“আমি কোথ থেকে দেখব হে! শ’বছর আগের কথা। তা ছাড়া আমি বাপু বাইরের লোক। আমার বাপ-ঠাকুদাও দেখেননি।“
“গল্প শুনেছেন?”
“তা শুনেছি।…যাক সেকথা। ওই BOXY থেকে একটা ধোঁকা পাগছে।”
“মানে?”
“বাবলুর ফক্স, অক্স, বক্স-এর বক্সের সঙ্গে এই BOXY-র কোনো সম্পর্ক আছে কিনা কে জানে!”
তারাপদ চমকে উঠল। চন্দনও অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল।
কিকিরা চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে বললেন, “ক্যাটালগটা সুরবাবুদের নয়। সুরবাবুদের ব্যবসা পৈতৃক হলেও তাঁরা ওয়াচ ডিলার নন। ক্যাটালগটা বকসি কোম্পানির কাছ থেকে তাঁদের হাতে এসেছিল। বোধ হয় সুরবাবুর বাবার আমলে। দোকানে পড়ে ছিল ধুলোর মধ্যে।”
“বকসি কোম্পানি এখন নেই?”
“না। কোনকালে উঠে গিয়েছে।”
“তা হলে?”
“বকসিদের মেজো ছেলে, এন্টালি বাজারের দিকে থাকেন। সুরবাবুর চেনাজানা। ভদ্রলোকের বয়েস ষাট বাষট্টি। এখন ওঁদের ব্যবসা ইলেকট্রিকাল গুড়-এর।”
“আপনি স্যার সব খবরই নিয়ে ফেলেছেন?”
“সুরবাবুর সঙ্গে গল্প করতে করতে নিয়ে ফেললাম আসলে ওই রাবার স্ট্যাম্পের ছাপে BOXY না দেখলে হয়ত অত খোঁজ নিতাম না। কী জানি, ওটা আমারও চোখে লেগে গেল। খোঁজ নিলাম।”
চন্দন সিগারেট বার করল। মাথা গোলমাল হয়ে যাচ্ছি। দু-চার টান ধোঁয়া দরকার। বলল, “আপনি কীভাবে এগুতে চাইছেন, আমি বুঝতে পারছি না, স্যার। আমাদের কাজ বাবলুর খোঁজ করা, ঘড়ি আর ফক্স, বক্স নিয়ে আমরা কী করব?”
কিকিরা বললেন, “ওই ঘড়ির সঙ্গে বাবলুর নিরুদ্দেশ হওয়ার সম্পর্ক আছে। আমার তাই মনে হয়। “
তারাপদ বলল, “কিন্তু কিকিরা, ঘড়ি নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে গিয়ে সময় নষ্ট করলে যদি বাবলুর কিছু হয়ে যায়। অবশ্য তার যে কিছু হয়নি এতদিনে–তাই বা আমরা জানছি কেমন করে?”
কিকিরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। পরে বললেন, “ভগবান করুন, ছেলেটার কিছু না হয়। তবে তারা, তেমন কিছু খারাপ হলে এতদিনে জানা যেত। “
“স্যার, এটা কলকাতা শহর। এখানে সব কিছু জানার উপায় থাকে না।”
চন্দন বলল, “বাবলুকে খুঁজে বার করাই আমাদের আগে দরকার।”
কিকিরা কোনো জবাব দিলেন না।
খানিকটা সময় চুপচাপ কাটল।
তারাপদর খেয়াল হল হঠাৎ। বলল, “কৃষ্ণকান্তবাবুর সঙ্গে আপনার কথাবার্তা হয়নি আর?”
“হয়েছে। গত পরশু এসেছিলেন। কাল ওঁকে ফোন করেছিলাম বাড়িতে।”
“নতুন কিছু জানতে পারলেন?”
“ওই ভদ্রলোক কুকুর নিয়ে সেদিন সকালে যিনি বেড়াতে বেরিয়েছিলেন, তাঁর কথা শুনলাম।”
“কে তিনি?”
“রাজেন সিনহা। নিউ কামার। সবেই ওই পাড়ায় এসেছেন। কৃষ্ণকান্তবাবুদের বাড়ি থেকে খানিকটা দূরেই নতুন ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছেন ভদ্রলোক। পাড়ার লোকের সঙ্গে আলাপ পরিচয় বিশেষ একটা হয়নি। বাড়িতে একাই থাকেন। কাজের একটা লোক আছে পুরনো। “
“কী করেন?”
“তা কাজকর্ম করেন বইকি! কলকাতার একটা মাঝারি হোটেলের ম্যানেজার। আধা-আধি মালিকও হতে পারেন।”
“এখানকারই লোক?”
“বলতে পারছি না।”
“সিনহার সঙ্গে বাবলুর কেসের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে?”
“এমনিতে তো মনে হয়, না। তবে কৃষ্ণকান্তবাবু বললেন তিনি পাড়ার লোক–যারা সেদিন থেকে লেকে বেড়াতে বেরিয়েছিল ভোরবেলায়–তাদের মধ্যে দুএকজন সিনহার সঙ্গে বাবলুকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখেছে।”
চন্দন বলল, “কোথায় দেখেছে?”
“রোয়িং ক্লাবের দিকে।”
কী ভেবে চন্দন বলল, “সাসপেক্ট করার মতন কারণ নেই, তবু খোঁজ করতে হবে।”
কিকিরা মুচকি হাসলেন।
.
০৪.
বাবলুদের নাটকের দলের দুটি ছেলের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্য নিয়েই বেরিয়েছিল তারাপদ।
প্রথম ছেলেটিকে তার দোকানেই পেয়ে গেল।
গড়িয়াহাটের কাছকাছি ছোট্ট একটা দোকান ছেলেটির। বইপত্র বিক্রি করে। হাত কয়েকের ঘর। বুক স্টলের মতনই দেখতে। মোটামুটি সাজানো। বাংলা বই-ই বেশি, কিছু ম্যাগাজিনও রয়েছে।
দোকানে ভিড় ছিল না। দু-একটা খদ্দের।
তারাপদকে খদ্দের ভেবে কিছু বলতে যাচ্ছিল ছেলেটি, তারাপদ মাথা নাড়ল। বলল, “আপনার সঙ্গে দুটো কথা বলতে এসেছি, ভাই। প্রাইভেট।”
“আমার সঙ্গে প্রাইভেট কথা! কোথ থেকে আসছেন?” ছেলেটি অবাক হয়ে বলল। তারপরই কী ভেবে বলল আবার, “আমাদের গ্রুপের কেউ পাঠিয়েছে? কল্ শো বুকিং?”
“না। আমি কৃষ্ণকান্তবাবুর কাছ থেকে আসছি।”
“মেসোমশাই! বাবলুর বাবা?”
“হ্যাঁ।”
কী যেন ভাবল ছেলেটি। তারাপদকে দেখল খুঁটিয়ে। “একটু ওয়েট করুন।”
খদ্দের দু’জন বিদায় হলে ছেলেটি তারাপদকে বলল, “বসুন। বাইরে টুলে বসবেন? ভেতরেও আসতে পারেন। “
ছোট কাউন্টারের ওপাশে বসার জায়গা নামমাত্র। তারাপদ বাইরে একটা টুলের ওপরই বসল। “বাইরেই বসি। আমার নাম তারাপদ
“আমার নাম পবন। পবন গোস্বামী।”
“জানি। নাম জেনেই তো এসেছি।”
“বলুন, কী বলবেন?”
“আমরা বাবলুর খোঁজখবর করে বেড়াচ্ছি।”
পবন তাকিয়ে থাকল। “পুলিশের লোক! লালবাজার থেকে আসছেন।”
“না,” তারাপদ মাথা নাড়ল। হাসল। “লালবাজার নয়, পুলিশও নয়।”
পবন অবাক হয়ে কয়েক মুহূর্ত দেখল তারাপদকে। “তা হলে?”
“প্রাইভেট ইনভেস্টিগেশান।”
“প্রাইভেট ডিকেটটিভ?”
তারাপদ মজার মুখ করে হাসল। “না, তাও ঠিক নয়। আমাদের একজন মাথাঅলা আছেন। বস্ বলতে পারেন। তিনি প্রাইভেটলি কিছু কাজ করেন। আমরা তাঁর লোক।”
“কী নাম বসের?”
