তারাপদ ধীরাজকে চা নিতে বলল।
হাতের কাগজটা পড়তে-পড়তে একবার আড়চোখে কিকিরা ধীরাজের দিকে তাকালেন। হালকা গলায় বললেন, “আগে পেঁপেটা খাও, ভাল জাতের পেঁপে, পেঁপে খেলে লিভার ভাল হয়। খাও!”
ধীরাজের প্রথমদিকে যে ইতস্তত ভাব ছিল, সেটা কেটে গিয়েছে অনেকটা। এখন সে অত আড়ষ্ট নয়।
কাগজ দেখা হয়ে গেলে কিকিরা বললেন, “তাই দেখছি, বাবলুদের ঘড়িরই ডেসক্রিপশান। তবে একেবারে পুরো ডিটেলে নয়। ঘড়ির নামও বলে দিয়েছে, ক্যানটন। ক্যানটন গোল্ড। পকেট ওয়াচ।…এটা কোন কাগজে বেরিয়েছিল? কত তারিখে?”
তারাপদ দলল, “নিচে লেখা আছে। টুকে নিয়েছি।”
দেখলেন কিকিরা। “এই বিজ্ঞাপন তো এপ্রিলে বেরিয়েছে। বাইশে এপ্রিল। আর এখন মে মাসের আট-ন’ তারিখ।”
তারাপদ বলল, “বিজ্ঞাপনটা আগে বার তিনেক রিপিট হয়েছে। এটাই লাস্ট।”
“বাবলু কবে থেকে যেন ঘরছাড়া?”
ধীরাজই কথা বলল, “আমার সঙ্গে শেষ দেখা হওয়ার পরের দিন। তার পরের দিনই সন্ধেবেলায় আমি খঙ্গপুরে চলে যাই। সেটা ছিল আটাশে এপ্রিল। ওকে পাওয়া যাচ্ছে না সাতাশে এপ্রিল থেকে।”
কিকিরা চায়ে চুমুক দিতে দিতে হাতের কাগজটা দেখছিলেন। ভাবছিলেন। বাইশে এপ্রিলের পুরনো কাগজের পাতায় মুড়ি বাদাম ছড়িয়ে রেখে বাবলুরা পরে একদিন মুড়ি খেয়েছে। হতেই পারে! শেষে বললেন, “তলার ঠিকানাটা, যেখানে কনট্যাক্ট করতে বলেছে সেটা তো দেখছি সাবেকি ঠিকানা : লাজোস, LAJOS। লাজও হতে পারে। বিলেতিগুলোর এইরকম নামও হয় নাকি, তারা। যাক গে, রাস্তাটা হল পার্ক স্ট্রিট। ফোন নম্বরও দেওয়া আছে।”
তারাপদ বলল, “ওখানে গিয়ে খোঁজ করতে অসুবিধে কোথায়?”
“কিছুই নয়। কালই যাওয়া যেতে পারে।”
ধীরাজ কোনো কথা বলছিল না। চা খাচ্ছিল।
অল্পক্ষণ চুপচাপ থাকার পর কিকিরা পকেট হাতড়ে চুরুট বার করলেন। মাথার চুলে আঙুল চালালেন বার কয়েক। চুরুট ধরালেন। শেষে ধীরাজকে বললেন, “ব্যাপারটা তা হলে কী দাঁড়াচ্ছে?”
ধীরাজ তাকিয়ে থাকল।
কিকিরা বললেন, “ব্যাপারটা এখন এই দাঁড়াচ্ছে যে, সেদিন তোমাদের আড্ডাখানা থেকে ফেরার পর–মানে মুড়ি বাদাম খাবার দিনের কথা বলছি–বাবলু পুরনো খবরের কাগজ থেকে লাজোস-এর বিজ্ঞাপনের পাতাটা ছিঁড়ে নিয়ে বাড়ি চলে যায়। সেটা তবে পঁচিশে এপ্রিল পড়ছে! তাই না?”
ধীরাজ হিসেব করে বলল, “তাই। ছাব্বিশ তারিখেও ও আমার কাছে এসেছিল। সাতাশ তারিখ সকালের পর ওকে আর পাওয়া যাচ্ছে না।”
“ছাব্বিশ তারিখে তবে ও পবনের দোকানে গিয়েছিল, সেখান থেকে আপনার কাছে যায়।” তারাপদ বলল।
“হ্যাঁ।”
“পবনকে কিন্তু ঘড়ি দেখায়নি। হয়ত সঙ্গে ছিল না। আপনাকেও কি দেখিয়েছিল?”
“না।”
কিকিরা বললেন, “এখন আমার মনে হচ্ছে, বাবলু বাড়িতে গিয়ে আলমারি খুলে ঘড়িটা বার করেছে। করে বিজ্ঞাপনের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছে। দেখেছে একই ঘড়ি। তারপর কিকিরা চুপ।
অপেক্ষা করে তারাপদ বলল, “তারপর কী?”
“সেটাই তো ধরতে পারছি না। ও কি লাজোস-এর ঠিকানায় গিয়েছিল দেখা করতে? না, ফোন করেছিল?”
তারাপদ বলল, “স্যার, বাবলুর বোন খুকুর কথামতন, আগের দিনই ঘড়িটা তার কাছে দেখা গিয়েছে। মানে ছাব্বিশ তারিখে।”
কিকিরা ধীরে-ধীরে মাথা নাড়লেন ধীরাজের দিকে তাকিয়ে। বললেন, “না, ঘড়ি নিয়ে বাবলু বাইরে যায়নি। তোমার কাছে নয়। তা হলে দেখাত তোমায়। আমার ধারণা, ও ছাব্বিশ তারিখে হয় লঞ্জেসচুষ–মানে লাজোসের কাছে যায়, বা তাদের অফিসে ফোন করে।…কিন্তু কেন করবে?”
“টাকার জন্যে নিশ্চয় নয়। আবার শুধু-শুধু ওদের জানাবার জন্যেও ফোন করবে না। ঘড়িটা তাদের কাছে আছে জানিয়ে ফোন করার একটা মানে থাকবে তো!”
“কী জানি! ছেলেমানুষের কাণ্ড!” বলে কিকিরা ধীরাজের দিকে তাকালেন। “আচ্ছা ভাই, একটা রহস্য উদ্ধার করে দিতে পারো? বাবলু বেপাত্তা হওয়ার পর তার টেবিলে একটা কাগজে বড় বড় করে ইংরিজিতে FOX OX BOX লিখে রেখেছিল। এর কোনো মানে বলতে পারো?”
ধীরাজ অবাক চোখেই তাকিয়ে থাকল। দাড়ি চুলকে নিল অন্যমনস্কভাবে। আকাশ-পাতাল খুঁজল যেন! তারপর বলল, না। আমি তো জানি না।”
“তা হলে কী আর কথা যাবে! যাক গে, কাল আমরা ওই লাইমজুস, লঞ্জেচুষ–মানে লাজোস-এর কাছে যাচ্ছি।” কিকিরা উঠে দাঁড়ালেন, উঠে দাঁড়িয়ে পিঠ কোমরের আড়ষ্ট ভাবটা ভাঙার জন্যে বার কয়েক শরীর হেলালেন, বেঁকালেন, হাত ওঠালেন, নামালেন। শেষে বললেন, “তারাপদ, তিনটে জিনিস খেয়াল করো।”
“কী?”
“এক নম্বর হল, বাবলু যেদিন খবরের কাগজে লাজোস-এর বিজ্ঞাপনটা দেখেছে, সম্ভবত সেদিন রাত্রে বা তার পরের দিন বাড়িতে আলমারি খুলে ঘড়িটা বার করেছিল। করে মিলিয়ে নিতে গিয়েছিল বিজ্ঞাপনের ডেসক্রিপশানের সঙ্গে। খুকু বাবলুর কাছে ঘড়িটা দেখেছিল ছাব্বিশে এপ্রিল। তাই তো!”
“হ্যাঁ।”
“দু’ নম্বর হল, ঘড়িটা নিয়ে সে পবন বা ধীরাজের কাছে যায়নি। মানে ঘড়ি পকেটে নিয়ে সে পথে বেরোয়নি। যদি ঘড়ি তার কাছে থাকত-ধীরাজকে দেখাত। তাই না?”
“আমারও তাই মনে হয়।”
“তিন নম্বর হল, আমার যতদূর মনে হয় ব্যাপারটা যাচাই করতে সে বাড়ি থেকে লাজোসে ফোন করেছিল। নিজে নিশ্চয় যায়নি। গেলে পবন ধীরাজদের বলত।”
“বলুন!”
“হতে পারে বাবলু বিকেল বা সন্ধেবেলায় লাজোসে ফোন করেছিল। বাড়ি থেকেই। সেটা হয়ত জানা যাবে না। কেননা, বাড়ির ছেলেমেয়ে কোথায়। কাকে কখন ফোন করছে, বাড়ি থেকে কে আর তার দিকে নজর রাখে!…তবে একটা কথা পরিষ্কার, বাবলু আগের দিন ঘড়ি নিয়ে পথে বেরোয়নি। পরের দিন সকালে যদি সে ঘড়ি নিয়ে বেরিয়ে থাকে, তবে মাঝখানে কিছু একটা ঘটেছিল। কী ঘটেছিল, কাল আমরা হয়ত জানতে পারব। আজকের মতন এখানেই ইতি।” কিকিরা চুরুটে টান মারলেন। চুরুট নিভে গিয়েছে।
