“করার বিশেষ কিছু নেই, শুধু বিষ্ণুর খবরটা ডিটেলে কৃষ্ণকান্তকে জানাতে পারি।”
“ওটা তেমন জরুরি নয়, স্যার। কাল ফোন করে জানাতে পারেন অফিসে।”
“তা হলে বাড়ি ফিরতে হয়।”
“তাই চলুন।”
কিকিরা বলতে যাচ্ছিলেন, তাই চলো; হঠাৎ কী মাথায় এল, বললেন, “চাঁদু, একবার সেই ড অ্যান্ড দি ম্যান সিনহার বাড়িতে গেলে কেমন হয়! আমরা তো কাছাকাছিই রয়েছি।”
চন্দন অবাক! বলল, “এখন যাবেন? বাড়িতে পাবেন তাঁকে! হোটেলের ম্যানেজার মানুষ, এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবেন?”
“চেষ্টা করা যেতে পারে। এমনিতে ভেবেছিলাম, তাঁর হোটেলেই যাব। ভাবছি, কাছাকাছি যখন এসে পড়েছি একবার চেষ্টা করতে দোষ কোথায়?
চন্দনের তেমন গা ছিল না। বলল, “বিষ্ণু যা বলল, তাতে কুকুরঅলা ভদ্রলোককে সে সেদিন ওই সময়ে কাছাকাছি দেখেনি।”
“তাই তো বলল! … তবু চলো, একবার আলাপ করে দেখা যাক। নাও একটা গাড়ি ধরো।”
.
রাজেন সিনহাকে বাড়িতেই পাওয়া গেল।
টিভি দেখছিলেন। নিজেই বাইরে এসে কোলাপসিবল গেটের ফাঁক দিয়ে দেখলেন কিকিরাদের।
“কী চাই?”
“আপনার কাছেই এসেছি।”
“আমার কাছে? আপনারা?”
“আমরা বেপাড়ার লোক। আপনি চিনবেন না। দুটো কথা বলতে এসেছি।”
“কী ব্যাপারে?”
“কৃষ্ণকান্তবাবুর ছেলে বাবলুর ব্যাপারে।”
রাজেন সিনহা যেন ভাবলেন কয়েক মুহূর্ত। “আমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন? আসুন।”
“আপনার কুকুর? কুকুরে আমার ভীষণ ভয়, স্যার।”
“কুকুর পেছনের দিকে বাঁধা আছে। ভয় নেই।”
নিজের হাতে গেটের ভেতর দিকের তালা খুলে দিলেন সিনহা। “আসুন।”
চার-ছ’ পা এগিয়ে ডানদিকে বসার ঘর সিনহাসাহেবের। সাজানো-গোছানো। তবে পুরোপুরি সাজানো নয় বলেই মনে হল। নতুন এসেছেন।
টিভি বন্ধ করে দিলেন ভদ্রলোক। “বসুন।”
কিকিরারা বসলেন। নিজের এবং চন্দনের পরিচয় দিলেন। হাসি-তামাশা করলেন না।
রাজেন সিনহার বয়েস বছর বাহান্ন-চুয়ান্ন। মাথায় বিশেষ লম্বা নয়। সামান্য মেদবহুল চেহারা। হাত-পা খাটো ধরনের, শক্ত। মাথার টাকটি চোখে পড়ার মতন। পরনে পাজামা, গায়ে খাটো পাঞ্জাবি, ফতুয়া বললেও চলে। গোল মুখ। চোখ উজ্জ্বল। থুতনির তলায় কাঁচাপাকা দাড়ি।
“বলুন?”
“আপনার কুকুর হঠাৎ এসে পড়বে না তো?”
“না। ঘুমিয়ে আছে। বাঁধাও আছে।”
কিকিরা বিনয় করে বললেন, “আমরা বাবলুর খোঁজখবর করে বেড়াচ্ছি। মানে কৃষ্ণকান্তবাবুর কথামতন…”
“আপনারা প্রাইভেট ডিটেকটিভ?”
“না স্যার, আমাদের সঙ্গে গোয়েন্দাগিরির কোনো সম্পর্ক নেই। বলতে পারেন, আমরা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো পার্টি।”
“ও! তা দরকারটা বলুন?”
“বলছি। এক গ্লাস জল পাব?”
“জল! নিশ্চয়। পাহাড়ি পাহাড়ি।”
ডাক শুনে পাহাড়ি এল। বেঁটেখাটো তাগড়া মাঝবয়েসি নেপালি কাজের লোক। রাজেন সিনহা ইশারায় জল দিতে বললেন। ঠাণ্ডা জল। পাহাড়ি চলে গেল।
কিকিরা বললেন, “আপনি এ-পাড়ায় নতুন মিস্টার সিনহা!”
“হ্যাঁ, নতুন। সবেই এসেছি।”
“বাবলুকে আপনি দেখেছেন?”
“দেখেছি। আগে ওর নাম জানতাম না। পরে শুনলাম।”
“বাবলুকে কি আপনি সেদিনই প্রথম দেখলেন?”
“কবে?”
“যেদিন থেকে ওকে আর পাওয়া যাচ্ছে না?”
“না, তার দিন দুই আগে প্রথম দেখেছি। … কথা হয়নি।”
“কথা হয়নি। শুনলাম যেদিন”
“যেদিন থেকে ছেলেটিকে পাওয়া যাচ্ছে না সেইদিনই সকালে তার সঙ্গে আমার আলাপ হয়। ও দৌড়তে বেরিয়েছিল, আমি আমার টোটো আই মিন কুকুরকে নিয়ে মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছিলাম। রেল লাইন পেরিয়ে খানিকটা এগোতেই লেকের কাছে ওর সঙ্গে আলাপ। ছেলেটি আমাকে টোটোর কথা জিজ্ঞেস করছিল। তারপর যে যার মতন চলে যাই। … কেন, মিস্টার দত্তরায়কে তো আমি সে-কথা বলেছি। উনি কয়েকদিন আগে আমার কাছে এসেছিলেন।”
পাহাড়ি ঘরে এল। গোল বাহারি ট্রে করে প্লেটের ওপর কাচের গ্লাস বসিয়ে কোল্ড ড্রিঙ্কস এনেছে দু’জনের জন্য। নামিয়ে রাখল।
কিকিরা বললেন, “আরে, এ-সব আবার কেন! প্লেইন জল হলেই চলত।”
“এটাও জল! নিন। “
কিকিরা আর চন্দন গ্লাস তুলে নিল।
দু-চার চুমুক কোল্ড ড্রিঙ্কস খেয়ে কিকিরা বললেন, “আপনি সেদিন পরে আর বাবলুকে দেখেননি?”
“খেয়াল করতে পারছি না। কেন?”
“আমরা শুনলাম, তার খানিকটা পরে বাবলুকে কিন্ন্যাপ করা হয়েছে। এমনভাবে ঘটনাটা ঘটানো হয়েছে যাতে চট করে বোঝা না যায় একটা গ্যাং তাকে কিডন্যাপ করছে।” কিকিরা খানিকটা আগে শোনা বিষ্ণুর কথাগুলো বুঝিয়ে বললেন সিনহাকে।
চন্দন একটাও কথা বলছিল না। রাজেন সিনহাকে দেখছিল। ভদ্রলোকের কথাবার্তা, আচার-আচরণের মধ্যে সাজানো-গোছানো ভাব আছে। গলার স্বর খানিকটা গম্ভীর, অথচ রুক্ষ নয়। হোটেল ম্যানেজার বলেই হয়ত কেতাদুরস্ত আচরণ।
সিনহা মন দিয়ে কিকিরার কথাগুলো শুনছিলেন। ভাববার চেষ্টাও করছিলেন।
“আপনি গাড়িটাড়ি কিছু দেখেননি?” কিকিরা বললেন।
“গাড়ি! … দেখুন, কলকাতার রাস্তায় গাড়ি দেখা যায় না এমন হয় না, সে ভোরেই হোক কি মাঝ রাতে! এক-আধটা গাড়ি নিশ্চয় দেখা যাবে। তবে আমি নজর করে গাড়িটাড়ি দেখিনি। যদি দেখতাম, দু-তিনটে লোক মিলে ছেলেটিকে ঠেলতে-ঠেলতে কোনো গাড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছে, বাধা দিতাম।”
“আপনি?”
“হ্যাঁ,” সিনহা একটু হাসলেন, “আমার গায়ে খানিকটা জোর এখনো আছে। তবে তার দরকার হত না। টোটোকে ছেড়ে দিতাম।”
