কিকিরা বললেন, “নতুন কাউকে দেখোনি?”
“ন-তু-ন!” সিদ্ধেশ্বর যেন ভাবছিল, চেষ্টা করছিল মনে করার। মাথা নেড়ে না বলতে গিয়েও হঠাৎ তার কিছু মনে পড়ে গেল। বলল, “আমি লোহার ফটক খুলে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দাদা বেরিয়ে গেল। খানিকটা তফাতে এক বাৰু হাঁটছিলেন। তাঁর সঙ্গে একটা কুকুর ছিল। বাঘের মতন কুকুর।”
কৃষ্ণকান্ত বললেন, “রায়মশাই, এই পাড়ার অনেক বাড়িতেই কুকুর আছে। সকালে কুকুর নিয়ে বেড়াতে বেরুনোর লোকও আছে।”
সিদ্ধেশ্বর মাথা নাড়ল। “না বাবু, এই কুকুরটা যেন বাঘ। আগে আমার চোখে পড়েনি।”
“কুকুরের মালিক ভদ্রলোককে তুমি দেখেছ? চিনতে পারলে?”
“তফাত থেকে দেখেছি। চিনতে পারিনি।”
“আন্দাজ বয়েস?”
“ছোকরা নয়। খাটো প্যান্ট আর মোটা গেঞ্জি পরা। এক হাতে লাঠি। অন্য হাতে কুকুরটার শিকলি।”
“ভদ্রলোককে তুমি চিনতে পারোনি বলছ। কুকুরটাও তুমি আগে কোনোদিন দেখোনি?”
“আজ্ঞে।”
কিকিরা কৃষ্ণকান্তের দিকে তাকলেন। “আপনাদের পাড়ায় নতুন কেউ এসেছে?”
“আসতে পারে। আসে মাঝে-মাঝে। তা ছাড়া নতুন ফ্ল্যাট হচ্ছে, বাড়িও দু-একটা হচ্ছে ওপাশে..”
তারাপদ কিকিরাকে বলল, “এ আর কঠিন কী! খোঁজ নিলেই কুকুর আর ভদ্রলোকের খবর বেরিয়ে পড়বে। কিন্তু…”
কিকিরা তারাপদকে কথা শেষ করতে দিলেন না। “চলল, যাওয়া যাক।”
কৃষ্ণকান্ত বললেন, “আমার গাড়ি আপনাদের পৌঁছে দিয়ে আসুক।”
কিকিরা আপত্তি করলেন না।
.
০৩.
দু-তিনটে দিন কেটে গেল।
সেদিন সকাল থেকেই আকাশ খানিকটা ঘোলাটে দেখাচ্ছিল। গুমোট দিন। বিকেলে মেঘলা হল। তারপর দমকা ঝড় উঠল। বৃষ্টিও হল একপশলা। আধ ঘন্টার মতন বৃষ্টি, তবে জোরেই নেমেছিল। সারাদিন গুমোটের পর এই বৃষ্টি যেন অনেক আরাম এনে দিল শহুরে মানুষজনকে।
তারাপদ আর চন্দন বৃষ্টি থামার পরই কিকিরার কাছে হাজির।
কিকিরা তাঁর বসার ঘরে–যেটা জাদুঘরের চেয়ে রহস্যময়বাতি জ্বালিয়ে বসে-বসে একটা চটি মতন বই বা ওই ধরনের কিছু দেখছিলেন।
চন্দনই কথা বলল প্রথমে, “আর খানিকক্ষণ হলে পারত; কী বলুন, স্যার! যা অবস্থা যাচ্ছিল। মরে যাচ্ছিলাম।..কলকাতার ক্লাইমেট নাকি পালটে যাচ্ছে, বুঝলেন। সেদিন কাগজে একটা লেখা দেখছিলাম, তাতে লিখেছে–এই শহরে শীত কমছে, গরম বাড়ছে। প্রতি দশ বছরের হিসেবে কমপক্ষে দেড় থেকে দু ডিগ্রি।”
তারাপদ মজা করে বলল, “লোক বাড়ছে, ঘরবাড়ি বাড়ছে, ট্রামবাস গাড়ি বাড়ছে–গরম তত বাড়বেই।”
চন্দন বসতে বসতে কিকিরাকে বলল, “কী পড়ছেন?”
কিকিরা বললেন, “ক্যাটালগ।”
“ক্যাটালগ? কিসের ক্যাটালগ?”
“ঘড়ির।”
চন্দনের বিশ্বাস হল না। কিকিরা নিশ্চয় ঠাট্টা করছেন। বলল, “হঠাৎ ঘড়ির ক্যাটালগ কেন?”
কিকিরা হাতের বইটা কোলের ওপর রাখলেন। বললেন, “চোরবাজারের সুরবাবুর কাছে পাওয়া গেল। ইউ নো সুরবাবু?”
“না স্যার, চোরবাজারই চিনি না তত সুরবাবু! চোরবাজারে আপনার কত যে বন্ধু?”
“চোরে-চোরে হাফ-ব্রাদার। আমি কখনো কখনো চোরবাজারে মার্কেটিং করতে গেলে দুই ভাইয়ে মিলে চা-টা খাই, গল্পগুজব হয়। সুররা ভেরি ওল্ড কনসার্ন। ওরা পুরনো শখের জিনিস বিক্রি করে। বনেদি বড়লোক–ওয়ান্স আ আপঅন এ টাইমে রাজাগজা ছিল–এখন শরিকি-ভাঙাবাড়ির বংশধর, টানাটানির মধ্যে থাকে–দু-চারশো টাকায় ভাল-ভাল জিনিস বেচে দেয়। কোনো-কোনোটা আবার হাতফেরতা হয়ে আসে। সেকালের কাচের জিনিস, ঝাড় থেকে সেজবাতি, আসলি বেলজিয়াম মিরার, বিউটিফুল ফুলদানি, ছোট-ছোট কার্পেট, রুপোর গড়গড়া, ছবির ইংলিশ ফ্রেম- কতরকম জিনিস। চলো একদিন, দেখাব।”
তারাপদ অবাক হয়ে বলল, “সে-না হয় বুঝলাম। কিন্তু ঘড়ির ক্যাটালগ?”
“ওই তো! ওটা তো তোমরা বুঝবে না।” কিকিরা পকেট হাতড়ে চুরুট বার করতে করতে বললেন, “সুরদের কাছে দু-চারটে পুরনো মডেলের ঘড়িও আছে। আগে আরও ছিল, এখন নেই। দু-একটা মাত্র। পুরনো শৌখিন জিনিস কেনার লোক এখন কমে গিয়েছে তারাবাবু। লোকে আর পয়সা খরচ করে ওসব কিনতে চায় না।”
“ভালই করে। …তা আপনি”
“আমি সুরকে বললাম, একটা সোনার পকেট ঘড়ির কথা শুনেছি। তার মধ্যে কম্পাস আছে। সে এই ধরনের ঘড়ির কথা আগে শুনেছে কিনা? বা, কোথাও যদি দেখে থাকে?”
তারাপদ এতক্ষণে ব্যাপারটা বুঝতে পারল। চন্দনের দিকে তাকাল। চন্দনও এবার আন্দাজ করতে পেরেছে।
চন্দন হঠাৎ বলল, “কিকিরা, কাগজে মাঝে-মাঝে বিজ্ঞাপন দেখি–অমুক ঘড়ি তমুক ঘড়ির অত নম্বর মডেল যদি কারুর কাছে থাকে তবে যেন..”
“হ্যাঁ, কাগজে বিজ্ঞাপন থাকে। এখনো থাকে।…সেটা আলাদা। তা সূর্ণ। বলল, ওরা বেশিরভাগই আগে যা বিক্রি করেছে সেগুলো বড় ঘড়ি। হয় ওয়াল ক্লক, না হয় টেবল ক্লক–মানে ছোট দেরাজ, কিংবা ভারি টেবিলের ওপর রাখার মতন ঘড়ি। রিস্ট ওয়াজও এক-আধটা বিক্রি করেছে অবশ্য, তবে সেগুলো সোনাটোনার নয়।”
তারাপদ বলল, “বুঝেছি। আপনি বাবলুর ঘড়িটার ব্যাপারে জানতে গিয়েছিলেন।”
মাথা নাড়লেন কিকিরা। চুরুট ধরালেন। “তোমার মাথা এতক্ষণে প্লে করেছে।”
চন্দন হেসে ফেলল। “তারার মাথা লেটে প্লে করে।
তারা গায়ে মাখল না কথা। বলল, “আপনার ক্যাটালগ প্লে করল?”
“না। এটা পুরনো ঠিকই। অনেক খুঁজেপেতে হাতড়ে বার করল সুর। কাগজগুলো একেবারে লাল হয়ে গিয়েছে। অনেক পুরনো ঘড়ির নাম দেখলাম। ডেসক্রিপশানও রয়েছে। কিন্তু সোনার ঘড়ি যা রয়েছে সবই ফোরটিন ক্যারেট। কোথাও দেখলাম না, সোনার কাঁটা আর কম্পাসের কথা আছে।”
