কিকিরা বললেন, “একটা কথা আমায় বলুন। মেনে নিলাম আপনার মেয়ে তার দাদার কাছে ঘড়িটা দেখেছে। কিন্তু বাবলু যে ঘড়িটা পকেটে পুরে দৌড়তে বেরিয়েছিল, তার প্রমাণ কী? কেউ কি তাকে ঘড়ি পকেটে পুরতে দেখেছে?”
কৃষ্ণকান্ত কেমন বিভ্রমের চোখে তাকিয়ে থাকলেন। মাথা নাড়লেন। “না, কেউ দেখেনি।”
“তবে?”
“বাবলুর ঘরে তার পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে ঘড়ি রাখা বাক্সটা পাওয়া গেছে। ওটা অবশ্য ঘড়ির আসল বাক্স নয়। সে বাক্স কবে কোনকালেই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আমরা একটা গয়নার গোল মতন বাক্সে ঘড়িটাকে রেখে দিয়েছিলাম। বাবার স্মৃতি। দেখতেও তো ভাল।”
“তার ওপর সোনার?
“না, না, ওইটুকু সোনার লোভে ঘড়িটাকে যত্ন করে রেখে দেওয়ার দরকার আমাদের ছিল না। বাবার স্মৃতি হিসেবেই ছিল।”
তারাপদ বলল, “ড্রয়ারের মধ্যে ঘড়ির বাক্সটা রয়েছে, এটা আপনারা পরে খেয়াল করলেন?”
“হ্যাঁ। প্রথমদিকে বাবলুর খোঁজখবর করতে বাইরেই ছোটাছুটি করেছি। ঘরের কথা খেয়ালই হয়নি। পরে ওর ঘরের এটা-সেটা হাতড়েছি। ভেবেছি, কী জানিবাড়ি ছাড়ার আগে ও যদি কিছু লিখে গিয়ে থাকে। এরকম করার কথা নয়। তবু কোথাও কিছু হদিস পাচ্ছি না বলেই ওর ঘর, টেবিল, জিনিসপত্র হাতড়ানো।”
“কী পেলেন?”
“কী আর পেলাম! টেবিলের ওপর একটা কাগজ পেলাম, তাতে লেখা ফক্স, অক্স আর বক্স!…আর কালই ওই ঘড়ির বাক্সটা চোখে পড়ল। কাগজপত্রের তলায় চাপা ছিল।”
“কী ধরনের কাগজ?”
“এমনি কাগজ! একটা স্পোর্টস ম্যাগাজিন, একটা ইংরিজি চটি কমিকসের বই। দু-চারটে এলোমেলো কাগজ!” কৃষ্ণকান্ত চুপ করে গেলেন।
অল্পক্ষণ সবাই চুপচাপ। চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলেন কৃষ্ণকান্ত। অন্যমনস্কভাবেই সিগারেটের প্যাকেট বার করলেন। লাইটার এগিয়ে দিলেন কিকিরাদের।
চন্দন লক্ষ করল, সিগারেট বার করতে, লাইটার দিয়ে জ্বালিয়ে নিতে কোনো অসুবিধে হল না কৃষ্ণকান্তর। অভ্যাস হয়ে গিয়েছে সবই। এইরকমই হয়। মানুষ তার অনেক শারীরিক খুঁত নিজের থেকেই মানিয়ে নেয়।
চন্দন কৌতূহল বোধ করে বলল, “আপনার ছেলে যে রোজকার মতন দৌড়তে বেরিয়েছিল–তাতে আপনাদের কোনো সন্দেহ নেই?”
“না। ও অনেক ভোরে দৌড়তে বেরোয়। আমি তখন বিছানা ছেড়ে উঠি না। বেলায় উঠি। বাবলুর মা মাঝে-মাঝে উঠে পড়ে। আমাদের বাড়ির কাজের লোক সিধু–সিদ্ধেশ্বর ভোরে সদরটর খুলে দেয়। সিধু বাবলুকে সদর খুলে দিয়েছিল।”
“কিছু বলেছিল আপনার ছেলে সিধুকে?”
“না। ট্রাকসুট জুতোটুতো পরে–যেমন রোজ দৌড়তে বেরোয়, বেরিয়ে গিয়েছিল বাবলু।”
কিকিরা বললেন, “আপনি তো আমায় কাল বলছিলেন, পাড়ার চেনাজানা লোক ওকে দৌড়তে দেখেছে লেকে।”
“হ্যাঁ। সকালের দিকে অনেকেই ঘোরাফেরা করে ওদিকে। আমাদের পাড়ার কয়েকজনও করে। তারা বাবলুকে দেখেছে।”
“ভুল দেখেনি তো?”
“না, ভুল দেখবে কেন? নীল-সাদা মেশানো ট্রাকসুট পরে বাবলু দৌড়য়। সেইভাবেই দেখেছে।”
“শেষ কে দেখেছে?”
“তা বলতে পারব না।”
কিকিরা সামান্য চুপ করে থেকে বললেন, “কৃষ্ণকান্তবাবু, ব্যাপারটা সত্যিই অদ্ভুত! ভোরবেলায় লোকজনের সামনে থেকে একটা জোয়ান ছেলেকে কেউ তো চুরি করে নিয়ে যেতে পারে না। অসম্ভব! আর নেবেই বা কেন?…আপনাদের সঙ্গে কারও শত্রুতা আছে?”
“জ্ঞানত না।”
“কোনো জ্ঞাতি কুটুম…?”
“মনে করতে পারি না।”
“বাবলুর বন্ধুবান্ধব, যাদের সঙ্গে ও পড়াশোনা করত, তাদের কারও সঙ্গে–”
“না না। ওর বন্ধুবান্ধবরাও ওকে আজ কদিন ধরে নানা জায়গায় খুঁজে বেড়াচ্ছে। কাগজে আমি একটা সন্ধান চাই বিজ্ঞাপনও ছাপিয়েছি। দুদিন হল পর পর বেরিয়েছে।”
কিকিরা ভাবছিলেন। পরে বললেন, “আমরা আপনার ছেলেকে খোঁজ করার দায়িত্ব নিচ্ছি। পারব কিনা জানি না। সময় লাগবে।..তার আগে আমি একবার আপনাদের বাড়ি যেতে চাই। কাল সন্ধের আগেই যাব। আপত্তি নেই তো?”
“কিসের আপত্তি, মশাই! আপনারা কাল আসুন। আমি বাড়িতেই থাকব।”
.
০২.
পরের দিন চন্দনকে পাওয়া গেল না, কাজে আটকে গিয়েছে।
কিকিরা তারাপদকে সঙ্গে নিয়েই বেরিয়ে পড়লেন, লেক গার্ডেন্স যাবেন। তখনো ঝাপসা হয়নি চারপাশ। গ্রীষ্মের বিকেল কি সহজে ফুরোতে চায়! রোদ নেই, আলোও পুরোপুরি মুছে যায়নি।
ট্যাক্সিতে যেতে-যেতে তারাপদ বলল, “স্যার, কাল মাঝরাতে আমার ঘুম ভেঙে গেল। ভীষণ তেষ্টা পেয়েছে। যা গরম! পাখাটাও আর বাড়ানো যাচ্ছে না। জল খেয়ে শুলাম আবার। ঘুম আর আসে না। কৃষ্ণকান্তবাবুর ছেলের কথা ভাবছিলাম। মাথায় কিছু ঢুকছিল না। অদ্ভুত ব্যাপার!”
কিকিরা বললেন, “আমার অবস্থাও তোমার মতন। ভেবেই যাচ্ছি, কোনো আলো দেখতে পাচ্ছি না।”
“আমার বারবার একটা কথাই মনে হচ্ছে। বাবলু সকালে দৌড়তে যাওয়ার সময় কেন একটা অচল ঘড়ি সঙ্গে নেবে?”
কিকিরা ট্যাক্সির জানলা দিয়ে রাস্তাঘাট, মানুষজন দেখতে-দেখতে অন্যমনস্কভাবে বললেন, “নাও তো পারে।”
তারাপদ অবাক হয়ে বলল, “বাবলুর বাবা তো বলছেন।”
“সেটা তাঁর অনুমান। কেউ কি দেখেছে?”
“না। উনি তা বললেন না।”
“তবে? এমন তো হতে পারে, আগের দিন বাবলু ঘড়িটা নিয়ে বেরিয়েছিল। তারপর হারিয়ে এসেছে। “
“হারিয়ে এসেছে! কী করে বুঝলেন?”
“বুঝিনি। কথার কথা বলছিলাম।…ধরো, এমন যদি হয় আগের দিন বাবলু ঘড়িটা নিয়ে তার বন্ধুবান্ধবদের দেখাতে গিয়েছিল। আগের দিন বলছি এইজন্যে যে, বাবলুর বোন সেদিনই তার দাদার কাছে ঘড়িটা দেখেছিল তার মানে এই নয় যে, বাবলুও আগেই আলমারি থেকে ঘড়িটা নেয়নি।
