চন্দন বলল, “স্যার, এই ক্যাটালগ কিসের কাজে লাগে?”
“পুরনো ওয়াচ ডিলার্সদের কাজে লাগত একসময়। এখন লাগে বলে শুনিনি।”
“তা এর জন্য ক্যাটালগ ছাপানো?” চন্দন বলল।
মাথা হেলিয়ে কিকিরা বললেন, “হ্যাঁ। ব্যাপারটা কী জানো? আগেকার দিনে যারা পুরনো শৌখিন জিনিস বিক্রি করত, তাদের একটা সার্কেল ছিল। কার কাছে কী আছে জানাবার জন্যে ক্যাটালগ ছেপে নিজেদের মধ্যে বিলি করত। সারা দেশ জুড়ে এই ব্যবসা চলত। দিল্লির ডিলার জানতে পারত কলকাতায় কার কাছে কোন জিনিসটা পাওয়া যাবে, কলকাতার ডিলার জানতে পারত জয়পুরের ডিলারের কাছে কী পাওয়া যাবে। তারপর কাস্টমার জুটলে লেনদেন হত। এখন আর এ-সব বড় পাবে না। ব্যবসাই উঠে গেল, তা ক্যাটালগ!”
তারাপদ জায়গা ছেড়ে উঠে এসে হাত বাড়াল। “দিন তো একবার, চেহারাটা দেখি।”
কিকিরা ক্যাটালগের চটি বইটা দিলেন।
তারাপদ বইটা নিয়ে নিজের জায়গায় ফিরে গিয়ে পাতা ওলটাতে লাগল।
চন্দন বলল, “নতুন কোনো খবর পেলেন?”
“খবর তো তোমাদের দেওয়ার কথা।”
চন্দন বলল, “আমি একেবারেই সময় পাইনি, স্যার। কটা দিন আমার ঘাড়ে চাপ পড়েছে। আমার এক মামাতো ভাই এসেছিল। তাকে নিয়ে খানিকটা ব্যস্ত ছিলাম। তারপর আমাকে কলকাতার অন্য হাসপাতালে ট্রান্সফার করে দেবে বলছিল। রাইটার্সে ধরনা মারলাম গতকাল।..তবে হ্যাঁ, তারা আমায় বলেছিল –আপনি বলেছেন, লেকের আশেপাশে আমার কোনো বন্ধু আছে কিনা খোঁজ করতে। সেটা করেছি। লেক গার্ডেন্সেই আমার এক পুরনো বন্ধু আছে। সে এখন চোখের ডাক্তারি করছে। আই স্পেশালিস্ট। বিদ্যুৎ নাম। তার ঠিকানা নিয়ে ফোন করেছিলাম।”
“ কিছু বলেছ?”
“না। এমনি একদিন যাব বলেছি।”
“কালই যাও।”
চন্দন বলল, “একলা?”
“হ্যাঁ; একলাই যাবে।”
“গিয়ে কী করব?”
“কৃষ্ণকান্ত দত্তরায় মশাই আর তাঁর ফ্যামিলি সম্পর্কে খোঁজখবর করবে।”
“আপনি কি দত্তরায় সম্পর্কে…?”
“না, তা নয়। তবু অন্যদের কাছ থেকে খোঁজখবর করা ভাল। আমরা যা শুনেছি সবই একতরফা, কৃষ্ণকান্ত যা বলেছেন। তাঁর বলার বাইরেও তো কিছু থাকতে পারে।”
“আর কিছু?”
“হ্যাঁ। বাবলু সম্পর্কেও জানবে, যতটা পারা যায়।” কিকিরা একটু থেমে আবার বললেন, “আরও একটা কাজ তোমার থাকল। বাবলু যেদিন হারিয়ে যায় সেদিন ভোরবেলায় সে যখন দৌড়ে বেড়াচ্ছিল, তখন পাড়াকে-কে তাকে দেখেছে? কোথায় দেখেছে? কী অবস্থায় দেখেছে? মানে, সে একাই ছিল, না, তার সঙ্গেও কেউ দৌড়চ্ছিল? সে দাঁড়িয়ে পড়ে কারও সঙ্গে কথা বলছিল কিনা! আশেপাশে রাস্তায় লোকজন ছিল কিনা! মানে, যা-যা সম্ভব সবই জানার চেষ্টা করবে।”
চন্দন মাথা নাড়ল। বুঝতে পেরেছে। বলল, “আপনি যে রকম ফিরিস্তি দিচ্ছেন–একদিনে কি এত কাজ করা যাবে।”
“একদিনে হবে কেন? দু-তিনদিন যদি লাগে–তোমাকে ঘুরে-ফিরে এই কাজটা করতে হবে। ইট ইজ মোস্ট ইমপর্টেন্ট।”
“এত সময় পাব কেমন করে স্যার?…ভদ্রলোক আপনাকে পাড়ার লোকের কথা বলেননি?”
“বলেছেন দু-চারজনের কথা। আমি ওঁকে বলেছিলাম–আপনি আমাদের নামগুলো দিন,যারা বাবলুকে সেদিন সকালে দেখেছে। তা ছাড়া ওর কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু, ওর থিয়েটারের দলের নাম-ঠিকানা দিন।”
“দিয়েছেন?”
“হ্যাঁ, কাল বাবলুর জেঠতুতো ভাই কাবলু এসেছিল। সে একটা লিস্টি দিয়ে গিয়েছে।” বলতে বলতে কিকিরা তাঁর ছোট টেবিলটা দেখালেন। “ওখানে ড্রয়ারের মধ্যে কাগজটা আছে। নিয়ে যেয়ো।”
বগলা চা নিয়ে এল।
চা এগিয়ে দিয়ে চলে গেল বগলা। জানলা দিয়ে মাঝে-মাঝে দু-এক দমক ভিজে বাতাস আসছিল। পাখা চলছে।
চা খেতে-খেতে তারাপদ হঠাৎ বলল, “কিকিরা স্যার, আপনার এই ক্যাটালগের যা বহর! যেমন ছাপা, তেমনই কাগজ। একেবারে রদ্দি।’
“ওগুলো ওইকমই হয়,” কিকিরা বললেন, “বাজারে বিলি করার জন্যে নয়, নিজেদের জন্যে…”
“প্রাইভেট ইউজ।”
“হ্যাঁ।“
“এই ক্যাটালগের শেষের দিকে একটা রাবার স্ট্যাম্পের ছাপ আছে দেখেছেন? খুব অস্পষ্ট। ভাল করে কালি লাগিয়ে ছাপ মারা হয়নি।”
“দেখেছি।”
“এর মানে কী স্যার? রাবার স্ট্যাম্পের ছাপে ইংরেজিতে লেখা BoxY & Co, বসিটা কী?” তারাপদ বলল, “ধর্মতলা স্ট্রিটের ঠিকানা।”
কিকিরা চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “মানে বকসি কোম্পানি।”
“বকসি কোম্পানি। বাঙালি! তা হলে এরকম অদ্ভুত বানান BOXY কেন?”
কিকিরা মুচকি হাসলেন। “সেকালের সাহেবি কেতা। তখনকার দিনে কেউ-কেউ এরকম করত, সাদামাটা নামধামকে একটু ইংলিশ কায়দায় সাজাত। কেন, তুমি বোনার্জি শোনননি? ব্যানার্জি হত বোনার্জি, প্রাল হত পল্। দাঁ হত ডন, পালিত হত পলিট।”
তারাপদ কপালে হাত দিয়ে বলল, “সাংঘাতিক। বকসি হল BOXY! ভাবা যায় না।’
“তারাবাবু, একে বলে রেওয়াজ। সেকালের কোনো-কোনো ব্যবসাদার এরকম করত, কোম্পানির কদর বাড়াবার জন্যে। বকসি কোম্পানি ছিল পুরনো ওয়াচ ডিলার।”
“তাই নাকি? কে বলল?”
“সুরবাবু। সুরবাবুর বাবার আমলে ধর্মতলা স্ট্রিটে বকসি কোম্পানির দোকান ছিল”
“আচ্ছা।“
“আচ্ছা নয়। ধর্মতলা স্ট্রিট তখন আজকের দিনের ধর্মতলা নয়। তখন ওটা সাহেব-মেমসাহেবদের মার্কেটিং করার জায়গা। বড় বড় নামকরা দোকান ছিল। বুঝলে।”
“বুঝলাম। অবশ্য স্যার, আমার তো মনে হয় না, আপনি সেই ওল্ড ধর্মতলা দেখেছেন?” ঠাট্টা করেই বলল তারাপদ।
