ননী বকসির চেহারা, সাজপোশাকের মধ্যে পুরনো কলকাতার বনেদিয়ানার একটা ছাপ যেন আছে। ভদ্রলোকের বয়েস পঁয়ষট্টির কাছাকাছি হবে। স্বাস্থ্য এখন ততটা মজবুত নয়, তবু বোঝা যায় একসময় স্বাস্থ্যবানই ছিলেন। গায়ের রং ফরসা। প্রায়-গোল মুখ। মাথার মাঝখানে সিঁথি। সব চুলই সাদা। পরনে ভাল লুঙ্গি, গায়ে গেঞ্জি, গেঞ্জির বুকের কাছে বোতাম। ভদ্রলোক পান-জরদার ভক্ত।
কিকিরা খবর দিয়ে গিয়েছিলেন।
নিচের বৈঠকখানা ঘরে কিকিরাদের বসিয়ে ননী বকসি বললেন, “বসুন, সুর আমায় লোক পাঠিয়েছিল। চিঠি দিয়ে।”
কিকিরার সঙ্গে তারাপদ ছিল।
কিকিরা বললেন, “ভেবেছিলাম, দোকানে গিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করব। শুনলাম, আপনি দোকানে যাচ্ছেন না।”
“শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। বয়েস হয়েছে। প্রেশারের গোলমাল। মাঝে-মাঝেই যাই; ইচ্ছে না হলে যাই না। ছেলেরাই কারবার দেখে। আমি ওপর-ওপর। “
কিকিরা একটু হেসে বললেন, “ওপর-ওপরটাই কী কম বকসিমশাই। মাথা থাকলে শুধু ধড় কি কাজ করে!”
ননী বকসি হাসলেন। তারপর বললেন, “বলুন, আমি কী করতে পারি?”
অল্প অপেক্ষা করে কিকিরা বললেন, “সুরবাবু কি চিঠিতে আমার পরিচয় আপনাকে জানিয়ে দিয়েছেন?”
“হ্যাঁ। জানিয়েছে খানিকটা।”
“আমি আপনার কাছে কয়েকটা কথা জানতে এসেছি।”
“বলুন?”
“আপনার বাবার আমলে যে ঘড়ির দোকান ছিল সেই দোকানে আপনি আসা-যাওয়া করতেন?”
“করতাম বইকি! আমাদের ঘড়ির দোকান হয়েছিল উনিশ শো এক সালে। নাইনটিন হানড্রেড ওয়ান। আমাদের দোকানের বেশ নাম ছিল তখন বড়বড় কোম্পানির ঘড়ি রাখতাম। রেয়ার ঘড়িও। রিপেয়ারিং হত।”
“আপনারা তো কোম্পানির নাম রেখেছিলেন Boxy & Co?”
“হাঁ।”
“Boxy লিখতেন কেন?
“বাবা লিখতেন। তখনকার দিনে এরকম চল। বাবা বরাবরই নিজের নামের উপাধি ইংরিজিতে BOXY লিখতেন। আমাদের স্কুলের খাতায় BAKSHI লেখা হত।”
“আপনি ঠিক কোন বয়েস থেকে দোকানে যেতেন?”
“আমার জন্ম নাইনটিন থারটিতে। আমার দাদা ছিল আমার চেয়ে তিন বছরের বড়। আমি মেট্রোপলিটান স্কুলে পড়তাম। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই মাঝে-মাঝে দোকানে যেতাম। এমনি বেড়াতে। মানে যুদ্ধের সময়। কলকাতায় যখন জাপানি বোমা পড়ল, আমরা ক’জন আমাদের দেশের বাড়িতে গিয়ে ছিলাম। বাবা কলকাতায় থাকতেন।”
“আপনাদের দেশের বাড়ি কোথায়?”
“বর্ধমানের এক গ্রামে। জিরেনপুর।”
তারপর কানে লাগল কথাটা। বাবলু না জ’ দিয়ে একটা জায়গার কথা বলেছিল পবনকে। জ’ বা “ব হতে পারে বলেছিল। অবশ্য সঠিকভাবে নয়। সে কিকিরার দিকে তাকাল। কিকিরা তারাপদর মুখে শুনেছেন জবই।
কিকিরা একটুও চঞ্চল হলেন না।
ননী বকসি নিজেই বললেন, “যুদ্ধটুদ্ধ থামল। একদিন আমিও স্কুল থেকে বেরিয়ে কলেজে ঢুকলাম। কিন্তু কলেজটা শেষ করতে পারলাম না। বাবা মারা গেলেন। দাদা হঠাৎ ঘরবাড়ি ছেড়ে সন্ন্যাসী হয়ে গেলেন। আগে থাকতেন বিন্ধ্যাচলের দিকে। পরে কাশী। শেষে কাটোয়ার দিকে আশ্রম করেছিলেন। সেখানেই দেহরক্ষা করেন।” ননী বকসি একটু থামলেন। নিজেই আবার বললেন, “আমাদের ফ্যামিলিতে একটা অভিশাপ নেমে এল। বাবা যাওয়ার পর-পরই। বাবা গেলেন, মা চলে গেলেন, দাদা সংসার ছাড়ল, দিবু–আমার ছোট ভাই গয়ায় তর্পণ করতে গিয়ে অদ্ভুতভাবে ডুবে গেল।”
কিকিরা শুনলেন কথাগুলো। কী আর বলবেন! সহানুভূতি জানাতেও কেমন যেন লাগে!
সামান্য সময় চুপচাপ থাকার পর কিকিরা বললেন, “আমি একটা ঘড়ির খোঁজ করছি। পুরনো ঘড়ি। আপনি কি বলতে পারেন?”
“বাবার ঘড়ির ব্যবসা আমি নিজে বড় একটা দেখতাম না। সে বয়েসেও হয়নি। পরে তো দোকানই উঠে গেল। তবু বলুন, কোন ঘড়ির খোঁজ করছেন?”
“সোনার ঘড়ি। সুইস মেড। পকেট ঘড়ি।”
ননী বকসি রীতিমতন অবাক! তাকিয়ে থাকলেন। “সোনার পকেট ঘড়ি। ক্যানটন?”
“ক্যানটন?”
“ঘড়ির নাম ক্যানটন। ক্যানটন গোল্ড। এ ঘড়ির কথা আপনারা কোথ থেকে জানলেন? শ’খানেক বছর আগেকার মডেল। বাবার মুখে শুনেছি। “
কিকিরা আর তারাপদ মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন। কিকিরা বললেন, “বসিদা, আপনি নিজে এই ঘড়ি দেখেছেন?”
“আলবাত দেখেছি। অমন জিনিস দেখা যায় না। রেয়ার ঘড়ি। সারা পৃথিবীতে মাত্র পাঁচটা ক্যানটন গোল্ড পাওয়া গিয়েছিল। ওই ঘড়ি নিয়ে গল্প আছে। “
“কী গল্প?”
“কোনো কোটি-কোটিপতি এক ইটালিয়ান অডার দিয়ে ক্যানটন গোল্ড তৈরি করিয়েছিলেন। কিন্তু ঘড়ি নেওয়ার আগেই মারা যান। পরে যে চারজন বিদেশি ধনী ওই ঘড়ি কিনেছিলেন তার একজন জাহাজডুবি হয়ে মারা যান, একজন পাহাড় থেকে খাদে পড়ে গিয়ে মারা যান। বাকি দুজনের মধ্যে একজন আত্মহত্যা করেন নিজের মাথায় পিস্তল চালিয়ে, অন্যজনের প্রাণ যায় বুনো জন্তুর হাতে পড়ে। “
“এ তো গল্প!”
“তা হতে পারে। হয়ত দু-একজন সত্যি-সত্যি মারা গিয়েছিল, বাকিগুলো বানানো গল্প। তবে এটা ঠিক, ক্যানটন গোল্ড রেয়ার ঘড়ি। ভৈরি রেয়ার।”
কিকিরা বললেন, “ওই ঘড়ি নিজের চোখে আপনি দেখেছেন?”
“হ্যাঁ।”
“একটু বলবেন কেমন দেখতে?”
ননী বকসি চোখ বন্ধ করে যেন মনে করতে লাগলেন ঘড়ির কথা।
বাড়ির ভেতর থেকে চা, মিষ্টি এল।
“নিন, একটু চা খান” ননী বকসি বললেন, “ঘড়িটার কাঁটা সোনার। দাগগুলো রোমান নম্বর। ডায়াল প্লেট ব্রাইট অ্যান্ড কালারফুল। আলাদা কম্পাস আছে। সেকেন্ডের কাঁটা ছিল না। বোধ হয় হারিয়ে গিয়েছিল।”
