কিকিরা বললেন, “কলেজের বন্ধু! বাবলুর মতন দেখতে! তাকে ধরতে পারল না?”
“না। শুনলাম, বাবলুর ও ক্লোজ ফ্রেন্ড নয়। চেনে। তবে বাবলুর কথাটা সে শুনেছে কমন ফ্রেন্ডদের কাছে। কাগজেও দেখেছে। আমরা বাবলুর ছবি দিয়ে কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম।…তাও ছেলেটি ডাকার চেষ্টা করেছিল। যাকে ডেকেছিল সে শুনতে পায়নি হয়ত। চলন্ত মিনিবাসে লাফিয়ে উঠে চলে গেল।”
তারাপদ কী ভেবে বলল, “যাক, একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। বাবলুর কথা অনেকেই জেনে গিয়েছে। হয়ত ওর কোনো ক্ষতি হয়নি।”
“দেখুন ভাই, আজকাল যা অবস্থা তাতে করে কার কখন কী ঘটে, এখানে বসে বোঝা মুশকিল। বাবলুর কোনো ক্ষতি হবে–আমিও ভাবতে পারি না। তার স্বভাব এত ভাল, সকলের সঙ্গেই ভাল সম্পর্ক ছেলেটার। পরোপকারী, ভদ্র ছেলে! কোনো সাতে পাঁচে থাকে না। কে তার ক্ষতি করবে, কেনই বা করবে! না, সেদিক থেকে আমি তার ক্ষতি হওয়ার কথা এখনো ভাবিনি। তবে হ্যাঁ, কোনো অ্যাকসিডেন্ট যদি হয়–সেটা তো আমাদের হাতের মুঠোয় নয়। তা আজ পর্যন্ত থানা পুলিশ, হাসপাতাল–কেউ আমাদের জানায়নি যে বাবলুর মতন কোনো ছেলেকেইয়ে–মানে খারাপ অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে।”
কিকিরা নিজের মাথার চুলে হাত বোলাতে-বোলাতে কিছু ভাবছিলেন। শান্তভাবে বললেন, “যে-ছেলেটি বাবলুর মতন একজনকে দেখেছে বলছে, সে ভুল দেখেনি তত?”
কৃষ্ণকান্ত যেন দ্বিধায় পড়লেন। “তা আমি কেমন করে বলব।”
“না, আমি বলছিলাম–অনেক সময় আমাদের চোখের ভুল হয়।”
“তা হয়।”
“যাক, এ নিয়ে পরে ভাবা যাবে,” কিকিরা বললেন তার পরই কথা পালটালেন, “কৃষ্ণকান্তবাবু, আমি একবার বাবলুর ঘরটা দেখব। তার বোন আর মায়ের সঙ্গে কথা বলব। বাড়ির কাজের লোকজনের সঙ্গেও। তার আগে একটা কথা বলি, কিছু মনে করবেন না।”
“বলুন?”
“আপনাদের পুরনো পৈতৃক বাড়ি চারু অ্যাভিনিউতে বলেছিলেন। সেখানে আপনার দাদা থাকেন সপরিবারে। দাদার সঙ্গে আপনাদের
“মাপ করবেন। এ ব্যাপারে দাদাকে না টানাই ভাল। আমার দাদা সরল মানুষ। ধর্মকর্ম নিয়ে থাকেন। চাকরিবাকরি ভালই করতেন। রিটায়ার করছেন বছর দুই হল। দাদার একবার হার্ট অ্যাটাক হয়। সিরিয়াসই হয়েছিল। ওই অ্যাটাকের পর দাদা খানিকটা আগে-আগেই চাকরি থেকে রিটায়ার করলেন।”
“আপনাদের সম্পর্ক তা হলে ভাল।”
“খুবই ভাল। চারু অ্যাভিনিউ এখান থেকে আর কতটা! ভেতর দিয়ে রাস্তা আছে। রিকশা করেই যাওয়া-আসা যায়। এবাড়ি ওবাড়িতে সবসময়েই খোঁজখবর চলে।”
“বাবলুর কথা দাদা নিশ্চয় শুনেছেন?”
“শুনবেন না, কী বলছেন! ভীষণ ভেঙে পড়েছেন। বাবলুকে দাদা একসময় কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন। তখন আমাদের জয়েন্ট ফ্যামিলি।”
“এ তো সুখের কথা। ওঁর ছেলেমেয়ে?”
“বাবলুর বড় একজন, বাবলুর সমবয়েসী একজন। বাবলুর ভাই আর বন্ধু। সে তো আজ কদিন বাইরে বাইরে টো-টো করে বেড়াচ্ছে বাবলুর খোঁজখবর করতে।”
“কী নাম?”
“আমরা কাবলু বলে ডাকি। ভাল নাম শরৎ। বাবলুর ভাল নাম রজত। ওই দুই ভাইয়ের নাম মিলিয়ে রাখা।”
বাড়ির ভেতর থেকে চা এল। চা আর মিষ্টি।
“নিন, একটু চা খান, কৃষ্ণকান্ত সৌজন্যবশে নিজেই চা এগিয়ে দিলেন কিকিরাকে।
চা খেতে-খেতে কিকিরা বললেন, “আপনার কাছ থেকে আমি কিছু কিছু ঠিকানা নেব। বাবলুর ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের। সে যাদের সঙ্গে নাটক করত সেই দলের। আপনার দাদার সঙ্গেও একবার দেখা করতে চাই। আর আপনার ভাইপো শরৎকে আমার দরকার। কথা বলব।”
“কাবলু–মানে শরৎকে আপনার বাড়িতেই পাঠিয়ে দিতে পারি।”
“ভালই তো। দেবেন।”
চা-খাওয়া শেষ হলে কিকিরা উঠে দাঁড়ালেন। “চলুন, বাবলুর ঘরটা একবার দেখি।”
“চলুন।”
দোতলায় বাবলুর ঘর। একেবারে একপাশে।
তারাপদ লক্ষ করলে কৃষ্ণকান্তের বাড়ির সবই তকতকে। প্রয়োজন বুঝে এবং রুচিমতন ঘরদোর করা হয়েছে। টাকা আছে বলে, লোক-দেখানো চটক বা বাহুল্য নেই। ভালই লাগে। নতুন করে রং হয়েছে বলে আরও ঝকঝকে দেখাচ্ছিল।
বাবলুর শোওয়ার ঘরেই তার পড়াশোনার ব্যবস্থা। খাট, আলমারি, টেবিল, বুকর্যাক ছাড়াও এক্সারসাইজের কয়েকটা খুচরো জিনিস রাখা আছে একপাশে। গোটা দুয়েক স্টিকার দেওয়ালে লটকানো। দুজনেই খেলোয়াড়। সুনীল গাওস্কর আর মারাদোনা। বাবলু ক্রিকেট, ফুটবল দুইয়েরই অনুরাগী বোধ হয়। আলনার তলায় জুতোর বাক্স, গামবুট।
কিকিরা ঘরের চারপাশ দেখতে-দেখতে বললেন, “এই টেবিলের ওপর আপনি ওই কাগজের টুকরোটা পেয়েছেন? ওই যাতে ফক্স, অক্স আর বক্স লেখা ছিল?”
“হ্যাঁ। টেবিলের ওপর একটা কাগজে ওগুলো লেখা ছিল। রঙিন লেখা। ফেল্ট পেনে বোধ হয়।”
“কীভাবে ছিল?”
“টেবিলের মাঝখানে। ওর পকেট ক্যালকুলেটার চাপা দেওয়া।”
“ও যেন কী পড়ে?”
“কমার্স। অ্যাকাউটেন্সি…”
“আপনি কি বলতে পারেন, কাগজে ফক্স, অক্স, বক্স লেখার কী মানে?”
“না,” মাথা নাড়লেন কৃষ্ণকান্ত।“
“এরকম অদ্ভুত নামে কাউকে কি আপনারা ডাকতেন ঠাট্টা করে?”
“মানে?”
“মা-নে! মানে যেমন ধরুন, আমরা ঠাট্টা করে খুব মোটাসোটা কাউকে “পিপে বলি, খায় দায় চরে বেড়ায় কাউকে বলি ষাঁড়’..এইরকম আর কী!”
“না, আমি জানি না। আমার তো মনে পড়ছে না।”
কিকিরা কথা বলতে বলতে ঘরের এপাশে-ওপাশে সরে গিয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন। জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাচ্ছিলেন। ডানপাশে এক দরজা, খানিকটা সরুমতন। খোলাই ছিল। দরজা দিয়ে বাইরের ছোট ব্যালকনি চোখে পড়ছিল। বাড়ির পিছন দিক ওপাশটা।
