“কিকিরা।”
“কিকিরা–কি-কিরা! অদ্ভুত নাম। বাঙালি, না, জাপানি?”
তারাপদ হেসে ফেলল। “বাঙালি। পুরো নাম কিঙ্কর কিশোর রায়। ছোট করে কিকিরা।”
পবন এবার মজা পেয়ে গিয়েছিল যেন। বলল, “দারুণ নাম, দাদা।”
“ভাই, আমি কয়েকটা কথা জানতে এসেছি। যদি আমায় বিশ্বাস করে বলেন, বলবেন। আর যদি অবিশ্বাস করেন, বলবেন না। আমি ফিরে যাব।”
“আরে না না, অবিশ্বাস করব কেন! আমি কখনো প্রাইভেট ডিটেকটিভ দেখিনি তো, তাই অবাক হচ্ছিলাম। বাবলু আমাদের ছোট ভাইয়ের মতন। আমরা সবাই তাকে ভালবাসি। জানেন, আমরা ঘটনাটা জানার পর থেকে নিজেরাই তার কত খোঁজ করছি। মেসোমশাইয়ের কাছেও গিয়েছিলাম আমরা।…অদ্ভুত ব্যাপার, দাদা। একটা ছেলে বেমালুম উধাও হয়ে গেল! কেন হল? কেন তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।”
“সেটাই তো কথা। আমরা…”
“চা খাবেন?”
“খেতে পারি।”
পবন দোকানের বাইরে এসে গলা চড়িয়ে কাকে যেন হাঁক মারল। চায়ের কথা বলল চেঁচিয়ে। ফিরে এসে আবার দোকানে ঢুকল।
“আমাদের ভয় হয়, বাবলুকে কেউ খুনটুন করল কিনা!”
“খুন? খুন করবে কেন?”
“জানি না। কলকাতায় রোজই দু-চারটে খুনখারাবি, হয়। কাগজে দেখি।”
“মিছেমিছি খুন করবে। কারণ নেই, তবু!”
“কী জানি!”
“যাক গে, সে পরের কথা।…আচ্ছা, আপনি কবে বাবলুকে শেষ দেখেছেন?”
“কেন, আগের দিনই দেখেছি; ও বেপাত্তা হওয়ার আগের দিন। সন্ধের দিকে এই দোকানে এসেছিল। সাতটা নাগাদ ও চলে গেল। বলল, ধীরাজদার সঙ্গে দেখা করে বাড়ি ফিরে যাবে।”
“ধীরাজদা-”
“আমাদের গ্রুপের সেক্রেটারি। কাঁকুলিয়ায় থাকেন।”
তারাপদর কাছে যে চার-পাঁচজনের নামের লিস্ট আছে বাবলুদের গ্রুপের ছেলেছোকরা, বন্ধু বাবলুর–তার মধ্যে ধীরাজের নাম আছে। নামটা তারাপদর মনে পড়ল।
পবন বলল, “দাদা, এই একই কথা আমি মেসোমশাইকে বলেছি। পুলিশের একজন খোঁজে এসেছিলেন–তাঁকেও বলেছি। একই কথা কতবার বলব।”
তারাপদর নিজেরই যেন খারাপ লাগছে বলতে, তবু সে নাচার–এমন গলা করে বলল, “না ভাই, ব্যাপার তা নয়; আমাদের সব জানা নেই তাই জিজ্ঞেস করছি। ডোন্ট মাইন্ড।.তা ইয়ে, বাবলু এখানে অনেকক্ষণ ছিল?”
“ঘণ্টাখানেকের বেশিই হবে। আড্ডা দিল।”
“ও এখানে আড্ডা মারতে আসে? তাই না?”
“আসে। বন্ধুরা অনেকেই আসে।”
“আচ্ছা, সেদিন ওকে কেমন দেখাচ্ছিল? মানে অন্যদিনের তুলনায়।”
“বরাবর যেমন দেখায়।”
“এমন কোনো কথা বলেছিল যাতে মনে হয় ওর…মানে আমি বলতে চাইছি, বাবলুর মুখে আপনি কোনো নতুন কথা শুনেছিলেন?”
“মনে পড়ছে না। নতুন কী বলবে?”
“বাবলু আপনাকে কিছু দেখিয়েছিল? বা বলেছিল?”
“কী দেখাবে?”
“কিছুই দেখায়নি? পুরনো একটা ঘড়ি? পকেট ঘড়ি?”
পবন হঠাৎ মনে করতে পারল। বলল, “না, ঘড়িটড়ি দেখায়নি। তবে আগের দিন কথায়-কথায় বলছিল, ওদের কাছে বাড়িতে একটা সোনার ঘড়ি আছে। দারুণ দেখতে। ঘড়ির ওপর যে ঢাকনাটা আছে, সেটার ওপর কাজ করা। তাতে মুখের ছবি আছে। মুখগুলো তাসের রাজারানীর মুখের মতন দেখতে। চারপাশে গোল করা লতাপাতার নকশা।”
চা এল। ছোট-ছোট কাপ। দুধ কম। গুঁড়ো ভাসছে চায়ের ছেলেটা চা দিয়ে চলে গেল।
তারাপদ যেন সাধারণভাবেই কথা বলছে, বেশি আগ্রহ দেখাল না, চঞ্চলতাও নয়, বলল, “আগের দিন মানে? আপনার সঙ্গে শেষ দেখা হওয়ার আগের দিন?”
পবন মাথা নাড়ল, হ্যাঁ। এমন সময় এক মহিলা এলেন। কী একটা বইয়ের খোঁজ করলেন। পবনের কাছে ছিল না। তিনি চলে গেলেন।
তারাপদ বলল, “তা হঠাৎ সেদিন ঘড়ির কথা উঠল কেন?”
পবন বলল, “সে এক মজা হয়েছিল! সেদিন আমাদের গ্রুপের ক্লাবে সন্ধের সময় আড্ডা হচ্ছিল। আমি গিয়ে হাজির। খবরের কাগজের ওপর মুড়ি বাদাম ছড়িয়ে মুড়ি খাওয়া চলছে। ভাঁড়ের চা। মুড়ি যে শেষ, হঠাৎ কে যে কাগজটার দিকে তাকিয়ে বলল, আরে দ্যাখ, একটা ঘড়ির জন্যে কেমন বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে।”
“বিজ্ঞাপন?”
“হ্যাঁ। ইংরিজি খবরের কাগজ, তাতে একপাশে রুল দিয়ে ঘেরা একটা বড় মতন বিজ্ঞাপন। এক ভদ্রলোক পুরনো এক ঘড়ির খোঁজ করছেন। লিখেছেন, ঘড়িটার জন্যে ভাল দাম দেওয়া হবে।”
“কার বিজ্ঞাপন? ঠিকানা?”
“তা জানি না। আমি বিজ্ঞাপনটা দেখিনি। ওরা কেউ-কেউ দেখল। মজা করল। তখন বাবলু বলল, তাদের বাড়িতে একটা দারুণ পুরনো সোনার ঘড়ি আছে। পকেট ঘড়ি। তার ঠাকুরদার।”
চা খেতে-খেতে তারাপদ বলল, “ঘড়িটা কেমন দেখতে, তাও বলল।”
“হ্যাঁ। নয়ত আমরা জানব কেমন করে?”
“তা তো বটেই!…আচ্ছা ভাই, সেই খবরের কাগজটা কি বাবলু নিয়ে নিল?”
পবন সামান্য ভেবে বলল, “তা বলতে পারব না। আমি বেশিক্ষণ ছিলাম না। ওরা ছিল। ধীরাজদা, সুব্রত, বঙ্কিম…।”
তারাপদ একটু চুপ করে থেকে বলল, “আচ্ছা, বাবলু তো ভাল ছেলে। স্বভাব-টভাব–”।
“কী বলছেন আপনি! বাবলু ভীষণ ভাল ছেলে! ওর স্বভাব দারুণ।”
“আপনার আর কিছু মনে পড়ছে?”
পবন মাথা নাড়তে-নাড়তে হঠাৎ কী মনে পড়ায় বলল, “ও যেদিন আমার দোকানে এল, সেদিন কথায় কথায় একটা জায়গার নাম বলল। জিজ্ঞেস করল, আমি জানি কিনা! আমি না বললাম।”
“কী নাম? কলকাতার মধ্যে?”
“কলকাতা। না, কলকাতার মধ্যে বোধ হয় নয় বাইরে হবে, মফস্বল। তবে কলকাতাতেই কত জায়গা। কে তার খোঁজ রাখে।…কী যেন বলল নামটা? “জ দিয়ে হবে! নাকি, ব’ দিয়ে? উঁহু মনে পড়ছে না।”
