“টোটো!”
“ভীষণ ট্রেইন্ড ডগ। অ্যান্ড ফেরোসাস। ওকে আমি এমনভাবে ট্রেই করেছি যে, যদি ইশারা করেও বলি, ওই লোকটার টুটি চেপে ধরো গে যাও টোটো সত্যি-সত্যি চোখের পলকে দৌড়ে গিয়ে তার টুটি চেপে ধরবে।”
চন্দন বলল, “ওটা কোন জাতের কুকুর? অ্যালশেসিয়ান?”
মাথা নাড়লেন সিনহা, “না, অ্যালশেসিয়ান, টেরিয়ার, বুল ডগ, ম্যাসটিফ, গ্রেট টেন– এসব নামীদামি কুকুরের কোনোটাই নয়। বুনো কুকুর, ওয়াইল্ড ডগ। ওকে আমি চার-ছ’ মাস বয়েস থেকে নিজের কাছে রেখেছি। এখন টোটোর বয়েস পাঁচ বছর। একটু বুড়ো হয়ে গিয়েছে। দেখবেন টোটোকে?”
কিকিরা যেন আঁতকে উঠলেন, “না স্যার, দেখে দরকার নেই। কুকুরকে আমি ভীষণ ভয় পাই। কেষ্টর জীব, শান্তিতে ঘুমোচ্ছে ঘুমোতে দিন।”
সিনহা হেসে ফেললেন। “ওর ঘুম বড় পিকিউলিয়ার। এমনিতে যখন ঘুমোয় কুম্ভকর্ণ; কিন্তু চোর-ছ্যাঁচোড় এলে সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ছুটে যায়। একটা আন্ডার কারেন্ট কিছু আছে। …তবে আপনাদের ভয়ের কারণ নেই। টোটো তার নিজের জায়গায় বাঁধা আছে। ঘুম ভাঙলেও আসতে পারবে না। তা ছাড়া অকারণ চেঁচানো অভ্যেসটা ওর নেই।”
কোল্ড ড্রিঙ্কস খাওয়া শেষ।
কিকিরা এবার উঠে পড়বেন বলে মনে হল। বললেন, “আপনাকে ফ্র্যাঙ্কলি বলছি সিনহাসাহেব, আমরা সাধ্যমতন চেষ্টা করেও বাবলুর কোনো খোঁজ করতে পারলাম না। ওকে কিডন্যাপ করা হয়েছে, কিন্তু কারা করল, কোথায় নিয়ে গিয়ে ধরে রেখেছে, ছেলেটা কী অবস্থায় আছে- কিছুই বুঝতে পারছি না। আর যদি খুনটুন করে ফেলে!”
“অসম্ভব কী! তবে অতটা ভাববার আগে হাল ছেড়ে দেবেন না। আমি আপনাদের সাহায্য করতে পারলে সুখী হতাম। ছেলেটিকে যেটুকু দেখেছি, কথা বলেছি, আমার বেশ লেগেছিল, ব্রাইট ইয়াং বয়। “
কিকিরা উঠে পড়লেন। দেখাদেখি চন্দনও।
সিনহাও উঠে দাঁড়ালেন। কোলাপসিবল গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে তালা খুলে দেবেন ফটকের।
কিকিরা বললেন, “আপনার হোটেলটা তা হলে..”
“সাকার্স রেঞ্জ।”
“ওদিকে গেলে যাব একদিন।” কিকিরা হালকা ভাবেই বললেন।
“আসবেন। মিড ডে বা ওইরকম সময়ে। সন্ধের পর আমি থাকি না। … ভাল কথা, আমার টোটোর একটা অদ্ভুত গুণের কথা আপনাদের বলা হয়নি। এমনিতেই কুকুরদের গন্ধের নাক ভাল, কোনো-কোনো জাতের কুকুররা আবার ওই ব্যাপারটায় পয়লা নম্বর। যেমন পুলিশদের কুকুর আমার টোটো– একেবারে বুনো বলেই হোক বা ওর কোনো স্পেশ্যাল কোয়ালিটির জন্যেই হোক গন্ধের ব্যাপারে এক্সসেপশনাল। মনে হবে, ওর কোনো সিক্সথ সেন্স আছে। আনবিলিভেল! ওই যে সেদিন ছেলেটির সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলার সময় ও তার ট্র্যাকসুটের গায়ের গন্ধ শুঁকেছে, সেটা কিন্তু ভুলে যাবে না। নেভার। অন্তত এত তাড়াতাড়ি নয়। যদি এমন কিছু হয় মিস্টার রায়, টোটোকে কাজে লাগাবার দরকার হয় আমায় বলবেন। আমি আমার সাধ্যমতন সাহায্য করব।”
কিকিরা শুনলেন। মাথা নাড়লেন। “ধন্যবাদ স্যার।”
“আচ্ছা, নমস্কার।”
বাড়ির বাইরে এসে কিকিরা ঘাড় ঘুরিয়ে চন্দনকে দেখলেন। চন্দন চুপচাপ।
হাঁটতে-হাঁটতে কিকিরা বললেন, “সিনহাসাহেবকে কেমন মনে হল, চাঁদু?”
অন্যমনস্ক ছিল চন্দন। রাত হয়ে যাচ্ছে। আকাশ পরিষ্কার। কোথাও একটু মেঘ নেই। হাওয়াও না থাকার মতন। একটু বৃষ্টি বাদলা আবার না হলে বাঁচা যাবে না! এবারের গরমটা যেন একনাগাড়ে জ্বালাচ্ছে।
“কী গো চাঁদুবাবু! কথার জবাব দিলে না?”
“কিছু বললেন?”
“কেমন লাগল সিনহাসাহেবকে।”
“ভালই লাগল। ওঁকে সন্দেহ করার কোনো কারণ দেখছি না।”
“হু! ..ইয়ে, কুকুররা কখন ঘুমোয়?”
“মানে?” চন্দন অবাক!
“আমি বলছি, কুকুররা কি খাস সাহেবদের মধ্যে সন্ধেয় সন্ধেয় ডিনার সেরে নেয়। তারপর ঘুমিয়ে পড়ে! আর্লি টু বেড অ্যান্ড আর্লি টু রাইজ! আটটা বাজবার আগেই খেয়েদেয়ে ঘুম! নো সাড়াশব্দ! ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমোয় নাকি!”
“এ আপনি কী বলছেন?”
“বাড়িতে কি কুকুরটা ছিল?”
“তার মানে?”
“ধরো যদি না থাকে!”
“না-থেকে যাবে কোথায়?”
“তা বলতে পারব না। … তবে হ্যাঁ, পাড়ার লোক যদি দেখে থাকে– সিহাসাহেব রোজ সকালে কুকুর নিয়ে মর্নিং ওয়াক করতে বেরুচ্ছেন– তবে কুকুর নিশ্চয় ওবাড়িতে আছে। থাকে। অন্তত সকালে। … সন্ধের পর– কথাটা আর শেষ করলেন না কিকিরা।
চন্দন বুঝতে পারল না, কিকিরা কী বলতে চাইছেন।
.
০৯.
ধরে আনতে বললে বেঁধে আনার মতন করে ধীরাজকে পাকড়াও করে নিয়ে এল তারাপদ কিকিরার কাছে। এনে বলল, “এই নিন স্যার, বাবলুদের গ্রুপের ধীরাজদাকে নিয়ে এসেছি।”
কিকিরার ফ্ল্যাটের চেহারা দেখে হয়ত অতটা নয়, কিন্তু বসার ঘর দেখে রীতিমতন ঘাবড়ে গিয়েছিল ধীরাজ। এরকম বিচিত্র ঘর বোধ হয় আগে সে দেখেনি। যতরকম অদ্ভুত আর পুরনো জিনিস সব কি এখানে? তারাপদর কথা শুনে সে ভেবেছিল, বেশ সাজানো-গোছানো কোনো অ্যামেচার ডিটেকটিভের সঙ্গে সে দেখা করতে যাচ্ছে। খানিকটা কৌতূহলও হয়েছিল। এখন সে বুঝতে পারছে, যার সঙ্গে সে দেখা করতে এসেছে সেই ভদ্রলোক গোয়েন্দার “গ’-ও নয়। এই কি গোয়েন্দার চেহারা! রোগা, ঢ্যাঙা, আধবুড়ো, গর্তে-ডোবানো চোখ, লম্বা-লম্বা উসকোখুসকো চুল–এই মানুষ কখনোই গোয়েন্দা, পেশাদারি বা শখের–কোনো জাতেরই গোয়েন্দা হতে পারেন না! ধীরাজের মেজাজই বিগড়ে গেল।
