“একটু চেষ্টা করুন ভাই।”
“মনেই পড়ছে না।”
“ঠিক আছে, আমি পরে আসব, যদি আপনার মনে পড়ে। আজ আর বসব, আমায় এক জায়গায় যেতে হবে। তার আগে একবার আপনাদের ধীরাজদাদের সঙ্গে দেখা করে যাই। পাব তো তাঁকে এ সময়?”
“ধীরাজদাকে আজ পাবেন না। ধীরাজদা কলকাতায় নেই, খঙ্গাপুর গিয়েছে, বাড়িতে। মায়ের অসুখ। পরশু নাগাদ পাবেন।”
“আজ উঠি,” তারাপদ উঠে পড়ল। সে এখন গোলপার্কের কাছে একটা জায়গায় যাবে, চন্দনের সেখানে অপেক্ষা করার কথা।
দোকান থেকে বেরিয়ে আসতে-আসতে তারাপদ বলল, “আপনার কী মনে হয়? বাবলুকে কেউ জোর করে তুলে নিয়ে যেতে পারে রাস্তা থেকে?”
পবন মাথা নাড়ল। “একলা কেউ পারবে না, সাধারণ মানুষ হলে! হিন্দি ছবির পাক্কা গুণ্ডা বদমাশ হলে পারতে পারে।” পবন একটু হাসল। বলল, “বাবলু দারুণ দৌড়তে পারে, গায়ে জোর আছে, তা ছাড়া ও কিছুদিন ক্যারাটেও শিখেছিল। ওকে চট করে কাবু করা মুশকিল।”
তারাপদ তার ঘড়ি দেখল। আর দেরি করা যায় না।
.
চন্দন ঠিক জায়গায় অপেক্ষা করছিল।
তারাপদ এসে বলল, “কীরে! তোর খবর কী? কিছু জানতে পারলি?”
চন্দন বলল, “বন্ধুর সঙ্গে সেই বিকেল থেকে লেগে থাকলাম। দেখাও করলাম দু-তিনজনের সঙ্গে। সবাই বলল, বাবলুকে তারা লেকে দেখেছে। চোখে পড়েছে। কেউ আগে দেখেছে, কেউ পরে। মোট কথা, বাবলু যে সেদিন জগিং করছিল, সেটা ঠিকই। “
“আর ওই ভদ্রলোকের খোঁজ নিতে পেরেছিস?..রাজেন সিনহা?”
“চল, বলছি। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে পা ব্যথা হয়ে গেছে।”
“চায়ের দোকানে বসবি?”
“না, বাড়ি ফিরব। কোয়াটারে। চল, ট্যাক্সি নিই।”
কাছাকাছি ট্যাক্সি পেয়ে গেল চন্দন।
ধুলোর ঘূর্ণি উঠল হঠাৎ। ট্যাক্সিতে উঠে জানলার কাঁচ বন্ধ করল চন্দন। রুমালে চোখ-মুখ মুছতে মুছতে বলল, “বিকেলের আগে এসেছি, আর এখন ক’টা বাজল?”
“সাতটা বেজে গিয়েছে।”
ট্যাক্সি চলতে শুরু করেছিল। গড়িয়াহাট হয়েই সোজা যাবে পার্ক সার্কাস ময়দান হয়ে সি আই টি রোড, তারপর মৌলালি ধরবে।
“তোর বন্ধুকে বাড়িতে পেলি?” তারাপদ বলল।
“হ্যাঁ। বলা ছিল আগেই। বিদ্যুৎ পাঁচটা থেকে চেম্বার করে যোধপুর পার্কে। আজ ওর দেরি হল। ছ’টায় বসবে।”
ধুলোর ঘূর্ণি কেটে গিয়েছে। জানলার কাঁচ নামিয়ে দিতে দিতে চন্দন বলল, “বাবলুকে সেদিন সকালে লেকের কাছে যাঁরা দেখেছেন–তাঁদের একজন হলেন নিরাপদ চ্যাটার্জি। সত্তরের মতন বয়েস। রিটায়ার্ড প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি রোজই মর্নিং ওয়াক করেন। অন্য ভদ্রলোক হলেন সজল দত্ত। এঁরও বয়েস হয়েছে। খবরের কাগজের অফিসে পঁয়ত্রিশ বছর প্রেস ম্যানেজারি করেছেন। তিন নম্বর ভদ্রলোকের নাম মধুময় সরকার। বয়েস চল্লিশ ছাড়িয়েছে। কিন্তু হাই ব্লাড সুগার। ডাক্তার রোজ সকালে হাঁটতে বলেছে, জোরে-জোরে! এই তিনজনের সঙ্গেই আমার দেখা করিয়ে দিয়েছে বিদ্যুৎ। দু’জনকে বাড়িতেই পেয়ে গিয়েছিলাম। মধুময়কে পেলাম রাস্তায়। অফিস থেকে ফিরছেন।”
“কোনো ক্লু–?”
“কিস্যু না। নাথিং। বাবলুকে এঁরা দেখেছেন, এই পর্যন্ত।”
“রাজেন সিনহা?”
“দেখা হয়নি। তবে ইনফরমেশন পেলাম কিছু।”
“কী?”
“সিনহা সাহেব নাকি একসময় আন্দামানে ছিলেন। জাহাজেও কাজ করেছেন। পরে ভদ্রলোক মাদ্রাজে চলে আসেন। সেখান থেকে কলকাতায়।”
“কোথাকার লোক?”
“বলেন, এইদিককার। চব্বিশ পরগনার।”
“হোটল ম্যানেজারি?”
“আন্দামান থেকেই। মাদ্রাজে বছরখানেক। তারপর কলকাতা।”
“এখন যে হোটেলের ম্যানেজারি করেন, সেটার তিনি শুধুই ম্যানেজার? না, মালিকও?”।
“হাফ মালিক হতে পারেন। কিংবা পার্টনার?”
“আর কিছু?”
“পাড়ায় নতুন এসেছেন। ফ্যামিলি বলে কিছু নেই। কাজের লোক একজন, আর ওই কুকুর। কুকুরটার জাত বোঝা যায় না। বাঘের মতন লম্বা-চওড়া। তবে ভীষণ ট্রেন্ড। মনিবের হুকুম মতন চলে।”
“রাস্তায় দু-চারটেকে কামড়ে দিলেই হুকুম মেনে চলা বেরিয়ে যাবে।“
“মুখ গার্ড করা থাকে। কামড়াবার চান্স নেই।”
তারাপদ বুঝতে পারল, চাঁদুর বিকেলটাই বৃথা গিয়েছে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বাবলুকে সেদিন সকালে লেকে দেখা গিয়েছে এটা কোনো নতুন খবর নয়। আর সিনহা সাহেবের ব্যাপারেও মামুলি খবর যা পাওয়া গিয়েছে তাতেও কাজের কাজ হয়নি কিছু।
“দে, একটা সিগারেট দে।” চন্দন সিগারেট চাইল।
ট্যাক্সি পার্ক সার্কাস ময়দানের কাছে পৌঁছে গেল।
সিগারেট ধরিয়ে হতাশ গলায় চন্দন বলল, “তুই কিছু জানতে পারলি?”
“পারলাম। তবে–”
“বল, শুনি।”
তারাপদ পবনের সঙ্গে দেখা হওয়ার বৃত্তান্ত বলতে লাগল।
চন্দন মন দিয়ে শুনল। শেষে কী ভেবে বলল, “তারা, ঘড়িটা একটা বড় ফ্যাক্টার মনে হচ্ছে। না কিরে?”
“বুঝতে পারছি না! ঘড়ি নিয়ে একটা রহস্য থেকেই যাচ্ছে। তবে বাবলু তো সেদিন ঘড়িটা পবনকে দেখায়নি। হয়ত সঙ্গে ছিল না।”
“সন্ধেবেলায় ছিল না। পরের দিন সকালে দৌড়তে যাওয়ার সময়ই বা পকেট ঘড়ি সঙ্গে থাকবে কেন?”
তারাপদ পাঁচ কথা ভাবতে-ভাবতে বলল, “আমার কিছু মাথায় ঢুকছে না।”
“হবে না। বুঝলি! বাবলু-কেস সভ করা যাবে বলে মনে হচ্ছে না। ছেলেটা বেঁচে আছে কিনা–তাই বা কে জানে?”
.
বকসি কোম্পানির মেজোবাবু ননী বকসি–মানে ননীলাল বসিকে পেতে অসুবিধে হল না। এন্টালি বাজারের কাছাকাছি তাঁর বাড়ি।
