“ও!…আপনি ওই ফক্স মল্লিকদের কাউকে চেনেন?”
“না। ওদের নাম জানি। পুরনো কোম্পানি। আগে বোধ হয় ওদের নাম ছিল ফক্স অ্যান্ড কলিন্স। পরে নাম পালটেছে।”
“বাবলুর সঙ্গে মল্লিকবাড়ির কারও ভাবসাব ছিল?”
কৃষ্ণকান্ত যেন কথাটা শুনতেই পাননি। বোকার মতন তাকিয়ে থাকলেন। পরে বললেন, “বাবলুর সঙ্গে ভাবসাব! তা কেমন করে হবে! আমি নিজেই যাদের চিনি না, বাবলু তাদের কেমন করে চিনবে?”
কিকিরা হেসে বললেন, “তা কেন হবে না! আপনি না চিনতে পারেন, তা বলে বাবলু চিনবে না! তার বন্ধুবান্ধব, চেনাজানা ছেলে, কলেজের ছেলেদের আপনি কি সবাইকে চেনেন?”
কৃষ্ণকান্ত চুপ করে থাকলেন। কথাটা ঠিকই। বাবলুর সঙ্গীসাথীদের কজনকেই বা তিনি চেনেন! চুপ করে থাকতে-থাকতে হঠাৎ বললেন, “ওরা থাকে কোথায়? বাড়ি কোথায় মল্লিকদের?”
“মুদিয়ালি।”
“তাই নাকি! ..তবে তো আমাদের বাড়ি থেকে দূরে নয়।”
“না। আমার ওদিকে আসা-যাওয়া নেই। কমই চিনি। টালিগঞ্জ রেল। ব্রিজ অবশ্য চিনি।”
“ও বাড়ির কোনো ছেলে কি বাবলুর বন্ধু?”
“সেটা এখনই বলতে পারছি না। তবে, বাবলু যেদিন যে-সময় থে ঘরছাড়া, ঠিক সেদিন সেই সময় ওই লেকের কাছে বড় রাস্তায় একটা গাি একটি ছেলেকে ধাক্কা মেরে পালায়। ছেলেটি মল্লিকদের পাশের বাড়ির। বেচারি জখম হয়েছে। হাত ভেঙেছে, পায়ে চোট। তার চেয়েও বড় কথা, ছিটকে পড়ে গিয়ে মুখে এমন লেগেছে যে, গালের চোয়ালের হাড় ফেটে গিয়েছে। বেচারি নার্সিংহোমে পড়ে আছে আজ ক’দিন। কপাল ভাল, মাথাটা বেঁচে গিয়েছে।”
কৃষ্ণকান্ত কেমন হতবাক! “আপনাকে এ-সব কথা কে বলল?”
“আমি তো আপনাকে আগেই বললাম, এখানে আসার আগে আমি মল্লিকদের অফিসে গিয়েছিলাম। আলাপ করে কথাবার্তা বলতে বলতে ঘটনাটার কথা শুনলাম।”
“আপনি বাবলুর কথা বলেছেন?”
“বলেছি। ওঁরা কাগজেও দেখেছেন নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনটা। কিন্তু এই দুটো ঘটনার মধ্যে কোনো যোগাযোগ আছে ভাবেননি। তা ছাড়া ওঁদের কেউ বাবলুকে চেনেন না। দেখেছেন বলেও মনে করতে পারলেন না।”
কৃষ্ণকান্ত সিগারেটের টুকরোটা নিভিয়ে দিয়ে মাথায় হাত দিলেন। অল্পসময় চুপচাপ। পরে বললেন, “ছেলেটি এখন কেমন আছে?”
“আগের চেয়ে ভাল।” বলে কিকিরা উঠে দাঁড়ালেন। “এই দুটো ঘটনার মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কিনা তা এখনই বলতে পারছি না কৃষ্ণকান্তবাবু! থাকলে আমি বলব, বাবলুকে কেউ বা কারা তুলে নিয়ে গিয়েছে। …দেখি, খোঁজ নিই। আচ্ছা চলি!”
.
০৭.
সন্ধেবেলায় কিকিরার ঘরে বসে কথাবার্তা হচ্ছিল।
কিকিরা যেমন সারা দুপুর স্ট্র্যান্ড রোডের ফক্স অ্যান্ড মল্লিকদের অফিস ঘুরে কৃষ্ণকান্তর কাছে গিয়েছিলেন, তারাপদও তার অফিস থেকে মাঝ দুপুরে বেরিয়ে লালবাজারের কাছে ফতেচাঁদ জুয়েলারের খোঁজ করেছে। কোনো লাভ হয়নি তারাপদর; ফতেচাঁদের দোকান আর নেই, অনেক আগেই উঠে গিয়েছে। আশেপাশের লোকজনকে জিজ্ঞেস করে শুধু এইমাত্র জানা গেল যে, বাবুজি মারা যাওয়ার পর তাঁর ছেলেরা কারবার গুটিয়ে দিল্লি চলে গিয়েছেন।
তারাপদ বলল, “স্যার, ফতেচাঁদের ব্যাপারটা বাদ দিয়ে দিন।”
কিকিরা যে খুব কিছু আশা করেছিলেন ফতেচাঁদদের কাছ থেকে, তা নয়। তবু দু এক কথা যদি জানা যেত, খারাপ হত না। আসলে এই ধরনের কাজই হল, কোথাও কোনো গন্ধ পেলে শুঁকে বেড়ানো। কিকিরা ঠাট্টা করে বলেন, দ্যাখো হে তারা আর স্যান্ডেল উড–সেই যে কথা আছে যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখো তাই পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন….।
কথাবার্তার মধ্যে একসময় কিকিরা বললেন, “এখন আমার সন্দেহ হচ্ছে, বাবলুকে সেদিন কেউ তুলে নিয়ে গিয়েছে। কিডন্যাপ…!”
চন্দন বলল, “কীভাবে?”
তারাপদ বলল, “কিকিরা, বাবলুর বন্ধু পবন যা বলেছিল তাতে মনে হয়, ওকে ঝপ করে তুলে নিয়ে যাওয়া সহজ কর্ম নয়। বাবলুর স্বাস্থ্য ভাল, স্পোর্টসম্যান, ক্যারাটের প্যাঁচ-পয়জার জানে একটু-আধটু..”
কিকিরা বললেন, “সবই ঠিক। তবু ধরো কেউ যদি আচমকা তাকে ধরে অজ্ঞানটজ্ঞান করে…”
কিকিরার কথা শেষ হতে দিল না চন্দন, বলল, “শুনুন স্যার, অত সহজে কাউকে অজ্ঞান করা যায় না। ওই যে আমরা গল্পের বইয়ে পড়ি, রাস্তাঘাটে ভিড়ের মধ্যে কেউ রুমালে ক্লোরোফর্ম ঢেলে একজনের মুখের কাছে চেপে ধরতেই সে সঙ্গে-সঙ্গে অজ্ঞান হয়ে গেল, তা কিন্তু হয় না বাস্তবে। এর অনেক অসুবিধে আছে।.. তবে হ্যাঁ, দু-তিনজনে মিলে একটা লোকের হাত, পা, মাথা চেপে ধরেছে, তাকে নড়তে দিচ্ছে না, অন্য একজন তার মুখের কাছে ক্লোরোফর্ম দেওয়া রুমাল জোরসে চেপে ধরল, তবে লোকটা অজ্ঞান হতে পারে। কিন্তু মনে রাখবেন এ-ভাবে ক্লোরোফর্ম অ্যাপ্লাই করা ভীষণ রিস্কি। এতে মানুষ মারাও যেতে পারে। এভরি চান্স।”
কিকিরা শুনলেন, বললেন, “চাঁদু, তুমি ডাক্তার; তোমার কথা মানলাম। কিন্তু ধরো দু-চারজনের একটা গ্যাঙ- বাবলুকে বাগে পেয়ে কাছাকাছি একটা গাড়িতে তুলে নিয়ে হাত-মুখ চেপে ধরে অজ্ঞান করার চেষ্টা করে তবে?”
“করতে পারে,” চন্দন বলল।
“আর সেই গাড়ি পালাবার সময় রাস্তার মধ্যে কাউকে ধাক্কা মেরে পালায়?”
“পালাতে পারে।… আপনি কি ওই মল্লিকদের প্রতিবেশী ছেলেটির কথা বলছেন?”
“ভাবছি। দুটো ঘটনাই ঘটেছে একই দিনে, মোটামুটি একই সময়ে, আর কাছাকাছি জায়গায়।”
