকে আড়াল করার উপায় ছিল না। তারাপদ ফিরে আসতে লাগল। লোকটা এবার তার পেছনে।
বড় রাস্তায় এসে লোকটা দাঁড়াল। তাকাল চারপাশ। তারপর দোকানে ঢুকে গেল।
তারাপদ রাস্তা পেরিয়ে কিকিরাদের খোঁজে রেস্টুরেন্টের দিকে পা বাড়াল।
.
কিকিরারা তখনো চা পাননি। মিনারেল ওয়াটারের বোতল, গ্লাস টেবিলে পড়ে আছে।
তারাপদ এসে বলল, “কিকিরা, আপনারা ওই দোকান থেকে বেরিয়ে আসার পর একটা লোকও বেরিয়ে এল। আপনাদের দেখছিল। তারপর গলির মধ্যে চলে গেল। লোকটাকে দেখে আমার সন্দেহ হল। তাকে ফলো করলাম।” তারাপদ যা যা দেখেছে, বলল কিকিরাদের।
কিকিরা হাতের কাগজটা আগেই পড়েছেন। চন্দনও। তবু কাগজটা হাতে দিল কিকিরার। বললেন, “লোকটা নিশ্চয় হীরা দুগার।”
চন্দন বলল, “বুঝলেন কেমন করে?”
“মন বলছে।”
“মন বললেই কি সত্যি হয়?”
“কখনো কখনো হয়। … আমি বলছি। বাবলু সেদিন তার নিরুদ্দেশ হওয়ার আগের দিন সন্ধেবেলায় নিশ্চয় লাজোসে ফোন করেছিল। যে-সময় ফোন করেছিল তখন দুগার আর দরোয়ান ছাড়া কারও থাকার কথা নয়। দরোয়ান দোকানের বাইরে বা ভেতরেও থাকতে পারে। তাতে কিছু আসে যায় না!”
“দুগার দোকানে ছিল, আপনি জানলেন কেমন করে?”
“কেন, ম্যানেজার সাহেবই তো বললেন যে, দুগারই একলা আটটা-সাড়ে আটটা পর্যন্ত থাকে। “
চন্দন মাথা নাড়ল। হ্যাঁ, ম্যানেজার তাই বলেছেন বটে! তবু বলল, “যদি অন্য কেউ থেকে থাকে!”
“সেটা পরে চেক করে নেব। ম্যানেজার সাহেব নিশ্চয় জানেন।”
তারাপদ বলল, “লোকটার ব্যাপার-স্যাপার আমার ভাল লাগল না, স্যার। কেমন যেন চোর-চোর ভাব। …আমার মনে হচ্ছে, ওই পুরনো বাড়িটা সন্দেহজনক। কে বলতে পারে বাবলুকে ওখানে আটকে রাখা হয়নি। …পুলিশকে বললে হয় না?”
কিকিরা মাথার চুলে আঙুল চালাতে-চালাতে ভাবলেন যেন। শেষে বললেন, “পুলিশ পরে। আগে সিনহা। সিনহা না বলেছিলেন, তাঁর কুকুরের গন্ধের নাক আবিলিভেবল। দেখা যাক, ভদ্রলোকের কুকুর এখন কী করে? উনি তো বড় মুখ করে বলেছিলেন, কোনো সাহায্যের দরকার হলে উনি অবশ্যই করবেন। সেটা সত্যি না মিথ্যে, পরখ করতে হবে। …চাঁদু, সিনহার হোটেলে যাওয়া যাক। এখন উনি নিশ্চয় থাকবেন।”
.
১১.
এই সময়টায় সচরাচর যেমন হয়। হঠাৎ-হঠাৎ বিকেলে ধুলোর ঝড় ওঠে, আকাশ কালচে দেখায়, এক-আধ পশলা হালকা বৃষ্টিও হয়ত হয়ে যায়– অনেকটা সেইভাবে শেষ বিকেলে ধুলোর ঝড়টড় উঠেছিল, একপশলা রাস্তা ভেজানো বৃষ্টিও হয়ে গেল। তারপর যেমন-কে-তেমন, আকাশ পরিষ্কার, বাতাসেও ঠান্ডা ভাব নেই।
সন্ধের আগেই রাজেন সিনহা আর কিকিরা বেরিয়ে পড়েছিলেন লেক গার্ডেন্স থেকে।
সিহাসাহেবের গাড়ি আছে হোটেলের। তাঁকে বাড়ি থেকে নিয়ে আসে, আবার পৌঁছেও দেয়। নিজের ব্যক্তিগত দরকার কিংবা অন্য কাজকর্মে তিনি হোটেলের গাড়িই ব্যবহার করেন। কিকিরাদের কাছে খবরটা শোনার পর তিনি সঙ্গে-সঙ্গে হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে পড়লেন। বাড়ি যাবেন। তাঁর কুকুর টোটোকে নিয়ে ফিরে আসবেন জায়গা মতন।
তাঁর পরামর্শ মতন তারাপদ আর চন্দন সন্দেহজনক বাড়ি আর পুরনো গ্যারাজের আশেপাশে থেকে গেল। তারা নজর রাখবে বাড়িটার দিকে। বলা যায় না, দুগার বা তার লোকজন যদি বিপদ বুঝে বাবলুকে বাড়ি থেকে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করে তবে তারাপদরা দেখতে পাবে! অবশ্য, আসল কথাটা হল, বাবলুকে ওই বাড়িতে আটকে রাখা হয়েছে কি না সেটা জানা? আর তার সঙ্গে দুগারের সম্পর্ক আছে কি না! কিকিরার অনুমান আর সন্দেহ সত্যি হতেও পারে, নাও পারে।
টোটোর মুখে স্ক্র্যাপের গার্ড পরিয়ে, তার গলায় বাঁধা চামড়ার মোটা বকলস পরিয়ে চেইন-কর্ডটা হাতে নিয়ে সিনহাসাহেব গাড়িতে উঠলেন।
“আপনি সামনে বসুন, কুকুরে আপনার বড় ভয়”, সিনহা বললেন গাড়িতে উঠতে উঠতে।
কিকিরা সামনের দিকে বসলেন। সিনহা কুকুর-সমেত পেছনের সিটে।
তখন আর ধুলোর ঝড়, আচমকা হালকা বৃষ্টির চিহ্ন নেই। আলো সরে গিয়েছে। ঘোলাটে, আবছা ভাব। প্রায় সন্ধে।
গাড়ি ছাড়তেই সিনহা হঠাৎ বললেন, “একটা কাজ করুন তো! মিস্টার দত্তরায়ের বাড়ির সামনে গাড়িটা দাঁড় করাই। ও বাড়ির লোক আপনাকে দেখেছে। চেনে। আপনি ওই বাড়ি থেকে ছেলেটির একটি শার্ট-প্যান্ট চেয়ে আনুন।”
“বাবলুর জামা প্যান্ট?”
“হ্যাঁ। আফটার অল, টোটো মাত্র একদিনই মিনিট আট-দশ বাবলুর সামনে ছিল। যদি তার গন্ধের নাক ভুল করে। করার কথা নয়, তবু আরও শিওর হওয়া ভাল। বেটার, আপনি একটা ইউজড় জামা-প্যান্ট নিয়ে আসুন ছেলেটির। টোটোকে শুকিয়ে নেব।
কৃষ্ণকান্তর বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়াল।
কিকিরা বললেন, “কৃষ্ণকান্তবাবুকে হয়ত এখন বাড়িতে পাব না। তিনি ফিরেছেন বলে মনে হয় না। জামা-প্যান্ট যা হোক একটা আমি আনছি। কিন্তু এখন কাউকে কিছু বলব না।”
“কোনো দরকার নেই।“
কিকিরা নেমে গেলেন গাড়ি থেকে।
সামান্য পরে ফিরে এলেন। খুকুর কাছ থেকে তার দাদার একটা জামা নিয়ে এসেছেন। উনি বসলেন গাড়িতে। জামাটা সিনহাকে এগিয়ে দিলেন।
