“বন্ধুবান্ধবদের ঘড়িটা দেখাতে যাবে কেন?”
“খেয়াল! শখ! বাড়িতে একটা পুরনো দেখার মতন জিনিস রয়েছে, বন্ধুদের দেখাতে হবে! এই আর কী! ছেলেমানুষি বলতে পারো, বলতে পারো সাধ। এমন তো আমাদের হয় সকলেরই। আমিই তো কোনো পুরনো জিনিসপত্র কিনে আনলে তোমাদের দেখাই।”
তারাপদ কথাটা অস্বীকার করতে পারল না। বলল, “ঘড়িটা বরাবর তাদের বাড়িতে আছে। হঠাৎ সেদিন বাবলুর বন্ধুদের ঘড়ি দেখাবার শখ চাগাল কেন?”
কিকিরা চুপ করে থাকলেন প্রথমটায়। তারপর বললেন, “একথার জবাব এখন আমি তোমাকে দিতে পারছি না, তারা। সবই অনুমান। হয়ত বাবলু সত্যি-সত্যিই ঘড়িটা নিয়ে তার বন্ধুদের দেখাতে যায়নি। হারিয়েও ফেলেনি।”
“তবে?”
“জানি না। আমার ধারণা, ওই ঘড়ির কোনো রহস্য আছে। থাকতে পারে। আর ওই লেখাটাও আমি বাতিল করতে পারছি না। অক্স, ফক্স আর বক্স। বাবলুর টেবিলের ওপর যেটা পাওয়া গিয়েছে।”
তারাপদ কোনো জবাব দিল না।
আলো এবার আরও ময়লা হয়ে আসতে লাগল। আবছা অন্ধকার নেমে আসছে। আলো জ্বলে উঠেছিল রাস্তায়। আগেই। গাড়ির ভিড়, মানুষের ভিড়। হরেক রকম শব্দ, হল্লা, গাড়ির হর্ন, বাস, মিনিবাসের গর্জন, ধোঁয়া। কিকিরাদের ট্যাক্সিটা রাস্তা সে রাস্তা দিয়ে ল্যান্সডাউন রোড ধরে নিয়ে এগুতে লাগল।
দু’জনে খানিকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর কিকিরা বললেন, “কৃষ্ণকান্তবাবুকে দেখে তোমার কেমন লাগল কাল?”
তারাপদ অন্যমনস্ক ছিল। খেয়াল হল কিকিরার কথায়।
“কিছু বললেন?”
“কেমন লাগল কৃষ্ণকান্তবাবুকে?”
“ভালই। ভদ্রলোক খুবই আপসেট। ভয় পেয়ে গিয়েছেন। স্বাভাবিক। অত বড় ছেলে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেলে কে না ভয় পাবে! কার না মাথা খারাপ হবে!”
“মানুষটি কিছু লুকোচ্ছেন বলে মনে হল?”
তারাপদ কিকিরার দিকে তাকাল। “ও কথা কেন বলছেন?”
“মনে এল, বলছি।”
“আমি ওভাবে ভেবে দেখিনি। একজন বাবা তাঁর ছেলেকে পাচ্ছেন না–মানে ছেলে হঠাৎ নিখোঁজ হয়েছে–এই কথাটা আমাদের জানাতে এসেছেন। এর মধ্যে লুকোবার কী আছে?”
“তা ঠিক। …যাক যে, আগে তো ভদ্রলোকের বাড়ি চলো, তারপর দেখা যাবে।”
“আপনি স্যার দিন-দিন গোয়েন্দাই হয়ে যাচ্ছেন, তারাপদ একটু হেসে বলল, “সব ব্যাপারেই সন্দেহ!”
“না স্যার, আমি গোয়েন্দা নই। গোয়েন্দাদের তিনটে চোখ সামনে, একটা মাথার পেছনে। আমার মাত্র দুটো। ওনলি টু।”
“বাঃ! আর আমাদের চোখ–আমার আর চাঁদুর। এই চারটে আপনার সঙ্গে অ্যাড করুন।” তারাপদ মজার গলা করে বলল।
কিকিরা হেসে উঠলেন। হাসতে হাসতে বললেন, “তা বটে; আমার তবে ছ’টা চোখ। সিক্স আইজ!…কিন্তু কথাটা কী জানো তারাবাবু, আমাদের হল আনাড়ি-চোখ, ওদের হল নাড়ি-চোখ। “
“মানে, নাড়ি থেকে উঠে এসেছে বলছেন?” ঠাট্টার গলাতেই বলল তারাপদ।
“না-ড়ি! হ্যাঁ, তা বলতে পারো। ওদের পেশাদারি ব্যাপার ছাড়াও একটা বড় জিনিস আছে, তারাপদ। ইনটুইশান। ওটা ভেতরের ব্যাপার। কারও কারও থাকে। সকলের থাকে না।”
“আপনার আছে স্যার। আপনি কিকিরা দ্য গ্রেট।” তারাপদ হাসতে লাগল।
কিকিরা মাথা নাড়লেন। “না, কোথায় আর!”
.
কৃষ্ণকান্তর বাড়ি এসে পৌঁছতে আরও খানিকটা সময় লাগল। গাড়িঘোড়ার ভিড়, তার ওপর কিসের এক ব্যান্ড পার্টি চলেছে বাজনা বাজাতে বাজাতে, সামনে-পেছনে মাথায় আলো নিয়ে একদল লোক। কিসের বাদ্য কে জানে।
সন্ধের মুখে কিকিরারা লেক গার্ডেন্সে পৌঁছে গেলেন।
জায়গাটা কিকিরার তেমন চেনা নয়, তারাপদরও নয়। কিকিরা আগে দু-চারবার এদিকে এলেও তখন যা দেখেছিলেন এখন একেবারে আলাদা। বাড়িতে বাড়িতে ঠাসা। গিজগিজ করছে লোক। কত দোকান।
কৃষ্ণকান্ত আগেভাগে বুঝিয়ে না দিলে বাড়ি খুঁজে পেতে দেরি হত, অসুবিধেও হত। খুব একটা অসুবিধে কিকিরাদের হল না।
কৃষ্ণকান্ত অপেক্ষাই করছিলেন। বললেন, “আসুন।”
বাড়ি দোতলা। বাইরের দিকে গ্যারাজ। গেটের সামনে কৃষ্ণকান্ত। গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
নিচের তলায় বাঁ পাশে বোধ হয় কৃষ্ণকান্তের নিজস্ব দফতর। ডানদিকে বসার ঘর। বাইরের লোকজন এলে বসে। ঘরটি মোটামুটি বড়। সাজানো-গোছানো। সোফাসেটি, বইয়ের আলমারি, বাহারি আলো, সুন্দর পরদা, দেওয়াল র্যাকে শৌখিন জিনিসপত্র সাজানো মস্ত এক ফুলদানি। খুবই চমৎকার দেখতে। কয়েকটা ছবি দেওয়ালে।
কিকিরা আর তারাপদ ঘরটা দেখছিলেন।
“বসুন!”
“হ্যাঁ, বসছি। বেশ বাড়ি করেছেন, মশাই!” কিকিরা বললেন।
“নিজে বিল্ডিং কনট্রাকটার। একটু দেখেশুনে করেছি” কৃষ্ণকান্ত বললেন বিনয় করে।
“কত দিন হল বাড়ির?”
“বছর দশেক।”
“নতুনই। হালে রং করিয়েছেন নাকি?”
“এই তো করলাম। মাসখানেক হল। ভেতরের খুচরো কাজ কিছু বাকি আছে। তবে ইচ্ছে করে আটকে রেখেছি। আর এখন তো বাড়ি নিয়ে ভাবতেই পারি না। কাজকর্মও নিজে দেখতে পারছি না ব্যবসার।”
কিকিরা বসে পড়েছিলেন। তারাপদও।
“নতুন কোনো খবর পেলেন ছেলের?” কিকিরা বললেন।
“না,” মাথা নাড়লেন কৃষ্ণকান্ত। “নতুন খবর কিছুই পাইনি। কাল রাত ন’টা নাগাদ একটা ফোন এসেছিল। বাবলুর এক বন্ধু করেছিল। আমার স্ত্রী প্রথমে ধরেছিলেন। পরে আমি কথা বললাম। বাবলুর বন্ধু বলল, ওদের এক কলেজের বন্ধু বাবলুর মতন একজনকে দুপুরবেলায় জিপিও-র সামনে দেখেছে।”
কিকিরা তাকিয়ে থাকলেন। তারাপদও কৃষ্ণকান্তকে দেখছিল।
