“আপনি বকসি কোম্পানির নাম শুনেছেন? বসি বানানটাই ইংরিজিতে BOXY বলে লেখা!”
বকসি কোম্পানি! বসি তো অনেক আছে। …আমি ব্যবসায়ী মানুষ, কতজনের সঙ্গে মেলামেশা করতে হয়–তার মধ্যে বসিও আছে। এক বকসি আমার কনস্ট্রাকশানের কাজে লোহার ছড় সাপ্লাই করে। কে, বকসি কোম্পানি। আরেকজন আমার কাছেই কাজ করে। সুপারভাইজ করে।”
“আমি BOXY –বি ও এক্স ওয়াই দিয়ে BOXY বলছি।”
“না।”
“আপনাদের বাড়িতে যে সোনার ঘড়িটা ছিল, তার ওপরকার ডালার তলায় যে বকসি কোম্পানির নাম খোদাই করা ছিল…! সেই বকসি। দেখেননি?”
কৃষ্ণকান্ত অবাক চোখে তাকিয়ে থাকলেন কয়েক পলক। পরে বললেন, “হ্যাঁ, দেখেছি। কেন বলুন তো?”
“বকসি বানানটা খেয়াল আছে?”
“আছে। আপনি যা বলছেন–সেইরকমই। BOXY। তবে ওটা যে আমাদের বকসি–”
“কোম্পানির নামের তলায় ঠিকানা ছিল ধর্মতলা স্ট্রিটের?”
“ছিল। তবে শুধু ধর্মতলা ছিল। ক্যালকাটা। একেবারে খুদে-খুদে হরফে।”
“ওই কোম্পানির কাউকে আপনি চিনতেন?”
“না।”
“ননী বকসি?”
“না।”
“কোনোদিন সেই দোকানের খোঁজও করেননি?”
“না, মশাই! কী জন্যে খোঁজ করব?”
কিকিরা পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখ মুছলেন। আজ বড় গুমোট, সকাল থেকেই। ঘামে সর্বাঙ্গ ভিজে জল হয়ে যাচ্ছে। মুখ মুছতে মুছতে কিকিরা বললেন, “আচ্ছা কৃষ্ণকান্তবাবু, আপনার কি একবারও ইচ্ছে হয়নি, আপনার বাবার স্মৃতি হিসেবে যে-ঘড়িটা তুলে রেখে দিয়েছিলেন, সেটা একবার সারাবার চেষ্টা করা! হাজার তোক ঘড়িটা তো সুন্দর দামি।”
মাথা নেড়ে কৃষ্ণকান্ত বললেন, “না মশাই, মনে হয়নি। কী হবে সারিয়ে? কেই বা সারতে পারবে! লাভের মধ্যে যা আছে তাও থাকবে না। সারাবার হলে বাবাই সারাতেন। …আপনি বার বার আমায় ঘড়ির কথা বলছেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন, সোনার ঘড়ি হলেও বাবার স্মৃতি হিসেবেই আমরা ওটা রেখে দিয়েছিলাম। অন্য কিছু মনে হয়নি।”
কিকিরা জল খেতে চাইলেন।
জল আনতে বললেন কৃষ্ণকান্ত বেয়ারাকে ডেকে।
“ঘড়ির কথা আমি বারবার তুলছি কেন জানেন?” কিকিরা বললেন, “আমার বিশ্বাস ওই ঘড়ির জন্যেই বাবলুর কিছু হয়েছে। বাবলুর বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ আর ঘড়িটা হঠাৎ খোয়া যাওয়া–একই সঙ্গে–এই দুটোর মধ্যে বড় সম্পর্ক রয়েছে। …যাক গে, আপনি কি জানেন আপনার বাবা কবে ঘড়িটা কিনেছিলেন?”
“না, মনে নেই।”
“বছর পঞ্চাশ বাহান্ন আগে?”
“কেমন করে বলব! আমার তখন কতটুকু বয়েস। বড়জোর দু তিন বছর। দাদা আমার চেয়ে দু বছরের বড়। দাদাও বলতে পারবে না।”
জল এল।
কিকিরা জল খেলেন। কৃষ্ণকান্ত সিগারেটের প্যাকেট, লাইটার এগিয়ে দিলেন কিকিরাকে।
সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে কিকিরা বললেন, “ওই ঘড়ির যারা মালিক ছিল বকসি কোম্পানি, তাদের নাম জোগাড় করতে আমায় কষ্ট করতে হয়েছে। ভাগ্য ভাল, পেয়ে গেলাম। বসিদের দোকান কবেই উঠে গিয়েছে। মালিকের মেজো ছেলে ননী বকসি এখনো আছেন। বয়েস হয়েছে। তাঁর সঙ্গে আমি দেখা করেছিলাম। কথা হল। শুনলাম, ঘড়িটা একচল্লিশ-বিয়াল্লিশ সাল নাগাদ ওঁদের গ্রামের বাড়ি থেকে চুরি গিয়েছিল। ওঁরা তখন কলকাতা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। ইভ্যাকুয়ি হিসেবে।” বলে কিকিরা পুরো ঘটনাটাই বললেন কৃষ্ণকান্তকে।
কৃষ্ণকান্ত শুনলেন। মনে হল না, তিনি এসব কথা আগে শুনেছেন। শেষে বললেন, “আমার বাবাকে নিশ্চয় আপনারা চোর ঠাওরাবেন না!”
কিকিরা জিব কেটে বললেন, “ছি, ছি, এ আপনি কী বলছেন! …চোরাই জিনিস কবে কার হাত-ফেরতা হয়ে একসময় যদি আপনার বাবার হাতে এসে থাকে, তিনি কিনেছিলেন। এতে দোষ কোথায়?”
“বাবা বেঁচে থাকলে এব্যাপারে যা বলার বলতে পারতেন। আমি কিছু জানি না, কী বলব!”
“যাক গে, বাদ দিন ওকথা। আচ্ছা মশাই, আপনি তো ঘরবাড়ি কনস্ট্রাকশানের কাজ করেন। আমায় একটা কথা বলুন। ফক্স অ্যান্ড মল্লিক বলে একটা কোম্পানি আছে। আমি আজ সেখানে গিয়েছিলাম। সেখান থেকেই আপনার কাছে আসছি। ওখানে গিয়ে খোঁজখবর করে শুনলাম, ওরা কলকাতার পুরনো ঘরবাড়ি ভাঙার পর ভাঙা বাড়ির দরজা, জানলা, টালি, মার্বেল, কাঁচ, বাথরুমের ফিটিংস..”
“হা।” কিকিরাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই কৃষ্ণকান্ত বললেন, “জানি। ওরা–যাকে আমরা সাহেববাড়ি বলি, সেই সব বাড়ি ভাঙার পর দরকারি যা কিছু কিনে নেয়। কলকাতার আশেপাশেও এমন বাড়ি আছে। আবার পুরনো বনেদি বাড়ি ভাঙার পরও নানা জিনিস কেনে। আসবাব, থানা, ঝাড়–অনেক কিছু।”
“নিলামে কেনে?”
“সবসময় নয়। সরাসরিও কিনতে পারে। ওরা খোঁজ রাখে। এটাই ওদের কারবার। ওদের এজেন্টও থাকে। সত্যি বলতে কী, পুরনো ভাঙা বাড়ির কাঠকুটোর বাজার দর বেশ চড়া। কেন হবে না বলুন! এখন ওসব কাঠ আপনি পাবেন কোথায়! কোথায় পাবেন ইটালিয়ান মার্বেল, জয়পুরি টালি।” কৃষ্ণকান্ত নিজে এবার একটা সিগারেট ধরালেন। কথা বলতে বলতে হয়ত খানিকার মতন একটু অন্যমনস্ক হয়েছেন। নিজেই আবার বললেন, “আমার এক ক্লায়েন্ট তাঁর বাড়ির অর্ধেক জিনিসপত্র এইভাবে কিনেছিলেন। একটা বাথটব পেয়েছিলেন ফুট পাঁচেক লম্বা, অ্যানামাল, যাকে বলে কলাই করা–সেই জিনিস। ড্যামেজ সামান্যই। কী দেখতে।”
“আপনিও বাড়ির কাজে এ-সব কেনেন?”
“না, আমি কিনি না। ক্লায়েন্ট যদি কিনে আনেন, আমরা কাজে লাগাবার মতন করে নিই। অন্তত কাঠটা দরজা-জানলার কাজে লাগাই। টালিও নিই বেছেবুছে।”
