চন্দন প্রথমটায় রাজি হচ্ছিল না; তার হাসপাতাল। আবার পুরো ব্যাপারটাই এমন গোলমেলে যে একলা তারাপদকে ছেড়ে দিতে তার ভাল লাগছিল না। তারাপদ কোনো কালেই সাহসী নয়, বরং ভিতু ধরনের; তার শরীর স্বাস্থ্য ততটা মজবুত নয়; নিরীহ ভালোমানুষ গোছের ছেলে ও, ভিড়ের ভয়ে কোনোদিন মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের লিগ বা শিন্ডের খেলা পর্যন্ত দেখতে গেল না। চন্দন কতবার বলেছে, চল্ না-আমি তো রয়েছি। তারাপদ মাথা নেড়েছে আর বলেছে, থাক ভাই, আমার মাঠে গিয়ে দরকার নেই, রিলে শুনলেই আমার খেলা দেখা হয়ে যাবে।
সেই তারাপদকে একলা একলা কী করে ছেড়ে দেয় চন্দন! তারাপদর মা যখন মারা যায় চন্দন শ্মশানে গিয়েছিল, তার মনে আছে সেদিন বারবার তারাপদ শুধু চন্দনকেই আঁকড়ে ধরেছিল আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল ।
অনেক রকম গবেষণার পর ঠিক হল, চন্দন হাসপাতাল থেকে কয়েক দিনের ছুটি নেবে, বললবাবার অসুখ। কথাটা মিথ্যে হলেও করার কিছু নেই, ছুটির যখন দরকার তখন বড় কিছু একটা না বললে ছুটি দেবে কেন?
চন্দন রাজি হয়ে যাবার পর তারাপদ বটুকবাবুর মেসে ফিরল। স্নান খাওয়া সেরে বেরুলো কিছু টাকা পয়সা জোগাড়ের ধান্ধায়। বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে যা পায় জুটিয়ে অন্তত একশো সোয়া শো টাকা তো হাতে রাখতেই হবে।
দুপুরের পর তারাপদ মেসে ফিরল। বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তারপর গোছগাছ শুরু করল।
সন্ধের গোড়ায় গেল চন্দনের হোস্টেলে। চন্দন প্রায় তৈরি। তারপর দুই বন্ধু মিলে জয় মা বলে বেরিয়ে পড়েছে। দেখা যাক কপালে কী আছে!
চন্দন টিকিট কেটে ফিরে এসে বলল, “নে, চল…। ননম্বরে গাড়ি দেবে।
জিনিসপত্র তেমন কিছু নেই তাদের, দুজনের দুটো কিট ব্যাগ, চন্দন একটা কম্বল নিয়েছে হাতে ঝুলিয়ে, রাত্রে শীতের হাত থেকে বাঁচতে হবে। তারাপদর কম্বল নেই, সে একটা তুষের পুরনো চাদর আর বঙ্কিমদার হনুমান টুপিটা নিয়ে নিয়েছে সঙ্গে করে। মেসে কেউ জানে না–তারাপদ কোথায় যাচ্ছে।
তারাপদ শুধু বলেছে, একটু বাইরে যাচ্ছি এক বন্ধুর সঙ্গে, দরকার আছে।
প্লাটফর্মে ঢুকে তারাপদরা দেখল, ভিড় ভীষণ একটা কিছু নয়, মোটামুটি। প্যাসেঞ্জার ট্রেন; তায় আবার শীতকাল, হয়ত তাই ভিড়টা কমই।
একটু পরেই প্লাটফর্মে গাড়ি দিয়ে দিল। চন্দন বাহাদুর ছেলে। গাড়ি প্লাটফর্মে ঢুকতে না ঢুকতেই কী-এক বিচিত্র কায়দায় সে চলন্ত ট্রেনের হ্যাঁন্ডেল ধরে ঝুলে পড়ল ।
গাড়ি দাঁড়াবার পর তারাপদ খুঁজে খুঁজে চন্দনকে বের করে নিল। চমৎকার জায়গা জুটিয়ে কম্বল বিছিয়ে ফেলেছে।
গাড়িতে উঠে তারাপদ বলল, “তোর দৌড়বার কী ছিল? ভিড় তেমন নেই।”
চন্দন বলল, “দেখতেই পাবি। ট্রেন ছাড়ার সময় হয়ে আসুক। নে বসে পড়। এদিকে আয়-জায়গা নিয়ে বস্–চাদরটা বিছিয়ে দে; শোবার জায়গা ছাড়বি না।”
কি ব্যাগ মাথার কাছে রেখে একেবারে কোণের দিকে মুখোমুখি দুই বন্ধু কম্বল আর চাদর পেতে ফেলল। কামরায় লোক উঠছে, কুলি উঠছে, আবার নেমেও যাচ্ছে, মালপত্র রাখার হইচই।
চন্দন নিজের জায়গায় বসে সিগারেটের প্যাকেট বের করল। “তোর এই মালগাড়ি কাল নটা দশটার সময় শংকরপুর পৌঁছবে।”
গাড়িটা অবশ্য প্যাসেঞ্জার ট্রেন, মালগাড়িরই যমজ-ভাই। ঢিকির ঢিকির করে যাবে, হাজারবার দাঁড়াবে। অন্য কোনো গাড়িতে যাওয়া চলত, কিন্তু সারাদিন এত ছুটোছুটি করতে হয়েছে তারাপদকে যে সে-সুযোগ তার হয়নি। একটা এক্সপ্রেস গাড়ি ছিল, সেটা শংকরপুরে দাঁড়াত না।
ততক্ষণে দু বন্ধু মিলে সিগারেট ধরিয়ে নিয়েছে। কামরায় তোক বাড়ছে, দেখতে দেখতে বেশ ভিড় হয়ে গেল। প্লাটফর্মে আরও যাত্রী এসে পৌঁছচ্ছে। তারাপদদের কামরায় এক দঙ্গল বেহারি উঠেছে, দু পাঁচজন বাঙালিও।
এমন সময় এক অদ্ভুত ধরনের ভদ্রলোক এসে কামরায় উঠলেন। টিয়াপখির মতন নাক, তোবড়ানো গাল, গর্তে বসা চোখ। চেহারাটি রোগাসোগা, গায়ে সেই আদ্যিকালের অলেস্টার, মাথায় কাশ্মীরি টুপি ডান হাতে একটা সুটকেস ঝুলছে, বাঁ হাতে খয়েরি বালাপোশ । ভদ্রলোক এতই রোগা যে গায়ে অলেস্টার চাপিয়েও তাঁকে মোটা দেখাচ্ছে না। গলায় মোটা মাফলার জড়ানো।
চন্দন ভদ্রলোককে দেখে নিচু গলায় বলল, “ডিসপেপসিয়ার কেস রে তারা, টিপিক্যাল ডিসপেপটিক পেশেন্ট।”
ভদ্রলোক তারাপদদের দিকেই এগিয়ে এলেন। কাছে এসে এমন মুখ করে হাসলেন যেন কতই না চেনা তারাপদর, গঙ্গাচরণ মিত্তির লেনে রোজই দেখা হয়।
“কত দূর?” ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন হাসিমুখে। হাসবার সময় তাঁর। দাঁত দেখা গেল। এবড়োখেবড়ো কালচে দাঁত, পান-খাওয়া দাঁত যেন।
তারাপদ ভদ্রলোককে কোনোদিন দেখেনি। জবাবও দিল না কথার।
ভদ্রলোক কিন্তু নির্বিকার, সুটকেসটা বেঞ্চির তলায় রেখে বালাপোশটা বিছিয়ে নিলেন, তারাপদর চাদর সামান্য গুটিয়ে গেল। তাঁর চেনাচেনা হসি আর কথা : “এই ট্রেনটায় যত ছিঁচকে চোরের উপদ্রব, বুঝলেন মশাই, চোখে পাতা দু দণ্ড বুজেছেন কি পুঁটলি-পাটলা সুটকেস ব্যাগ হাওয়া। ওই দরজার দিকটায় তাই গেলাম না।…ওদিকটায় একটু পরেই দেখবেন কী হয়-ছিলিম চলবে। সে কী দৃর্গন্ধ।! গোয়ালাগুলো ব্যোম ভেলার জাত। গাঁজাই ওদের সর্বনাশ করল। দেখি স্যার, আপনার পা-টা একটু সরান–সুটকেসটাকে প্লেস করে দি আরও একটু সেফ সাইডে।“
