কিকিরা ধীরাজকে বসতে বললেন। আজকের দিনটা মন্দের ভাল। শেষ রাত থেকে সকাল পর্যন্ত দু-এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে। দুপুরেও মেঘলা-মেঘলা ছিল। গরম কমেছে সামান্য।
কিকিরা ধীরাজের চোখমুখ দেখে আন্দাজ করতে পারছিলেন, বেচারি বেশ হতাশ হয়েছে। তা তিনি আর কী করবেন! তিনি তো তারাপদকে বলেননি, ধীরাজকে ধরে আনো–দড়ি বেঁধে।
তারাপদ বলল, “স্যার, ধীরাজবাবুর গত পরশু খঙ্গপুর থেকে ফিরেছেন। কাল আমি আমার পাড়ার লাইব্রেরিতে সারা সন্ধে কাগজ ঘেঁটে কটিয়েছি। আর ওঁর কাছে গিয়েছিলাম কাঁকুলিয়ায়। অনেক বলে কয়ে ধরে এনেছি।”
ধীরাজের বয়েস চল্লিশের তলায়। ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ হবে। দেখতে সাধারণ, তবে বাহারি করে দাড়ি রেখেছে।
কিকিরা আলাপি ঢঙে বললেন, “কী বলব ভাই আপনাকে! আপনি, না তুমি? বয়েস তো বেশি নয়।”
“তুমিই বলুন। আমি বুঝতে পারিনি”।
“পারবে কেমন করে! আমরা তো ওই ক্লাসের নয়। মানে গোয়েন্দা ক্লাসের। আমরা হলাম, কী বলব কী বলা যায়–ফেউ ক্লাসের। আমি ভাই একসময় ম্যাজিক নিয়ে মাতামাতি করেছি। এখন ওন্ড। বাতিল। আর তারাপদ আর চন্দন হল আমার ফ্রেন্ড, ফিলোজফার অ্যান্ড ব্রাদার।
ধীরাজ বলল, তারাপদর কাছে সে শুনেছে পরিচয়গুলো
কিকিরা আর হাসি-তামাশা করলেন না। বললেন, “কৃষ্ণকান্তবাবু, আমাদের একটা বড় দায়িত্ব দিয়েছেন। বাবলুকে খুঁজে বার করার।”
“তাও শুনেছি। গতকাল পবনের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে। আর আজ উনি তো আমার বাড়িতেই গিয়েছিলেন।
“ভাল কথা। আগেই জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল! তোমার মায়ের অসুখ–কেমন আছেন তিনি?”
“এখন ভালই আছেন।”
“কী হয়েছিল?”
“বুকে ব্যথা। প্রথমটায় ওখানকার ডাক্তার ঘাবড়ে গিয়েছিল। পরে বোঝ গেল, আলসারের কেস। মা বড় অত্যাচার করে।”
কিকিরা হাসলেন। “মায়েরা ওইরকমই।…তা মা যখন ভাল আছেন, তোমারও মন ভাল থাকা দরকার। নয় কী এবার একটু কাজের কথা বলি।”
“বলুন?”
“তুমি বাবলুর পুরনো বন্ধু?”
“হ্যাঁ, বন্ধু কেন, দাদার মতন বলতে পারেন।”
“ওকে ভাল করেই চেনো? কেমন ছেলে?”
“খারাপ কিছু দেখিনি। লাইভলি, মজাদার, ভাল স্বভাব…”
তারাপদ বলল, “বাবলুর সম্পর্কে যাকেই জিজ্ঞেস করছি, সবাই তার প্রশংসা করছে। ও নিশ্চয় ভাল ছেলে, স্যার। তবু বেচারি”
কিকিরা তারাপদকে কথা শেষ করতে না দিয়ে ধীরাজকে বললেন, “আচ্ছা, ওই যে শুনলাম, একটা খবরের কাগজে কী বেরিয়েছিল–”
তারাপদ বলল, “স্যার, দ্যাটস কারেক্ট। …আমি দুদিন লাইব্রেরিতে রাখা খবরের কাগজের ফাইল হাতড়েছি। কালই ইংরিজি কাগজে বিজ্ঞাপনটা দেখতে পেলাম। ধীরাজবাবুকে বলেছি সেকথা।”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। মানে, ঠিক আছে। ইশারায় তারাপদকে বললেন, বগলাকে একটু চা-টায়ের কথা বলে আসতে।
তারাপদ উঠে গেল।
কিকিরা বললেন, “আমাদের মধ্যে লুকোচুরির কোনো ব্যাপার নেই।…এবার আমায় একটু বলো তো, বাবলু যেদিন থেকে নিরুদ্দেশ–তার কি কদিন আগে খবরের কাগজের ব্যাপারটা ঘটে?”
ধীরাজ বলল, “ও নিরুদ্দেশ হওয়ার দু দিন আগে। মানে আগের আগের দিন। “
“ঠিক কী হয়েছিল?”
“কী আর হবে, আমরা প্রায়ই যেমন আড্ডা মারি, আমাদের ক্লাবে আজ্ঞা মারছিলাম সন্ধেবেলায়। পুরনো খবর কাগজ ছড়িয়ে তার ওপর মুড়ি বাদাম, কাঁচা পিঁয়াজ ছড়িয়ে খাচ্ছিলাম সকলে। ভাঁড়ের গা ছিল। গল্প হচ্ছিল। আমাদের নাটক নিয়েই। গ্রুপের টাকাপয়সা নেই, হাজার কয়েক টাকা দেনা। দু-পাঁচটা কল শো অ্যারেঞ্জ করতে পারলে খানিকটা মেকআপ হয়। এইসব গল্প।”
তারাপদ ফিরে এল। চোখমুখ ধুয়ে রুমালে মুখ মুছতে মুছতে এসে নিজের জায়গায় বসল।
কিকিরা বললেন, “মুড়ি খেতে-খেতে কাগজের বিজ্ঞাপনের দিকে নজর পড়ল?”
“খাওয়া তখন শেষ। মুড়ি প্রায় সাফ। কাগজটা ঝেড়েঝুড়ে আমরা দলা পাকিয়ে ফেলেই দিতাম। হঠাৎ কার যেন নজরে পড়ল।”
“বিজ্ঞাপনটা?”
“হ্যাঁ। খুব বড় নয়, আবার ছোটও নয়। কত হবে, ইঞ্চি চারেক মতন লম্বা। চারপাশে রুল দেওয়া।”
“তোমরা সবাই পড়লে?”
“না। কে একজন পড়ল। দু-একজন দেখল। বাবলুও দেখল।”
“তারপর?”
“আমরা একটু মজার কথাবার্তা বললাম। কাগজটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামালাম না।”
“বাবলু কি কাগজটা নিল?”
“ঠিক মনে নেই। হতে পারে সে কাগজের পাতা ছিঁড়ে পকেটে রেখেছিল। …তবে ও বলল, ওদের বাড়িতে ওর ঠাকুরদার একটা পকেট ঘড়ি পড়ে আছে। সোনার ঘড়ি।”
তারাপদ কিকিরাকে বলল, “পবনও একই কথা বলেছে, স্যার। ঘড়িটার একটা মোটামুটি ডেসক্রিপশানও বাবলু দিয়েছিল।”
ধীরাজ মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ।”
“তুমি নিজে কাগজের ওই বিজ্ঞাপনটা দেখেছিলে?”
“এমনি দেখেছি। ভাল করে দেখিনি। আমার মাথায় ওসব ঢোকে না। আর মন দিয়ে দেখে করবই বা কী! আমার কাছে তো ঘড়ি নেই।”
“তবু, কী লেখা ছিল?”
ধীরাজ মনে করে দু-একটা কথা বলা সঙ্গে সঙ্গেই তারাপদ পকেট থেকে একটা কাগজের টুকরো বার করে এগিয়ে দিল। বলল, “স্যার, আমি কাগজ ঘেঁটে-ঘেঁটে এই বিজ্ঞাপন বার করেছি। এটা সেই ঘড়ির বিজ্ঞাপন। আলগা কাগজে পুরো বিজ্ঞাপনটাই টুকে নিয়েছি।” কাগজটা দিয়ে আবার বলল, “ধীরাজবাবুকে আমি দেখিয়েছি এটা। উনি বললেন, হ্যাঁ, এটাই সেদিন পড়েছিলেন।”
কিকিরা হাতে-টোকা বিজ্ঞাপনের নকলটা পড়তে লাগলেন।
বগলা চা নিয়ে এল। চায়ের সঙ্গে পাকা পেঁপের টুকরো আর নোতা বিস্কিট।
