ননী বকসি বললেন, “ছেলেটির খোঁজ পেলে আমায় জানাবেন। একটা ফোন করলেও হবে। আমাদের ফোন নম্বর…” বলে উনি বাড়ির ফোন নম্বর জানালেন।
.
বাইরে এসে কিকিরা তাঁর চুরুট ধরালেন। মুখে কথা নেই। হাঁটতে লাগলেন। সন্ধে হয়ে গিয়েছে কখন।
তারাপদও পাশে-পাশে হাঁটছিল কিকিরার। অনেকক্ষণ পরে বলল, “স্যার, এ তো বড় ঝামেলায় পড়া গেল! ঘড়ি চুলোয় যাক। বাবলুর একটা খবর যদি পেতাম।”
কিকিরা বললেন, “পেলে তো ভালই হত। কিন্তু ঘড়ি বাদ দিয়ে বাবলুকে কি পাওয়া যাবে! যাবে না।”
“আমি বুঝতে পারছি না, ওই ঘড়ি নিয়ে বাবলু কী করবে?” ধরে নিলাম, ঘড়িটা বেচে দিলে পাঁচ-দশ হাজার টাকা সে পেতে পারে। কিন্তু বাবলু বেচবে কেন? আর পাঁচ-সাত হাজার টাকা ওর বাবার কাছে কিছুই নয়।…যদি বাবলুর টাকার দরকারই হত, মা বাবার কাছেই পেতে পারত।”
কিকিরা ভিড়ের মধ্য দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে বললেন, “পাঁচ-সাত কি দশ হাজারের ব্যাপার নয়, তারাবাবু।” মাথা নাড়লেন কিকিরা। তারপরই কী মনে করে বললেন, “আমি কৃষ্ণকান্তবাবুকে বারবার জিজ্ঞেস করেছি ঘড়ির কথা। তিনি একই কথা বলেন, তাঁর বাবার ঘড়ি। অচল। স্মৃতি হিসেবে বাড়িতে পড়ে ছিল। ও নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি। বাবলুর জেঠামশাইবাবলুর বাবার সঙ্গেও চারু অ্যাভিনিউর বাড়িতে আমি দেখা করেছি। তিনিও ঘড়ি নিয়ে গরজ দেখালেন না। ওঁরও সেই একই কথা, বাবার ঘড়ি, কৃষ্ণ রেখে দিয়েছিল স্মৃতি হিসেবে।”
“তবে?”
“আমার মনে হয়, বাবলুর বাবা-জেঠা-ঘড়িটার ভেতরের কথা জানেন না। হয় জানেন না, না হয় জানতে চান না। প্রথমটাই হয়ত ঠিক।”
“বাবা-জেঠা জানেন না, বাবলু জানতে পারল! এটা কেমন করে হয়?”
“বলতে পারব না। কোনোরকমে জেনেছে।”
“আপনি সেটা ভাবতে পারেন। কিন্তু কেমন করে জেনেছে, কার কাছ থেকে জেনেছে, ধরবেন কেমন করে?”
অন্যমনস্কভাবে কিকিরা বললেন, “দেখি।…ভাল কথা, টেলিফোন ডিরেক্টরি ঘেঁটে আমি একটা ফক্স পেয়েছি।”
তারাপদ দাঁড়িয়ে পড়ল। অবাক হয়ে বলল, “ফক্স?”
“ফক্স অ্যান্ড মল্লিক।”
“অদ্ভুত! কিসের কোম্পানি?”
“জানি না। লেখা নেই। ডালহাউসির দিকে অফিস। স্ট্র্যান্ড রোড।”
তারাপদর কেমন হাসি পেয়ে গেল। বলল, “স্যার, আপনি BOXY থেকে বক্স পেলেন। আবার ফক্সও পেলেন দেখছি!” ফক্স যখন পেয়ে গেলেন, একটা অক্সও পেয়ে যেতে পারেন।”
কিকিরা হাসলেন না। বললেন, “হাসবার কিছু নেই, তারাবাবু; এরকম তুমি অনেক পাবে। আগে সাহেবসুবোর ব্যবসা ছিল, পরে দিশিবাবুরা ব্যবসা কিনে নিয়েছে। কিন্তু ওই যাকে গুড উইল বলে, পুরনো কোম্পানির গুডউইলটা কাজে লাগায়। আমার মনে হয় এটাও তাই।…কাজে লাগুক না লাগুক কাল-পরশু একবার ফক্স অ্যান্ড মল্লিকের খোঁজ করতে হবে।
তারাপদ চুপ করেই থাকল।
.
০৬.
কৃষ্ণকান্ত দুপুরে তাঁর ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের অফিসে ছিলেন। এটিই তাঁর আদি অফিস, বাড়িতে যে-অফিস আছে সেটি অনেকটা ব্যক্তিগত।
ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের নানা অফিসের ভিড়ে কৃষ্ণকান্তর অফিসকে আলাদা করে চিনে নেওয়ার উপায় নেই। তেতলা পুরনো এক বাড়ির দোতলায় অন্য দু-তিনটি অফিসঘরের একপাশে কৃষ্ণকান্তর দু কামরার অফিস।
কিকিরা এসেছিলেন দেখা করতে।
কাঠের পার্টিশান করা ঘরের মধ্যে কৃষ্ণকান্তর মুখোমুখি বসে কথা হচ্ছিল। ঘরে তাঁরা মাত্র দু’জন। পাশের ঘর থেকে সাড়া-শব্দ আসছিল। অফিসের কাজকর্ম চলছে।
কৃষ্ণকান্তকে যেন আরও শুকনো, ফ্যাকাসে দেখাচ্ছিল। চিন্তায়-চিন্তায় চোখের তলা কালচে হয়ে গিয়েছে, দৃষ্টি হতাশ, অন্যমনস্ক। গায়ের জামাটাও আধ-ময়লা, কোঁচকানো। কোনো ব্যাপারেই গা নেই, উৎসাহ নেই মানুষটির। অফিসেও এসেছেন যেন আসতে হয় বলে, বা নিজেকে খানিকক্ষণ ভুলিয়ে রাখার জন্য।
সামান্য কথাবার্তার পর কিকিরা বললেন, “পুলিশ থেকে আর কোনো খবর পেলেন না?”
মাথা নাড়লেন কৃষ্ণকান্ত। “না। ওরা মশাই এখন আমাকেই চার্জ করছে। বলছে, ছেলের সম্পর্কে আপনি কারেক্ট ইনফরমেশন দেননি। ছেলের খোঁজখবরও ভাল করে রাখতেন বলে মনে হয় না। আপনার ছেলে খুব ভাল ছিল কে বলল আপনাকে! আজকাল এইসব ছোকরা ড্রাগ পেডলারদের সঙ্গে কেমন দহরম মহরম করে–জানেন আপনি?”
কিকিরা অবাক হয়ে বললেন, “সে কী!”
“কী আর বলব, রায়মশাই। আমার ছেলেকে আমি চিনলুম না, ওরা চিনে ফেলল! পুলিশের কথা থেকে মনে হল, ওরা মনে করছে বাবল নিজেই গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছে। ওদের কথায়, যে-কোনো অ্যাডাল্ট যদি নিজে গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে চায় এই কলকাতা শহরে, তবে পুলিশের সাধ্য কী–তাকে খুঁজে বার করা।”
“বলল?”
“হ্যাঁ। …আমি বললাম, তা হলে আপনারা ক্রিমিনালদের খোঁজ করেন কেমন করে? ওরা বলল, ক্রিমিনালদের কথা আলাদা। তাদের ঠিকুজি আমাদের কাছে থাকে। খোঁজ রাখি। আপনার ছেলে কি ক্রিমিন্যাল!..এসব শুনে আমি আর কী বলব বলুন! চুপ করে গেলুম। “
কিকিরা একটু সময় চুপ করে থাকলেন। অন্যমনস্কভাবে অফিসঘরের চারপাশে তাকালেন। মামুলি অফিস। টেবিল, দু তিনটি চেয়ার, ফোন, ক্যালেন্ডার, দুটো বাড়ির ছবি, লোহার আলমারির মাথায় একরাশ কাগজ, গোল করে পাকানো, বোধ হয় ঘরবাড়ির প্ল্যান।
কিকিরা বললেন, “আমি দু-একটা কথা জানতে এসেছি।”
“বলুন। আর নতুন কী জানাব, রায়বাবু!”
