“আপনি দেখেননি?”
“না। ঘড়ির ওপর কভার ছিল। ডালা। সব পকেট ঘড়িতেই থাকত তখন। ডালাটা দেখতে সুন্দর। অতি চমৎকার। চারপাশে এনগ্রেভিং। ডিজাইন। মাঝখানে দুটো মাথা। ডালাকভারের পেছনদিকে কোম্পানির নাম। আরও কী কী খোদাই করা ছিল। মনে পড়ছে না। ..তবে হ্যাঁ। পেছনদিকে বাবাও আমাদের কোম্পানির নাম স্যাকরাকে দিয়ে খোদাই করিয়ে নিয়েছিলেন।”
“BOXY & CO?”
“হ্যাঁ।”
“ঘড়িটা আপনারা পেলেন কেমন করে, কিছু জানেন?”
“ভাল জানি না। বাবার মুখে শুনেছি একজন সেলার–মানে জাহাজি সাহেব-ঘড়িটা বেচে দিয়ে যায় দোকানে।”
“বলেন কী! অমন সোনার ঘড়ি-”
“আরে মশাই, জাহাজ থেকে অমন চুরিচামারি করা জিনিস সেলাররা নেশার ঘোরে কতই বিক্রি করে দিয়ে যেত।”
“কত দামে কিনেছিলেন আপনারা বাবা? জানেন?”
“না। তবে সাহেব-বেটা হয়ত ওটাকে ক্যারেট গোল্ড ভেবেছিল, তাই বেশি দাম হাঁকতে পারেনি। তবু তখনকার দিনেই হাজার কয়েক টাকা তো নিয়েছিল নিশ্চয়।”
চা খাওয়ার ফাঁকেই কিকিরা বললেন, “আপনার বাবা কি ক্যানটন ঘড়ির কথা জানতেন?”
“বাবা অনেক রেয়ার ঘড়ির খোঁজখবর রাখতেন। তাঁর ব্যবসাও ছিল রেয়ার ঘড়ি বিক্রি করা। তবে, ওই ঘডিটার সম্পর্কে ভাল করে খোঁজখবর পরে নিয়েছেন বলেই আমার মনে হয়।”
“ঘড়িটার শেষপর্যন্ত কী হল? বিক্রি হয়ে গেল?” তারাপদ হঠাৎল।
ননী বকসি মাথা নাড়লেন। বললেন, “না, তা আর হল কোথায়! আমরা যখন কলকাতায় বোমা পড়ার সময় দেশের বাড়িতে পালিয়ে যাই, তখন বাবা কয়েকটা রেয়ার ঘড়ি আমাদের সঙ্গে সরিয়ে ফেলেন। ভেবেছিলেন, বোমাটোমা পড়ে কলকাতার কী হবে কেউ তো জানে না। ভবিষ্যতের কথা ভেবে কয়েকটা সরিয়ে ফেলেন। ঘড়িটা আমাদের কাছেই ছিল দেশের বাড়িতে। শেষে আর পাঁচটা জিনিসের সঙ্গে একদিন চুরি হয়ে গেল।”
“দেশের বাড়ি থেকে?”
“হ্যাঁ। চোর-ছ্যাঁচড়ের উৎপাত তখন গাঁ-গ্রামে। রোজই এটাসেটা যায় এর-ওর বাড়ি থেকে। আমাদেরও গেল।”
কিকিরা চা-খাওয়া শেষ করে বললেন, “ও-রকম একটা রেয়ার ঘড়ি চলে গেল, আপনারা খোঁজখবর করেননি?”
“বাবা নিশ্চয় করেছিলেন। লাভ হয়নি।” ননী বকসি পান-জরদা মুখে দিলেন। পানের ডিবে এগিয়ে দিলেন কিকিরার দিকে। “তা মশাই, আপনারা হঠাৎ এই ঘড়ির খোঁজখবর করতে এসেছেন কেন–তা তো বললেন না!”
কিকিরা পানের ভক্ত নন। তবু একটা পান নিলেন। বললেন, “কেন এলাম শুনতে চাইলে আপনাকে অনেক কথা বলতে হয়।”
“বলুন, শুনি। আপত্তি আছে?”
“না, না।”
কিকিরা যথাসম্ভব সংক্ষেপে কৃষ্ণকান্তর কথা বললেন। বাবলুর নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ায় পুরো বিবরণ জানালেন।
ননী বকসি অবাক হয়ে কিকিরার কথা শুনছিলেন। দু-একবার জিজ্ঞেসও করলেন একথা সে কথা।
কিকিরার কথা শেষ হল। তিনজনেই চুপচাপ।
কিছুক্ষণ পরে ননী বকসি বললেন, “ঘড়িটার ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই। ওটা আমাদেরই ঘড়ি। ওরম দ্বিতীয় ঘড়ি অন্য কারও কাছে ছিল বলে আমি জানি না, মশাই। …তবু, আমি একজনের খবর দেব, আপনি একবার সেখানে খোঁজ করে দেখুন।” বলে পান চিবোতে চিবোতে জড়ানো জিভে ননী বকসি বললেন, “আমি এক জুয়েলারকে দেখেছি। বাবার কাছে আসতেন। বাবা যখন অসুস্থ, বাইরে বেরোতে পারেন না, তখনো তিনি বাবাকে দেখতে আসতেন। এঁরা সে-সময় বড় জুয়েলার ছিলেন। অবাঙালি, ফতেচাঁদ জুরাভাই। কলকাতার বনেদি বাড়ির অনেকের সঙ্গে কারবার ছিল। ভদ্রলোক বাবার চেয়ে বয়েসে ছোট ছিলেন। বাবাকে “দাদাজি’ বলতেন। বাংলা বলতে পারতেন পরিষ্কার। ফতেচাঁদবাবুর কাছেও দামি ঘড়ি থাকত। খবর রাখতেন।..ওঁর দোকান ছিল লালবাজারের কাছে। বাড়ি ভবানীপুরে। উনি এখনো বেঁচে আছেন কিনা জানি না। যদি বেঁচে থাকেন, একেবারেই বুড়ো হয়ে গিয়েছেন। আশির ওপর তো হবেই। উনি বেঁচে থাকলে আপনারা হয়ত কিছু জানতে পারেন।”
কিকিরা মন দিয়ে বসিবাবুর কথা শুনছিলেন।”ভবানীপুরে কোথায় বাড়ি?”।
“রাস্তার নাম জানি না। জগুবাবুর বাজারের আশেপাশে থাকতেন।…দোকানেই খোঁজ করে দেখুন না! সেটা সহজ হবে।”
“দোকান আছে তো?”
মাথা নাড়তে-নাড়তে ননী বকসি বললেন, “তা বলতে পারব না। পুরনো জুয়েলাররা অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে শুনি।”
তারাপদ উসখুস করছিল। তার মনে হচ্ছিল, এবার উঠে পড়া ভাল। নতুন করে আর কিছু জানার নেই।
কিকিরা উঠি-উঠি ভাব করে বললেন, “আপনাকে অনেকক্ষণ বিরক্ত করলাম। কী করব বলুন, একটা জোয়ান ছেলে বাড়ি থেকে হঠাৎ নিরুদ্দেশ। মা-বাবার মনের অবস্থা বুঝতেই পারেন!”
“পারি বইকি, ভায়া। কলকাতা শহরটাও তো আজকাল ভয়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
কিকিরা উঠে পড়লেন। তারপর আচমকা বললেন, “ঘড়িটার দাম এখন কত হতে পারে, বকসিদা? ওই রেয়ার সোনার ঘড়িটার?”
ননী বকসি তাকিয়ে থাকলেন কয়েক পলক। পরে বললেন, “বলতে পারব।। আমার কোনো আইডিয়া নেই। শখের জিনিস কিনে টাকা নষ্ট করবে, এমন লোক এখন কোথায়?”
“সোনা…?”
“ওতে আর কতটুকু সোনা আছে। বিদেশি হলেও পাকা সোনা হবে বলে মনে হয় না। আমাদের হিসেবে ভরি তিনেক হতে পারে। কিন্তু মশাই জুয়েলগুলো কস্টলি।”
“আচ্ছা, চলি..! পরে একদিন আসব গল্পগুজব করতে। আপনি ভাল থাকুন।” কিকিরা নমস্কার করে বেরিয়ে আসছিলেন, ননী বক্সীর কথায় দাঁড়িয়ে পড়লেন।
