কিকিরা ব্যালকনির দিকে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন। ফিরেও এলেন সামান্য পরে।
“পেছনে এখনো ভারা বাঁধা আছে দেখছি।”
“হ্যাঁ, দু-চারটে বাঁশ বাঁধা হয়েছিল আবার। রং কমবেশি করে ফেলেছিল জায়গাটায়। ড্যাম্পের ছাপের মতন দাগ দেখাচ্ছিল। রং মিস্ত্রিদের কাণ্ড। নতুন করে মিলিয়ে দিতে হয়েছে।”
“ও! আপনার মেয়েকে একবার ডাকবেন?”
“ডাকছি। কাছেই আছে।” কৃষ্ণকান্ত বাইরে গেলেন মেয়েকে ডেকে আনতে।
তারাপদ বলল, “বাড়ির পেছনে কী দেখলেন, কিকিরা?”
“পেছনেও বাড়ি। তবে এবাড়ির কম্পাউন্ড ওয়ালের গায়ে ওবাডির ড্রাইভওয়ে আর গ্যারাজ। রং মিস্ত্রিদের ভারার বাঁশ আর পাশের বাড়ির গ্যারাজের ছাদের মধ্যে তফাতটা বেশি নয়।”
তারাপদ অবাক হয়ে বলল, “আপনি কি বলতে চাইছেন আমি বুঝতে পারছি না। পাশের বাড়ির গ্যারাজের মাথায় চড়ে এ বাড়ির ছারার বাঁশ বেয়ে না হয়। চোর আসতে পারে। কিন্তু এটা তো চুরির কেস নয় স্যার।”
“তাই ভাবছি।…দাও তো একটা সিগারেট দাও।”
সিগারেট ধরানো শেষ হয়নি কিকিরার, কৃষ্ণকান্ত একটি মেয়েকে সঙ্গে করে ঘরে এলেন। “আমার মেয়ে খুকু।”
কিকিরা দেখলেন মেয়েটিকে। গোলগাল গড়ন, ফরসা রং গায়ের, বছর যোলা-সতেরো বয়েস। পরনে সালোয়ার কামিজ। মোটা বিনুনি ঝুলছে পিঠে। মেয়েটিকে দেখেই বোঝা গেল, খানিকটা আগেও সে কাঁদছিল। হয়ত দাদার কথা মনে হচ্ছিল বলেই।
কিকিরা সহজভাবে বললেন, “তোমার নাম খুকু! বাঃ। ভাল নাম কী তোমার?”
ক’ মুহূর্ত চুপ করে খুকু বলল, “রমলা।”
“তুমি এখন কী পড়ছ?”
“হায়ার সেকেন্ডারি দেব।”
“ভেরি গুড। …আচ্ছা, আমি তোমায় ক’টা কথা জিজ্ঞেস করব। একটু ভেবেচিন্তে জবাব দেবে। কেমন?”
খুকু মাথা নাড়ল।
“তোমার দাদার কাছে তুমি ঘড়িটা কবে দেখেছিলে?”
“আগের দিন। দাদাকে যেদিন থেকে পাওয়া যাচ্ছে না তার আগের দিন।”
“কোথায় দেখেছিলে? ড্রয়ারে?”
“না, দাদার হাতে। দাদা ওটা দেখছিল।”
“সেটা কখন? সকালে, না বিকেলে? সন্ধেবেলায়?”
“বিকেলে।”
“ও! তোমার দাদা তখন বাড়িতেই ছিল?”
“বেরিয়ে যাওয়ার আগে। বিকেলে দাদা বেরিয়ে যায়। খেলাধুলো করে, আড্ডা মারে।”
“দাদার সঙ্গে তোমার ঝগড়া হয়েছিল ঘড়ি নিয়ে?”
“হ্যাঁ। এমনি ঝগড়া।”
“কেন?”
“সোনার ঘড়িটা বার করে খেলা করছিল বলে। বারণ করেছিলাম।”
“ঠিকই তো করেছিলে! দাদা তোমার কথা শোনেনি?”
“না। উলটে আমার মাথায় চাঁটি মেরে বলল, চুপ কর, নিজের চরকায় তেল দে। যা, তোর গানের ক্লাসে যা, পাকামি করতে হবে না।”
কিকিরা মুচকি হাসলেন, “দাদারা ওইরকমই হয়।…তা সেদিনের পরে আর তুমি দাদার কাছে ঘড়ি দেখোনি?”
“দাদার সঙ্গে আর আমার কথাই হয়নি। আমার খুব রাগ হয়েছিল।”
“তা তো হবেই।…আচ্ছা, একটা কথা মনে করে বলো তো! ঘড়িটা তুমি দেখেছ বাবলু নিখোঁজ হওয়ার আগের দিন।…তার আগে আর তার কাছে দেখোনি?”
“কই! না!”
“তোমার দাদা ঘড়ি নিয়ে আর কিছু বলেনি তোমায়?”
“না।” বলেই মাথা নাড়ল খুকু। “একবার শুধু বলেছিল, মা বাবাকে লাগাবি না। লাগালে তোর ঠ্যাং ভেঙে দেব।”
কিকিরা হাসলেন। তারাপদও মুচকি হাসল।
সামান্য পরে কিকিরা বললেন, “আচ্ছা খুকু, তুমি কি বলতে পারো বাবলু একটা কাগজে কেন অক্স, ফক্স আর বক্স লিখে টেবিলের ওপর রেখেছিল?”
খুকু মাথা নাড়ল। সে জানে না।
ও কিকিরা আর দাঁড় করিয়ে রাখলেন না খুকুকে। যেতে বললেন।
কৃষ্ণকান্ত নিজেই বললেন, “আপনি কি খুকুর মায়ের সঙ্গে কথা বলবেন? আজ তাঁর শরীর একেবারেই ভাল নেই। প্রেশার খুব বেড়ে গিয়েছে। শুয়ে আছেন।”
“থাক, তাঁকে আর কষ্ট দেব না। চলুন, আমরা নিচে যাই। আমি ওর সঙ্গে দুটো কথা বলব। কী নাম যেন ওর, যে সকালে সদর খুলে দিয়েছিল বাবলুকে?”
“সিধু। সিদ্ধেশ্বর। আমাদের বাড়িতেই থাকে। সাত-আট বছর হয়ে গেল।”
“চলুন, নিচেই যাই।”
নিচে নেমে এসে আর বসার ঘরে ঢুকলেন না কিকিরা। বাড়ির সদরে গিয়ে দাঁড়ালেন।
তারাপদ সদর দেখছিল। আলাদা কোনো ব্যবস্থা নয়, প্রায় সব বাড়িতেই যেমন দেখা যায়, কোলাপসিবল গেট, ভারি দরজা। দরজার ভেতর দিকে ওপরে-নিচে ছিটকিনি, মাঝ-মধ্যিখানে লক। আগে সদর খুলতে হয়, তারপর কোলাপসিবল গেট। গেটের পর কয়েক ফুট প্যাসেজ, তারপর রাস্তা। গাড়ি রাখার গ্যারাজ একপাশে। রাস্তা ঘেঁষেই।
সিদ্ধেশ্বরকে ডাকা হল।
লোকটি সামনে আসতেই কিকিরা বুঝতে পারলেন, নিরীহ ধরনের মানুষ সিদ্ধেশ্বর। বছর পঁয়তাল্লিশ বয়েস হয়ত। রোগাটে গড়ন। মুখে কালচে দাগ। দাড়ি প্রায় নেই, সামান্য গোঁফ চোখে পড়ে। চোখ দুটি বড়-বড়।
“তোমার নাম সিদ্ধেশ্বর?” কিকিরা বললেন।
“হ্যাঁ বাবু। সিদ্ধেশ্বর দাস।”
“তুমি সেদিন দাদাবাবুকে দরজা খুলে দিয়েছিলে?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ। রোজই আমি সদর খুলি। বন্ধও করি রাতের বেলায়। আমার কাছেই চাবি থাকে।
“সকালে ক’টা নাগদ দরজা খুলে দিলে?”
“সময় বলতে পারব না। রোজ যেমন খুলি। ভোরবেলায়।”
“দাদাবাবু কী পরে বেরিয়ে গেলেন?”
“রোজই যা পরে যায়, সেই জামা।”
“হাতে কিছু ছিল?”
“না। দেখিনি।”
তারাপদ হঠাৎ বলল, “রাস্তায় তখন লোক ছিল?”
“আজ্ঞে দু-একজন ছিল বইকি! এই পাড়ার অনেকেই ভোরে বেড়াতে যান।”
“যারা ছিল–দু-একজন–তাদের তুমি চেনো?”
“চিনি। এগারো নম্বর বাড়ির বাবু ছিলেন। পালবাবু ছিলেন?”
