চন্দন হেসে ফেলেছিল। সামলে নিল। ভদ্রলোক এবার গোছগাছ সেরে তারাপদর পাশে বসলেন।
গাড়ি ছাড়ার সময় হয়ে আসছিল। প্লাটফরমের কলরব কমে আসছে যেন। তারাপদদের কামরা থেকে কিছু বেহারি লোকজন নেমে গেল।
ভদ্রলোক ততক্ষণে পান-জরদা মুখে পুরেছেন। “আপনারা কদুর যাবেন স্যার?” ভদ্রলোক আবার জিজ্ঞেস করলেন। তারাপদ কিছু বলার আগেই চন্দন বলল, “মধুপুর-টধুপুরের দিকে।”
“মধুপুর? কোথায়? কোন দিকটায়?”
“আপনি মধুপুরে থাকেন?”
“না স্যার, আমি অরিজিন্যালি ভাগলপুরের, তারপর থেকেছি জামসেদপুরে, শেষে ইছাপুরেও কিছুদিন ছিলাম, এখন আর কোনো পুরে থাকি না, টুরে টুরে দিন কেটে যায়।”
তারাপদ হেসে ফেলল। চন্দনও।
“আমার স্যার কতকগুলো বদ দোষ আছে,” পান চিবোতে চিবোতে ভদ্রলোক বললেন, “আমি হাসিঠাট্টা করতে ভালবাসি। আমার আপন-পর নেই। ভেরি ফ্র্যাংক…। একটা কথা স্যার আগেই বলে নি, আমার মুখ থেকে হরদম ইংলিশ বেরোয়, নো গ্রামার, কিছু মনে করবেন না। আমার বাবাকে একজন অ্যাংলো ঘুষি মেরে নাক ভেঙে দিয়েছিল, তখন থেকেই আমার ওই ভাষাটার ওপর রাগ। অ্যাংলোরা হাফ ইংলিশ বলে, তাতেই আমার বাবার নাক চলে গেল, ফুল ইংলিশ যারা বলে তাদের ঘুষি খেলে তো আমার বাবার ফেসই পালটে যেত। বলুন ঠিক কি না! আমি তখন থেকে রিভেজ নিতে শুরু করেছি ভাষাটার ওপর, যা মুখে আসে বলব–তুই আমার কাঁচকলা করবি। তোর ভাষা কি আমার মার না বাবার ভাষা!”
তারাপদরা এবার জোরে হেসে উঠল।
গাড়ি ছাড়ল। গাড়ি ছাড়ার সময় যেমন হয়, দু-একজন নেমে পড়ল, ছুটতে ছুটতে কে এজন পা-দানিতে উঠে পড়ল, প্লাটফর্মের ওপর দাঁড়িয়ে কেউ কেউ হাত নাড়ছে, একদল দেহাতী গোছের মানুষ ‘গঙ্গা মাই কি জয়’ বলে চেঁচিয়ে উঠল।
ধীরে ধীরে গাড়িটা প্লাটফর্মের বাইরে আসতেই শীতের হাওয়া এসে ঢুকল জানলা দিয়ে।
চন্দন জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল, এবার ভেতরে মুখ ফেরাল।
চন্দন বলল, “আপনার নামটা কী স্যার?”
“কিঙ্করকিশোর রায়, দেড়গজী নাম স্যার, ছোট করে লোকে বলে কিকিরা দি গ্রেট।“
জোরে হেসে উঠে চন্দন বলল, “আলেকজান্ডার দি গ্রেট-এর পর আর কোনো গ্রেট দেখিনি স্যার, আপনাকে দেখলাম।”
কিকিরা খকখক শব্দ করে হেসে উঠলেন। অদ্ভুত সে শব্দ। তারাপদও হেসে উঠল। ঠাট্টা করে চন্দনকে বলল, “তুই তা হলে আলেকজান্ডার দি গ্রেটকে দেখেছিস।”
“ছবি দেখেছি”, চন্দন রসিকতা করে বলল।
কিকিরা হাসতে হাসতে বললেন, “এবার জ্যাস্ত দেখুন, লিভিং গ্রেট।”
তারাপদ জিজ্ঞেস করলে, “আপনি কী করেন?”
কিকিরা অলেস্টারের গলার দিকে বোতাম খুলতে খুলতে বললেন, “আমার করার কিছু ঠিক নেই, স্যার। কখনো ছুরি-কাঁচির এজেন্ট, কখনো খোস পাঁচড়ার মলমের, কখনো অম্লশূলের ওষুধ বেচে আসি, কখনো আবার অন্য কিছু–যা হাতের কাছে জুটে যায়। আমার নেচারটা অস্থির গোছের। মেজাজে না বলে আমি কাউকে ছেড়ে কথা বলি না। লাস্ট মাস্থে আমি একটা নতুন কোম্পানির স্নো ক্রিম পাউডারের রিপ্রেজেনন্টেটিভ ছিলাম । মালিক বেটা ছ্যাঁচড়া, আমার সঙ্গে বনলো না, ছেড়ে দিলাম। দিয়ে এখন একটা কোম্পানির কাঁচি, খুর, ক্লিপের এজেন্ট হয়ে গিয়েছি। হাওড়ায় কারখানা খুলেছেন ভদ্রলোক বেশ ভাল খুর তৈরি করছে স্যার । আমার সুটকেসে স্যাম্পল আছে। কাল সকালে দেখাব।”
চন্দন হাত নেড়ে বলল, “থাক্ স্যার, খুব আর দেখাবেন না, খুর দেখলেই আমার ভয় করে।”
“ভয়ের কিছু নেই, স্যার। ঠিক মতন টানতে পারলে মাখনের মতন গাল নরম থাকবে। বেকায়দায় টানলে অবশ্য গলা যাবে…” বলে কিকিরা তারাপদর দিকে তাকিয়ে খখক্ শব্দ করে হাসলেন। তারপর নিজেই বললেন, “সত্যি কথা বলতে কি স্যার, আমি আসলে ম্যাজিশিয়ান ছিলাম। গণপতিবাবু আমার গুরুর গুরু। আমার সাক্ষাৎ গুরু বড় একটা কলকাতায় আসতেন না। তাঁর ফিল্ড ছিল পাটনা, মজঃফরপুর, জামালপুর; ওদিকে বেনারস, লক্ষ্ণৌ, আগ্রা–এইসব। আমার গুরু অদ্ভুত অদ্ভুত খেলা জানতেন। ইন্ডিয়ান ট্রিক বলে তাঁর একটা খেলা ছিল–তাতে তিনি স্টেজের ওপর একটা মেয়ের হাত-পা, মুখ সব আস্তে আস্তে অদৃশ্য করে দিতেন। তারপর আবার একে একে সব জোড়া লাগিয়ে দিতেন।”
চন্দন কৌতূহল বোধ করছিল, “বলেন কী!”
“মিথ্যে বলব না স্যার, গুরুর নামে কেউ মিথ্যে বলে না।” বলে কিকিরা হাত জোড় করে গুরুর উদ্দেশে প্রণাম জানালেন। উঁচুদূরের লোক ছিলেন তিনি। একবার নাইট্রিক অ্যাসিড খাবার খেলা দেখাতে গিয়ে কী একটা গণ্ডগোল হয়ে গেল। তিনি মারা গেলেন। আমি পনেরো বছর বয়েস থেকে তাঁর চেলাগিরি করেছি। সাত আট বছর লেগে ছিলাম। আরও পাঁচ সাতটা বছর সঙ্গে থাকতে পারলে দেখতেন–কিকিরা কী না করত! জাপান, আমেরিকা, লন্ডন করে বেড়াতাম । কপাল স্যার, কপাল, ব্যাড লাক…।”
তারাপদ জিজ্ঞেস করল, “আপনি নিজেও কি ম্যাজিক দেখিয়ে বেড়াতেন?”
“আমরা ম্যাজিকের বংশ স্যার। আমার ফাদারের অলটারনেট ফাদার বিরাট ম্যাজিশিয়ান ছিলেন।”
চন্দন অবাক হয়ে বলল, “ফাদারের অলটারনেট ফাদার কী জিনিস মশাই?”
কিকিরা মজার মুখ করে হেসে বললেন, “বাবার বাবাকে ছেড়ে তাঁর বাবা–-মানে প্রপিতামহ।”
তারাপদ আর চন্দন হেসে গড়িয়ে গেল।
কিকিরা বললেন, “ওটাই তো আমার অরিজিন্যাল ব্যবসা ছিল স্যার, বছর আট দশ কিকিরা ম্যাজিক মাস্টার হয়েছিল; তারপর আমার বাঁ হাতটায় কী যে হল–প্রথমে ব্যথা-ব্যথা করত, দেখতে দেখতে হাত শুকোতে লাগল, জোর একেবারে কমে গেল, সব সময় কাঁপত। হাত না থাকলে ম্যাজিশিয়ান হওয়া। যায় না। ম্যাজিশিয়ানের হাত, চোখ আর মুখ এই তিনটেই হল আসল। “
