বিষ্ণুর বাবা নিজেই ছেলের বিছানায় বসলেন। “আপনারা বসুন। আমি এখানেই বসলাম।”
কিকিরারা বসলেন।
ভদ্রলোক বললেন, “ওর কথা বলতে কষ্ট হয়। আগে তো মুখ নাড়তেই পারছিল না। এখন পারছে। যা জিজ্ঞেস করার অল্প কথায় করবেন। আপনাদের সব কথা বলতে হবে না, আমি আপনাদের কথা মল্লিকদের মুখে শুনে ওকে বলে রেখেছি। শুধু আপনাদের যা জানার, জেনে নিন।”
কিকিরা বললেন, “ভালই করেছেন। আমরা সামান্য কটা কথা জেনেই চলে যাব।”
বিষ্ণু তাকিয়ে থাকল।
কিকিরা বিষ্ণুকে বললেন, “সেদিন তুমি কী দেখেছিলে একটু বলতে পারবে?”
বিষ্ণু কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকল। তারপর বলল, “বলছি।” কথা বলতে তার কষ্টই হচ্ছিল। ভাল করে মুখ নাড়তে পারছে না। তবু থেমে-থেমে, মাঝে-মাঝে ব্যথার দরুন কষ্টের মুখ করে যা বলল তাতে বোঝা গেল, সেদিন সকালে সে রোজকার মতন রবীন্দ্র সরোবর স্টেডিয়ামের দিকে যাচ্ছিল। সে ফুটবল প্লেয়ার। সকালে ঘণ্টাখানেক ছোটাছুটি, প্র্যাকটিস করে সে যখন প্রায় স্টেডিয়ামের কাছাকাছি পৌঁছেছে, তখন দেখে একটি ছেলেকে দু-তিনজনে মিলে ঠেলতে ঠেলতে এনে একটা গাড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে দিচ্ছে।
“কী গাড়ি?”
“মারুতি ভ্যান।”
“রং?”
“কালচে মতন। নেভি ব্লু হবে।”
“নম্বর?”
“জানি না। দেখার কথা মনে হয়নি।”
“যাকে ঠেলতে-ঠেলতে আনছিল তার পোশাকআশাক?”
“ট্রাকসুট পরা।”
“হঠাৎ ঠেলতে-ঠেলতে এনে গাড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে দিল?”
“না, না, মানে, আগে তো আমি নজর করিনি। খেয়ালও করিনি। আমার মনে হল, ট্রাকসুট-পরা ছেলেটির পাশে-পাশে, পেছনে ওরাও জগিং করছিল। আচমকা তারা ওকে ঘিরে ফেলে, তারপর ঠেলে নিয়ে কাছের গাড়িতে তুলে দেয়।”
“তুমি একেবারে ঠিক যা দেখেছ তাই বলছ?”
“হ্যাঁ। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, ছেলেটি যখন ছুটছিল তখন পাশ থেকে বা পেছন থেকে অন্য দুজনের কেউ তাকে ল্যাং মেরেছিল, বা পুশ করেছিল। ছেলেটি হোঁচট খাওয়ার মতন মুখ থুবড়ে পড়তে যাচ্ছিল, তখন তাকে ওরা ধরে ফেলে। তারপর গাড়ির দিকে…”
“বুঝেছি।… তুমি ছেলেটিকে চেনো?”
“না। তবে তাকে আমি মাঝে-মাঝে ওদিকে দৌড়তে দেখেছি।”
“তোমাকে ওই গাড়িঅলারা ধাক্কা মারল কেন?”
“জানি না। আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে ওদের দেখছিলাম। … শেষে এক-দু’বার চেঁচিয়ে উঠেছিলাম। ওরা গাড়ির মুখ ঘুরিয়েই রেখেছিল। সঙ্গে-সঙ্গে পালাল। যে গাড়ি চালাচ্ছিল, সে হয় আনাড়ি, না হয় তাড়াতাড়ির মধ্যে পালাতে গিয়ে আমায় ধাক্কা মেরেছে।”
“তারপর?”
“আমি রাস্তার পাশে ছিটকে পড়লাম। … আর আমার কিছু মনে নেই।”
বেশ কষ্ট করেই কথাগুলো বলছিল বিষ্ণু। কথাও স্পষ্ট নয়। জড়িয়ে, যাচ্ছে।
বিষ্ণুর বাবা তাকালেন। যেন বলতে চাইলেন, আর নয় এবার শেষ করুন।
কিকিরা মাথা নাড়লেন। হ্যাঁ, তাঁরা উঠে পড়বেন এবার। চন্দনের দিকে তাকালেন কিকিরা।
চন্দন কী ভেবে বিষ্ণুকে জিজ্ঞেস করল, “ঘটনাটা যখন ঘটে আশেপাশে লোক ছিল না?”
“অত ভোরে ওখানে লোক কমই থাকে। তফার্তেছিল নিশ্চয় দু-একজন। নজর করেনি। করলেও বুঝতে পারেনি ব্যাপারটা। হঠাৎ চোখে পড়লে মনে হবে, ছেলেটি হয়ত অসুস্থ হয়ে পড়েছে দৌড়তে- দৌড়তে তাকে অন্যরা তুলে নিয়ে গিয়ে বসাচ্ছে কোথাও।”
“গাড়িটার জানলা…?”
“বন্ধ ছিল।”
“কাছাকাছি কোনো ভদ্রলোক কি কুকুর নিয়ে বেড়াচ্ছিলেন?”
“লক্ষ করিনি।”
“গাড়িটা কোন দিকে গেল?”
“সোজা বেরিয়ে গেল। যেটুকু চোখে পড়েছিল মনে হল শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রোডের দিকে।”
কিকিরা উঠে পড়লেন। বললেন, “ঠিক আছে ভাই। তোমার সঙ্গে কথা বলে উপকার হল। … নাও, তাড়াতাড়ি ভাল হয়ে ওঠো। আমরা চলি।” তারপর ভদ্রলোককে বললেন, “আপনাকে আর কী বলে ধন্যবাদ জানাব! যথাসাধ্য সাহায্য করলেন আমাদের।”
বিষ্ণুর বাবা উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। বললেন, “না না, এ আর এমন কিসের উপকার! ওই হারানো ছেলেটির খোঁজ পেলে একবার জানাবেন।”
“চলি।” ভদ্রলোক কিকিরাদের সঙ্গে কেবিনের বাইরে বেরিয়ে এলেন। “আপনারা এগোন, আমি একটু পরে আসছি। নমস্কার।”
কিকিরারা কয়েক পা এগিয়ে সিঁড়ি ধরলেন। ছোট্ট নার্সিং হোম। দোতলা বাড়ি। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই আলো চলে গেল। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে পড়তে হল চন্দনদের। লোডশেডিং নাকি?
না, লোডশেডিং নয়; আবার আলো এসে গেল। ভেতরে কোনো গণ্ডগোল হয়ত!
রাস্তায় এসে কিকিরা বললেন, “চাঁদু, আমার এইরকমই সন্দেহ হচ্ছিল, কিডন্যাপিং। কিন্তু কেন? হোয়াই?”
“ঘড়ির জন্যে। আর কী হতে পারে?”
“মানতেই হবে। তবে কথা হল, ঘড়িটা যদি বাবলুর কাছে থাকে তবেই তাকে কিডন্যাপ করার মানে হয়। আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না, সাত সকালে বাবলু কেন একটা অচল পকেট ঘড়ি সঙ্গে নিয়ে বেরুবে! ব্যাপারটা কি আগে থেকে ঠিক করা ছিল। প্রিঅ্যারেঞ্জড? যদি তাই হয়, বাবলু কাকে ঘড়িটা দিতে বেরিয়েছিল। কেন? সেই লোকটা কোথায় গেল? প্রিঅ্যারেঞ্জড না হলে যারা বাবলুকে তুলে নিয়ে গেল তারাই বা জানল কেমন করে বাবলুর কাছে ঘড়ি আছে?”
চন্দন বলল, “লোকটাই হয়ত বলেছে।”
কিকিরা চুপ। অন্যমনস্কভাবে হাঁটতে হাঁটতে একটা সিগারেট চাইলেন চন্দনের কাছে। ধরালেন। “কটা বাজে?”
“সাড়ে সাত।”
“একবার বাবলুদের বাড়ি যাবে নাকি? মাত্র সাড়ে সাত–!”
“কী করবেন গিয়ে?”
