কিকিরা হঠাৎ বললেন, “আপনার ছেলে বাবলু তো সেরকম নয়। মানে, সে নিজে থেকেই লুকিয়ে থাকার চেষ্টা করবে না।”
“না, একেবারেই নয়, কৃষ্ণকান্ত মাথা নাড়লেন, “বাবলুর পক্ষে অমন কাজ অসম্ভব!”
কিকিরা একটু চুপ করে থেকে বললেন, “নতুন আর কিছু জানতে পেরেছেন? মানে, আমি বলছি বাবলুর টেবিলে ওই যে কাগজটা পেয়েছিলেন–পাজল-এর মতন, যাতে ফক্স, অক্স আর বক্স লেখা ছিল ইংরিজি হরফে–তার পর আর কিছু নতুন জানতে পেরেছেন?”
কৃষ্ণকান্ত বললেন, “পেরেছি। আপনাকে সেকথাই বলতে যাচ্ছিলাম কাল কথায় কথায় ভুলে গিয়েছিলাম।
কিকিরা কৌতূহল বোধ করলেন, “কী জানতে পেরেছেন?
“আমাদের বাড়িতে পুরনো একটা ঘড়ি ছিল।সেকেলে পকেট ঘড়ি। আমার বাবার কাছে দেখতাম। বাবা বড় একটা ব্যবহার করতেন না। আলমারিতে ভোলা থাকত। ঘড়িটা সুইস মেড। সেকালের বিখ্যাত কোনো কোম্পানির। দেখতে অতি চমৎকার। তার চেয়েও বড় কথা হল, ঘড়িটা সোনার, একেবারে পাকা সোনা হয়ত নয়, কাঁটা দুটোও সোনার। এক-দুই নম্বরের বদলে রোমান সাইন ছিল, এক দাঁড়ি দুই দাঁড়ি…। আর সবচেয়ে মজা ছিল ঘড়িটা আলোয় আনলে ডায়ালের ভেতরে একরকম রং হত, ছায়ায় একরকম, আবার অন্ধকারে জ্বলজ্বল করত। ঘড়ির নিচে আর-এক ছোট্ট গোলের মধ্যে কম্পাসের কাঁটাও ছিল। ঘড়িটা নিশ্চয় দামি। তার চেয়েও বেশি হল, দেখতে খুব সুন্দর। ঘড়ির ডালাটাও ছিল দেখার মতন। ডালার ওপর সুন্দর নকশা ছিল। এনগ্রেভিং। রাজারানীর মুখ। লতাপাতা।”
তারাপদরা মন দিয়ে শুনছিল কৃষ্ণকান্তর কথা। হঠাৎ বলল, “ঘড়িটা চলত?”
“না। বাবার আমলেই বোধ হয় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ও ঘড়ি সারাবার মিস্ত্রি কোথায়?” কম্পাসের কাঁটাটা কিন্তু ঠিক ছিল।”
“ঘড়িটা খোয়া গিয়েছে?”
“হ্যাঁ। আলমারি, লকার, ওয়ার্ডরোব, দেরাজ সব জায়গাতেই খোঁজা হয়েছে–ঘড়ি পাওয়া যায়নি।”
কিকিরা বললেন, “আপনাদের বাড়ি নিশ্চয় ছোটখাটো নয়; ঘর আসবাবপত্রও যথেষ্ট বলে মনে হয়। একটা পকেট ঘড়ি কোথাও না কোথাও পড়ে থাকতে তো পারে!”
“বললাম তো, সব জায়গাতেই খোঁজা হয়েছে তন্নতন্ন করে।…তা ছাড়া ঘড়িটা আমাদের ঘরে পুরনো আলমারির মধ্যে থাকত।”
“বাবলু বাড়ি থেকে উধাও, ঘড়িও উধাও–আপনি কি তাই বলতে চাইছেন?”
কৃষ্ণকান্ত অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন। মাথা নাড়লেন। “তাই তো দেখছি!”
চন্দন চুপচাপ বসে কথাবার্তা শুনছিল কৃষ্ণকান্ত আর কিকিরার। তার কাছে ব্যাপারটা এখনো অস্পষ্ট। একটা কুড়ি বাইশ বছরের ছেলে সকালে লেকের ধারে দৌড়তে গিয়ে হঠাৎ উধাও হয়ে গিয়েছে। সাতসকালে এভাবে উধাও হওয়া অসম্ভব–যদি না সেই ছেলে নিজেই কোথাও পালিয়ে যায়! লেকের আশেপাশে অজস্র লোক ভোরবেলায় বেড়ায়, শরীর চর্চা করে, দৌড়য়। অত লোকজনের চোখের সামনে থেকে, সদ্য ভোরে–কেউ তো বাবলু নামের জোয়ান ছেলেকে গুম করে নিয়ে যেতে পারে না। অসম্ভব! তার ওপর আবার ভদ্রলোক কোথ থেকে এক পুরনো সোনার ঘড়ির কথা টেনে আনলেন। কী সম্পর্ক এই দুইয়ের?
চন্দনের কিছু বলতে ইচ্ছে করছিল, বলল না।
চন্দন না বলুক, কিকিরাই বললেন কৃষ্ণকান্তকে, “বাবলুর সঙ্গে ঘড়ির সম্পর্ক কী কৃষ্ণকান্তবাবু? আপনার ছেলে ভাল, চোর ছাঁচোড় নয়, বাজে বন্ধুবান্ধবও নেই। আপনি আমায় বলেছেন আগে।”
“বলেছি। এখনো বলছি। লেখাপড়ায় সে অ্যাভারেজ হয়ত, কিন্তু তার স্বভাবে কোনো দোষ নেই। খেলাধুলো করে হইহল্লা করে, একটা নাটকের দল আছে ওদের–তাতে খাটাখাটুনি ছাড়াও, একটু-আধটু অভিনয় করে। বাবা হিসেবে ছেলের বেশি প্রশংসা করা মানায় না রায়মশাই। ছেলে সম্পর্কে আমার অন্য কোনো অভিযোগ নেই, শুধু একটাই ভাবনা ছিল; এখন যেমন আছে–আছে, চলে যাচ্ছে। পাঁচ-সাত বছর পরে আমার ব্যবসার হাল ধরতে পারবে তো?”
“কেন, ওর বুঝি মন নেই আপনার ব্যবসাপত্রে?”
“একেবারেই নয়। ছেলেটার সব ভাল, শুধু একটা জিনিস ভাল নয়, বড় খামখেয়ালি, জেদি। বেপরোয়া।”
তারাপদ বলল, “আপনি কি মনে করেন, আপনার ছেলে ঘড়িটা নিয়েছে?”
“হ্যাঁ।”
“কেন? ঘড়ি তো আপনাদের ঘরে আলমারির মধ্যে থাকত!”
“তাতে কী! বাবলুর মার এমনিতেই ভুলো মন, তা ছাড়া মশাই, বাক্স আলমারি দেরাজের চাবি আগলে রাখার অভ্যেস বাড়ির মধ্যে আমাদের নেই। আমাদের একটি ছেলে একটি মেয়ে, কার জন্যে চাবির গোছা আগলাব?”
“কাজকর্মের লোকজন?”
“তারা আমাদের বাড়িতেই থাকে। পুরনো, বিশ্বস্ত লোক। ঠিকে কাজের লোক একজনই। বাসন-টাসন মাজে।
কিকিরা কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, বগলা চা নিয়ে এল কৃষ্ণকান্তর জন্য।
চা দিয়ে চলে গেল বগলা।
“নিন, একটু চা খান” কিকিরা বললেন। “বাবলু যে ঘড়িটা নিয়েছিল এর কোনো প্রমাণ আছে?”
“খুকু–আমার মেয়ে, দেখেছে।”
“নিতে দেখেছে?”
“না, আগের দিন বাবলুর কাছে দেখেছে। দুই ভাইবোনে এ নিয়ে ঝগড়াও করেছে মজা করে।”
“আপনি বলছেন, বাবলু পরের দিন সকালে যখন লেকে দৌড়তে যায় তখন ওর কাছে ঘড়িটা ছিল?
“তাই তো মনে হয়, কৃষ্ণকান্ত অন্যমনস্কভাবে বললেন
“অচল ঘড়ি, তাও পুরনো পকেট ঘড়ি নিয়ে দৌড়তে যাওয়া?” চন্দন বলল হঠাৎ। এই প্রথম সে কথা বলল। তার বোধ হয় বিশ্বাস হচ্ছিল না কথাটা। সন্দেহ হচ্ছিল।
কৃষ্ণকান্ত দেখলেন চন্দনকে, কোনো জবাব দিলেন না।
