তারাপদ কান চুলকোতে-চুলকোতে বলল, “বাবলু আর জখম-হওয়া ছেলেটির মধ্যে জানাশোনা ছিল বলে তো আপনি কোনো প্রমাণ পাননি।”
“না, মাথা নাড়লেন কিকিরা, “এখনো পাইনি। হয়ত জানাশোনা ছিলও না। তাতে কিন্তু একথা প্রমাণ হয় না যে, ছেলেটি কিছু দেখেনি? ধরো সে কিছু দেখেছে? বা তার নজরে পড়েছে?”
“আপনি কি বলতে চান, রাস্তা থেকে একটা ছেলের কিছু নজরে পড়েছিল বলে গাড়িটা তাকে চাপা দিয়ে পালাবার চেষ্টা করেছিল?”
“না, তা হয়ত নয়। পালাতে গিয়েও ধাক্কা মারতে পারে। ছেলেটির সঙ্গে দেখা না করলে আমরা তা জানতে পারছি না।”
চন্দন বলল, “ওদের বাড়ির লোক আমাদের দেখা করতে দেবে ছেলেটির সঙ্গে? তার ওপর সে এখন নার্সিং হোমে।”
“দেবে। মল্লিকদের বড় ভাই মানুষটি ভাল। আমি তাঁর কাছে কিছুই লুকোইনি। কেমন করে তাঁদের কোম্পানির নাম পেলাম, কেনই বা ফক্স নিয়ে মাথা ঘামালাম, সবই বলেছি। বাবলুর কথা বলেছি। তার মা, বাবা, বোনের কথা। বলেছি, ওঁরা দুশ্চিন্তা, দুভাবনায় প্রায় মরে আছেন। কোনো ভাবে, যে কোনো লোকের কাছ থেকে একটু সাহায্য পেলে যদি আমাদের সামান্য উপকার হয়–” কিকিরা কথা শেষ না করে হাই তুললেন। তাঁকে বেশ ক্লান্ত মনে হচ্ছিল। নিজেই আবার বললেন, “ভদ্রলোককে আমার খুবই সিমপ্যাথেটিক মনে হল। হাজার হোক, তিনিও তো ছেলের বাবা।”
“ওঁর কোনো ছেলে কি পাশের বাড়ির জখম-হওয়া ছেলেটির বন্ধু?”
“ছোট ছেলের বন্ধু।”
“চলুন, তবে দেখা করতে যাই,” চন্দন বলল।
“ভাবছি, কাল যাব। তোমাকে সঙ্গে নিয়ে।… তুমি আমি যাব নার্সিং হোমে, আর তারাপদ যাবে বাবলুদের ড্রামা ক্লাবের সেক্রেটারি ধীরাজের কাছে।”
“ধীরাজ খড়্গপুর থেকে ফিরলে তো?” তারাপদ বলল।
“এখনো ফেরেনি? কতদিন গিয়ে বসে থাকবে খঙ্গাপুরে?”
“দেখি। মার অসুখ শুনে বাড়ি গিয়েছে। ফিরেছে কিনা কে জানে! খোঁজ করব।”
সামান্য সময় চুপচাপ। পাখার শব্দ, নিচে থেকে ভেসে আসা টুকরো-টাকরা অস্পষ্ট কথা, বড় রাস্তায় গাড়ির হর্ন কানে আসছিল।
চন্দন হঠাৎ বলল, “আচ্ছা কিকিরা, আপনি ঘড়ির ব্যাপারটা বাদ দিয়ে ভেবেছেন কিছু?”
“না,” মাথা নাড়লেন কিকিরা, “দু-একবার ভাবার চেষ্টা করেছি। পারিনি। মাথার মধ্যে ঘড়িটাই টিকটিক করছে।” ও
“ওটা অচল ঘড়ি। টিকটিক করবে না,” চন্দন ঠাট্টা করেই বলল।
কিকিরা আবার হাই তুললেন। “ভেরি মাচ টায়ার্ড হে। এই বয়েসে রোদে এত ঘোরাঘুরি পোয়! …কী বলছিলে! ঘড়ির কথা! না, ঘড়ি বাদ দিলে বাবলুর হঠাৎ অদৃশ্য হওয়ার কোনো কারণ আমি দেখি না। ঘড়ি মাস্ট।”
“বেশ, ঘড়ি মাস্ট। কিন্তু আপনি বলুন, একটা অচল ঘড়ি, হোক না সোনার, তবু সেটা এমন কী লক্ষ টাকা দাম যে, তার জন্যে…”
“সেটাই তো বুঝতে পারছি না চাঁদু। সোনার ঘড়ি বলেই তার দাম আজকের বাজারেও লক্ষ টাকা নয়। হতে পারে না। রেয়ার ঘড়ি হলেও অত দাম হবে বলে আমার মনে হয় না। আমি আমার জুয়েলার বন্ধু দত্তকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে সোনার যে হিসেব দিল তাতে মনে হয়, অল গোল্ড হলেও, ওই ঘড়িতে আড়াই-তিন ভরির বেশি সোনা থাকার কথা নয়। হাজার পনেরো টাকা হতে পারে বড়জোর এখনকার বাজার দরে। তবে সোনার সঙ্গে পান না মিশিয়ে এ কাজ করা যায় না। বিদেশি ব্যাপার, তাও অনেক পুরনো। ওরা কীভাবে করেছিল, কে বলতে পারে!”
তারাপদ বলল, “সবই হল কিকিরা, শুধু একজনের কাছে এখনো যাওয়া হয়নি।”
“কে? সিনহাসাহেব! হোটেল ম্যানেজার?”
“হ্যাঁ। ওই ভদ্রলোক আর বাবলু সেদিন দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কথা বলেছেন। ওঁর কাছে যাওয়া উচিত একবার।”
“যাব। …আগে, মল্লিকদের পাড়ার ছেলেটির সঙ্গে কথা বলে নিই একবার।”
তারাপদ আর কিছু বলল না।
.
০৮.
মল্লিকদের পাশের বাড়ির ছেলেটির নাম বিষ্ণু। বছর কুড়ি একুশ বয়েস। বাবলুর সমবয়েসিই হবে। ছেলেটিকে দেখতে বেশ। ছিপছিপে গড়ন। মাথার চুল কোঁকড়ানো। সামান্য কটা রঙের চোখের মণি। গায়ের রংটি ধবধবে ফরসা।
নার্সিং হোমের এক সরু মতন কেবিনে সে শুয়ে ছিল। ডান চোয়ালে থুতনির দিকে জখম হয়েছিল তার; মাথার দিক থেকে পাক মেরে মুখ-চোয়াল জড়িয়ে ব্যান্ডেজ। ডান হাতের হাড় ভেঙেছে। প্লাস্টার করা। পায়ের দিকেও অল্পস্বল্প জখম।
বিষ্ণু এখন অনেকটাই ভাল। দু-চারদিনের মধ্যে নার্সিং হোম থেকে ছেড়ে দেবে। বাড়ি চলে যাবে বিষ্ণু। তবে তার চিকিৎসা এখনো চলবে। মাসখানেকের কম তো নয়ই।
বিষ্ণুর বাড়ির লোকজনরা চলে গেলেন। একটু তাড়াতাড়িই আজ। বিষ্ণুর বাবাই তাদের সরিয়ে দিলেন। তারপর কিকিরা আর চন্দনকে ছেলের কেবিনে ডেকে আনলেন। আগে থেকেই ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন মল্লিকমশাই বিষ্ণুর বাবাকে বলে। ভিজিটিং আওয়ার্স শেষ হয়ে আসার পরও কিকিরারা কিছুক্ষণ থাকতে পারবেন, অসুবিধে হবে না।
ছেলেকে বলে রেখেছিলেন ভদ্রলোক আগেই, শুধু পরিচয় করিয়ে দিলেন কিকিরার সঙ্গে।
কিকিরা কিছু ফুল এনেছিলেন হাতে করে। রাখলেন। নরম মুখ করে দেখলেন বিষ্ণুকে। চন্দন যেন খুঁটিয়ে দেখে নিল ছেলেটিকে। আন্দাজ করে নিল কী ধরনের চোট-জখম হতে পারে বিষ্ণুর।
কিকিরা বিষ্ণুর বাবাকে বসতে বললেন।
“আপনারা?”
“বসব। আপনি চেয়ারটায় বসুন। আমি টুলটা টেনে নিচ্ছি। চন্দন বিছানাতেই বসতে পারবে।”
