.
১০.
পরের দিন লাজোস খুঁজতে গিয়ে কিকিরারা অবাক! পার্ক স্ট্রিটের ওপরে ঠিক নয়, বড় রাস্তা থেকে এক গলি ধরতে হবে। গলির মুখে, কনার প্লটে এক ঝকঝকে, তকতকে দোকান। আশেপাশে ভাল-ভাল দোকানেরও অভাব নেই। কোনোটা ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন; কোনোটা টিভির; কোনোটা বা টাইপ মেশিনের। সাজসজ্জার দোকানও আছে। দু-একটা চমৎকার রেস্টুরেন্ট। নিচে দোকানপত্র, ওপরে অফিস, ফ্ল্যাট।
চন্দন আর তারাপদ সঙ্গে ছিল কিকিরার। তারাপদ অফিস পালিয়েছে।
বাইরে থেকে দেখেই বোঝা যায় লাজোস একটা দোকানের নাম। ছিমছাম দোকান। বাইরে কাচের আড়াল। দোকানটা দেখেই চন্দন বলল, “স্যার, এখানে তো ডাক্তারি জিনিসপত্র বিক্রি হয়। মেডিক্যাল অ্যাপ্লায়েন্স।”
কিকিরা বললেন, “তাই দেখছি। চলো, ভেতরে তো যাই!”
তারাপদ বলল, “আমি বাইরে আছি। বেশি ভিড় করে দরকার নেই।”
কিকিরা আর চন্দন কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন।
দোকান খুব বড় নয়। তবে পরিপাটি। মাইক্রোস্কোপ, ব্লাড প্রেশার মাপার যন্ত্র থেকে আরও পাঁচটা ডাক্তারি যন্ত্রপাতি বিক্রি হয়।
ভিড়টিড় নেই। কর্মচারী জনা চারেক। দু জন অবাঙালি।
চন্দন ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করতে চাইল।
ম্যানেজার বসেন আলাদা। তাঁর ঘর একপাশে। ভেতরের দিকে।
ম্যানেজার অবাঙালি। পাঞ্জাবি।
চন্দনই কথা শুরু করল।
ম্যানেজার শুনলেন খানিকটা। তারপর যা বললেন তার মর্মার্থ হল, এই দোকান বা কোম্পানিটা হল এক হাঙ্গেরিয়ান সাহেবের নামে। তিনি এ-দেশে থাকেন না। “লাজোস’-এর ব্যবসা আছে বিদেশেও। ভারতে চার জায়গায়। দিল্লি, বম্বে, কলকাতা আর বাঙ্গালোরে। তাঁর কোম্পানির এটা অফিস। অফিস অ্যান্ড এজেন্সি।
বিজ্ঞাপনের কথা তুললেন কিকিরা।
ম্যানেজার ইংরিজিতেই বললেন, “হ্যাঁ, আমাদের এখানকার ঠিকানাতেই ওটা ছাপতে দেওয়া হয়েছিল। সেভাবেই অ্যাডভাইস করা হয়েছিল আমাদের। সাহেবের একজন লোক এখানে এসেছিলেন। কিন্তু তিনি এখন এখানে নেই। বাঙ্গালোর গিয়েছেন। উনি এখানে ফিরে আসতেও পারেন, নাও পারেন। ওঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হলে আমাদের থু দিয়ে করতে হবে। আমাদের ফ্যাক্স অ্যারেঞ্জমেন্ট আছে।”
ম্যানেজারের কথা শুনে মনে হচ্ছিল, ভদ্রলোক অনেকদিনই কলকাতায় আছেন। ইংরিজি-হিন্দি, মাঝে-মাঝে বাংলাও বলছিলেন ভাঙা-ভাঙা ভাবে।
কিকিরা বললেন, “বাইরে জানাতে হবে?”
“আমরা ওঁকে জানিয়ে দেব। ওভারসিজ লিঙ্ক আমাদের আছে বিজনেস পারপাজে।”
কিকিরা বেশ বিনয় করে বললেন, “আপনি যদি আমাদের আরও একটু সাহায্য করেন, স্যার। আপনাদের সাহেবের ইন্টারেস্টেই বলছি।
“কীরকম হেল্প?
“ঘড়িটা সম্পর্কে আরও একটু ডিটেল জানতে পারলে? নিউজ পেপারে যা আছে, সেটা বড় শর্ট। মোর ডিটেল”।
ম্যানেজার ভদ্রলোক কী ভাবলেন যেন। তারপর নিজের অফিস টেবিলের নিচের ড্রয়ার থেকে কাগজপত্র হাতড়ে একটা খাম বার করলেন। বড় খাম। খামের মধ্যে থেকে একটা কাগজ বার করে এগিয়ে দিলেন কিকিরাকে।
কাগজটা নিলেন কিকিরা। ইংরিজিতে টাইপ করা কাগজ। ডুপ্লিকেট।
ম্যানেজার বললেন, “টে ইট। দ্যা উইল সার্ভ ইওর পারপাজ।”
কিকিরা আর চন্দন উঠে দাঁড়াল। “থ্যাঙ্ক ইউ।“
“নেভার মাইন্ড!…বাই দ্য ওয়ে– বি ভেরি কেয়ারফুল!” বলে ভদ্রলোক সাবধান করে দিলেন। বললেন, “অনেক টাকার ব্যাপার মিস্টার, কাগজটা নষ্ট করবেন না, পড়লে বুঝতে পারবেন।”
“কত টাকা?”
“এ লটু অব মানি। লাখ-সওয়া লাখ।”
ভেতরে-ভেতরে যেন চমকে উঠলেন কিকিরারা। লাখ-সওয়া লাখ!
চলে আসার সময় কিকিরা বললেন, “আপনাদের দোকান কখন বন্ধ হয়?”
“সেভেন ও ক্লক। সাত বাজে ক্লোজ হয়। মাগর, আট সাড়ে আট পর্যন্ত দুগার থাকে। আউট স্টেশন কল, অডার করপনডেন্স, ফোন রিসিভ…। উসকো বাদ টোটালি ক্লোজড!”
“দুগার কে?”
“হীরা দুগার। আমার অ্যাসিসটেন্ট।”
ধন্যবাদ জানিয়ে কিকিরারা ম্যানেজারের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তাকালেন আশেপাশে। কর্মচারীরা কাজকর্ম করছিল। আন্দাজ করবার চেষ্টা করলেন হীরা দুগারকে।
রাস্তায় নেমে তারাপদকে দেখতে পেলেন না। গেল কোথায়?
দু-চার পা এগিয়ে খুঁজছিলেন তারাপদকে।
তারাপদ খানিকটা তফাতে গাড়িবারান্দার তলায় আড়ালে দাঁড়িয়ে কোল্ড ড্রিঙ্কস খাচ্ছিল একটা দোকানের সামনে। খাওয়া শেষ করে পয়সা মেটাল। সিগারেট ধরাল।
কিকিরারা তাকে দেখতে না পেলেও সে ওঁদের দেখতে পেয়েছিল। হাত নাড়তে যাবে; হঠাৎ চোখে পড়ল, কিকিরারা দোকান থেকে রাস্তায় নামার পর-পরই একজন দোকান থেকে বেরিয়ে এসে কিকিরাদের নজর করতে লাগল। কেমন যেন লাগল লোকটাকে! তারাপদ স্পষ্ট বুঝল না, কিন্তু তার খারাপ লাগল। সন্দেহ হল।
কী মনে করে তারাপদ আরও একটু আড়ালে সরে গেল। কিন্তু নজর রাখল লোকটার ওপর। প্যান্ট-শার্ট পরা তাগড়া চেহারা। কিকিরাদের লক্ষ করছে।
সামান্য পরেই লোকটা দোকানের পাশের গলি ধরে চলে গেল।
তারাপদ তাড়াতাড়ি আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে হাত নেড়ে ইশারা করল কিকিরাদের।
কিকিরারা এগিয়ে আসার আগেই তারাপদ এগিয়ে গেল। কাছাকাছি আসতেই তারাপদ বলল, “স্যার, আপনারা ওই ওপারের ফুটপাথে রেস্টুরেন্টে ঢুকে যান। আমি আসছি। একটা লোককে ফলো করে আসছি আমি।” বলতে বলতে তারাপদ গলির দিকে এগিয়ে গেল।
গলি ধরে সামান্য এগিয়ে তারাপদর মনে হল, কে বলবে এই গলি পার্ক স্ট্রিটের গায়ে-গায়ে। অনেক নিরিবিলি। বাড়িগুলো বড় বড় হলেও একেবারে নতুন নয়। পাঁচমেশালি লোকের ফ্ল্যাট বাড়িগুলোয়। খানিকটা এগিয়ে ছোট্ট তেকোনা ফাঁকা নেড়া মাঠ। পার্ক। তারই পেছন দিকে পুরনো এক হতশ্রী চেহারার বাড়ি। বাড়ির লাগোয়া ভাঙাচোরা শেডের গ্যারাজ। বাড়িটার ফটকের মাথায় মরচে-ধরা ভাঙা লোহার ক’টা অক্ষর। পড়াও যায় না। এক্স সেলারস হোম গোছের কিছু হবে।
