তারাপদ চুপ করে থাকল। ভুজঙ্গভূষণের কাছে যেতে তার ইচ্ছে করছিল না, আবার যখনই দেড় দু’লাখ টাকার সম্পত্তির মনে আসছিল–তখন সেটা হারাবার কথাও ভাবতে পারছিল না।
মৃণাল দত্ত যেন তারাপদর মনের কথা বুঝতে পেরে বললেন, “ভুজঙ্গবাবুর সঙ্গে যদি তোমার দেখা না হয় তা হলে দ্বিতীয় শর্ত মতন তুমি তাঁর সম্পত্তির কানাকড়িও পাবে না।”
তারাপদর মনে হল, সে যেন মনে মনে কিসের স্বপ্ন দেখছিল, হঠাৎ তা ভেঙে গেল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মৃণালবাবু আবার বললেন, “তোমায় আমার আপাতত আর কিছু বলার নেই। যদি ভুজঙ্গবাবুর কাছে যেতে চাও, আমি তোমায় দু-একটা জিনিস দেব। সেটা তাঁর হাতে পৌঁছে দিতে হবে। তিনি জিনিসগুলো পেয়ে আমায় জানাবেন–তোমার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছে।”
“কিন্তু আমি গিয়ে যদি দেখি তিনি মারা গেছেন?”
“মারা যাবেন বলে মনে হয় না। দু-চার দিনের মধ্যে বোধ হয় নয়। নিজের মৃত্যুর দিন নাকি তাঁর জানা। সামনের অমাবস্যা পর্যন্ত তিনি বেঁচে থাকবেন লিখেছেন। মানে আরও দিন আষ্টেক । আজ সপ্তমী-টপ্তমী হবে।”
তারাপদ বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থাকল।
“যদি যেতে চাও কাল সকালে একবার তোমায় এখানে আসতে হবে। আমি সব তৈরি করে রাখব।”
তারাপদর মুখে কথা ফুটল না।
ঘর ছেড়ে চলে আসার মুখে চন্দন আবার কালো বেড়ালটার দিকে তাকাল। তাকিয়ে তার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল। বেড়ালের মুখ মৃণাল দত্তর দিকে ঘুরে গিয়েছে প্রায়। চন্দন তারাপদর হাতের কাছটা জোরে চেপে ধরল।
.
তিন
টাইম টেল-এ গাড়ি ছাড়ার সময় রাত প্রায় দশটা; ন’টার আগেই তারাপদরা হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে গেল। হাতে খানিকটা সময় থাকা ভাল, টিকিট কাটা, আগেভাগে বসবার জায়গা দখল করা । সারা রাত এই শীতে তো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া যাবে না, ঘুমোতে না পারুক–অন্তত ভাল করে বসার জায়গা দরকার।
তারাপদ নিজে টিকিট কাটতে গেল না। চন্দনকে পাঠিয়ে দিল। সারাটা দিন আজ তারাপদর বড় ছুটোছুটি গিয়েছে। কাল সারা রাত তেমন একটা ঘুমোতেই পারল না, মাথার মধ্যে মৃণাল দত্ত আর ভুজঙ্গভূষণ। ওরই মধ্যে সাধুমামার মুখ মাঝে মাঝে উঁকি দিয়েছে, মা বাবার কথা মনে পড়েছে, পরীর কথাও মনে পড়ল। পরীর মুখ তো মনেই ছিল না তারাপদর, ছবি দেখে মনে পড়ল। ওই একটিমাত্র বোন, আর তো কেউ ছিল না তার, আহা সে বেচারিও থাকল না। হাজার চিন্তায় ঘুম হল না। তার ওপর ওই ব্যাপারটাও তাকে বেশ অবাক করে তুলেছিল। মৃণালবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়েই চন্দন সেই কালো বেড়ালটার কথা বলল। বেড়ালটা নাকি ঘড়ির কাঁটার মতন ঘুরে যায়। চন্দন স্বচক্ষে দেখেছে, তারাপদরা যখন মৃণালবাবুর ঘরে গিয়ে বসে তখন তার মুখ ছিল তাদের দিকে, আর যখন চলে আসে তখন বেড়ালটার মুখ মৃণাল দত্তর দিকে। এ কি করে সম্ভব? একটা ভুয়ো, নির্জীব, পুতুল ধরনের বেড়াল কেমন করে মুখ ঘোরাবে? চন্দন নিশ্চয় ভুল দেখেছে।
চন্দন জোর দিয়ে বলল, না, সে ভুল দেখেনি। ঠিকই দেখেছে।
কেমন করে এটা হয় তারাপদ বুঝতে পারল না। ভূতের ব্যাপার নাকি? ম্যাজিক?
ভুজঙ্গভূষণের পুরো ব্যাপাটাই ভূতুড়ে মনে হচ্ছে, ভাবতে গেলে সেরকমই মনে হয় নাকি? কোথায় তারাপদ আর কোথায় ভুজঙ্গভূষণ–চেনা না জানা না–কস্মিনকালেও যারা পরস্পরের মুখ পর্যন্ত দেখল না, তারা কেমন করে। আজ একজন অন্যজনকে খুঁজে বেড়াচ্ছে! ভুজঙ্গভূষণ খুঁজছে তারাপদকে, আর তারাপদ খুঁজে বেড়াচ্ছে ভুজঙ্গভূষণের দেড় দুলাখ টাকার সম্পত্তি! সত্যিই ব্যাপারটা ভুতুড়ে।
ব্যাপার ভুতুড়ে হোক আর যাই হোক, সকালে ঘুম ভেকে উঠে তারাপদকে মৃণালবাবুর কাছে ছুটতেই হল। দেড় দু’লাখ টাকার লোভে কি? হতে পারে। আবার টাকার লোভ ছাড়াও কেমন একটা রহস্যের টানও রয়েছে। সত্যি সত্যি ওই ভুজঙ্গভূষণ কে? কেনই বা তাঁর ওই রকম কাপালিক-মাকা চেহারা? কী করতেন তিনি এতকাল? কেন কোনদিন তারাপদদের খোঁজখবর নেনি, অথচ সাধুমামাকে দিয়ে তাদের পরিবারের–মানে তারাপদর মা, বাবা, পরী সকলের ছবি জোগাড় করে নিয়েছেন! কী তাঁর উদ্দেশ্য ছিল?
হাজার রকম ‘কেন’র কোনো জবাব যেমন পাওয়া যাচ্ছে না–সেইরকম। বোঝা যাচ্ছে না ভুজঙ্গভূষণ কী করে জানতে পারলেন যে সামনের অমাবস্যা পর্যন্ত তিনি বেঁচে থাকবেন? ভদ্রলোকের কি ইচ্ছামৃত্যু? কে জানে বাবা! এত রকম অবাক হবার ব্যাপার যখন রয়েছে তখন বেড়ালটার মুখ ঘোরানোও আর এমন কি আশ্চর্যের! তবে, ওই কালো বেড়ালটা তো ছিল, মৃণাল দত্তর ঘরে। তা হলে? মৃণাল দত্তও কি ভুজঙ্গভূষণের ছোঁয়া পেয়েছেন?
সকালে মৃণাল দত্তকে একবার কালো বেড়ালটার কথা জিজ্ঞেস করলে হত। এসব কথা জিজ্ঞেস করতে লজ্জাও তত করে। কিন্তু সে সুযোগই হল না। পুরনো ঘরে মৃণাল দত্ত তারাপদকে আর বসাননি। বাইরের বৈঠকখানায় বসিয়ে রেখে তাঁর দরকারি কাগজপত্র এনে দিলেন। যেন তিনি জানতেন তারাপদ ঠিকই আসবে, রাত পোহালেই এসে হাজির হবে। সমস্ত তৈরি করে রেখেছিলেন। সিলমোহর করা একটা চিঠি, সামান্য ভারী মতন একটা প্যাকেট, রেজিস্ট্রি করা পার্শেলের মতন চেহারা সেটার চারপাশে গালা দিয়ে করা, মোহরের ছাপ।
সেইসব জিনিস নিয়ে তারাপদ এল চন্দনের মেডিক্যাল হোস্টেলে। চন্দনকে বলল, “চাঁদু তোকে সঙ্গে যেতে হবে ।”
