চন্দন বলল, “কৃষ্ণকান্তবাবুর প্রবলেমটা কী?”
চায়ে চুমুক দিয়ে কিকিরা বললেন, “ওঁর ছেলেকে পাওয়া যাচ্ছে না।”
“সে কী? কত বড় ছেলে? কতদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না?”
“ছেলে সাবালক। বছর একুশ-বাইশ বয়েস। দিন পাঁচেক হল নিরুদ্দেশ।”
তারাপদ বলল, “আশ্চর্য! অতবড় ছেলে, হঠাৎ নিরুদ্দেশ। বাড়িতে কিছু হয়েছিল নাকি? রাগারাগি? মা বাবার ওপর অভিমান?”
“না। কৃষ্ণকান্ত বলছেন, বাড়িতে কোনো গণ্ডগোলই হয়নি। আর ছেলেও তেমন নয় যে পালিয়ে গিয়ে বাড়ির লোককে জব্দ করবে! ছেলে ভাল। বাড়ির আদুরে ছেলে। শরীর চর্চার দিকে ঝোঁক। খেলাধুলো করে। রোজ সকালে, বারোমাসই, মাইল দুই দৌড়য়। ওটা ওর অভ্যেস। দিন পাঁচেক আগে সে রোজকার মতন ভোরের দিকে দৌড়তে বেরিয়েছিল। আর বাড়ি ফিরে আসেনি।”
তারাপদ আর চন্দন যেন কিছু ভাবছিল। অজানা অচেনা একটি ছেলের কথাই। একটি অস্পষ্ট ছবি ভেসে উঠছিল। ছেলেটি ভোরের আলোয় নিজের মনে দৌড়চ্ছে। কোনোদিকে হুঁশ নেই।
“কোথায় দৌড়চ্ছিল?”
“লেকের পাশে।”
“ঢাকুরিয়া লেক! বাড়ি কোথায় কৃষ্ণকান্তদের?”
“পুরনো বাড়ি টালিগঞ্জ চারু অ্যাভিনিউ। নতুন বাড়ি লেক গার্ডেন্স। কৃষ্ণকান্তরা এখন লেক গার্ডেন্সেই থাকেন। গত আট দশ বছর। টালিগঞ্জের বাড়ি পৈতৃক। সেখানে বড় ভাই তাঁর পরিবার নিয়ে থাকেন।”
চন্দন বলল, “কোনো অ্যাকসিডেন্ট হয়নি তো?”
“খোঁজখবর করে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি। হাসপাতালে খোঁজ করা হয়েছে, এমনকি কাছাকাছি নার্সিংহোমেও। নো ট্রেস…ায়ের কাপ নামিয়ে রেখে কিকিরা পকেট থেকে তাঁর সরু চুরুট বার করে রাতে যাচ্ছেন এমন সময় বাইরের দরজায় টোকা পড়ল।
কিকিরা বললেন, “বোধ হয় কৃষ্ণকান্ত।” বলতে বলতে তিনি উঠলেন। “বস, আসছি।”
সামান্য পরেই কিকিরা এক ভদ্রলোককে নিয়ে ফিরে এলেন।
কৃষ্ণকান্তই। কিকিরার দেওয়া বর্ণনায় কোনো ভুল নেই। তারাপদরা চিনে নিতে পারল। ভদ্রলোকের চোখে চশমা। রঙিন কাঁচ। খানিকটা ঘন রঙের। চোখ দেখা যায় না। কিকিরা চশমার কথাটি বলেননি। হয়ত ভুলে গিয়েছেন। বা এমনও হতে পারে, সব সময় চোখে চশমা রাখেন না কৃষ্ণকান্ত।
তারাপদদের দেখে কৃষ্ণকান্ত যেন অস্বস্তি বোধ করলেন। বিরক্ত হয়েছেন কিনা বোঝা গেল না।
কিকিরা হাসি-হাসি মুখেই কৃষ্ণকান্তকে বললেন, “আমরা আপনার কথাই আলোচনা করছিলাম। এরা আমার দুই শাগরেদ, তারাপদ আর চন্দন। চন্দন পেশায় ডাক্তার। ব্রাইট বয়।” বলে তিনি তারাপদদের দিকে তাকালেন, “তারা, ইনিই কৃষ্ণকান্তবাবু। “
তারাপদরা হাত তুলে নমস্কার জানাল।
কৃষ্ণকান্ত শুধু ডান হাত তুলে প্রতিনমস্কার জানালেন। বাঁ হাত উড়নির তলায় আড়াল করা। এই গরমেও কৃষ্ণকান্ত একটা পাতলা উড়নি গলায় কাঁধে ঝুলিয়ে রাখেন। উড়নিটা দেখতে ভাল। পাড়অলা।
তারাপদদের মনে হল, বাঁ হাতটা আড়াল করতেই কৃষ্ণকান্ত উড়নিটা ব্যবহার করেন। অন্তত বাইরের লোকজনের সামনে। ভদ্রলোকের পোশাকআশাক একেবারে সাদাসিধে। ধুতি পাঞ্জাবি পরা বাঙালি। অবশ্য ভাল ধুতি, আদ্দির পাঞ্জাবি। ডান হাতে দুটি আংটি।
“বসুন,” কিকিরা বললেন কৃষ্ণকান্তকে।
কৃষ্ণকান্ত বসলেন।
কিকিরা বললেন, “একটা কথা আপনাকে গোড়ায় বলে নিই। আমি মশাই গোয়েন্দা নই। অশ্বিনীবাবু নিশ্চয় আপনাকে বলেছেন, যাদের সঙ্গে ফাইট করার এলেম আমার নেই। মানে, যাকে বলে ষণ্ডার ঘাড়ে গুণ্ডা–আমরা তা নই। রিভলবার বলুন আর বন্দুক বলুন–কোনোটাই আমি চালাতে পারি না। আমি নিতান্তই এক ম্যাজিশিয়ান। তাও সেকেলে ওল্ড ম্যাজিশিয়ান। এখন সে-পাটও গিয়েছে। আমার ভরসায় থাকলে আপনাকে পস্তাতে হতে পারে। তবে হ্যাঁ, যদি আমি বলি, আপনার হয়ে কাজ করব, তবে যথাসাধ্য নিশ্চয় করব। আমার এই দুই চেলাকে সঙ্গে নিয়েই করব। আপনি কি তাতে রাজি হবেন?”
কৃষ্ণকান্ত ভাবলেন একটু। মাথা হেলালেন।
“বেশ। তবে চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। কী তারাপদ, চাঁদু কী বলো তোমরা?” কিকিরা বললেন।
তারাপদ আর কী বলবে!
কৃষ্ণকান্ত নিজেই বললেন এবার, “আজও কোনো খবর নেই। আমাদের যত জানাশোনা জায়গা ছিল, আত্মীয়স্বজন, সব জায়গাতেই খোঁজ করা হয়েছে। কলকাতার বাইরেও কেউ-কেউ থাকে দূর সম্পর্কের, সেখানেও লোক পাঠিয়েছি। না, মাথা নাড়লেন কৃষ্ণকান্ত, “কোথাও বাবলুর কোন খবর নেই। সে কোথাও যায়নি।” কৃষ্ণকান্তকে বড় বিমর্ষ, হতাশ দেখাচ্ছিল। উদ্বিগ্ন, ভীত।
কিকিরা বললেন, “আপনি বড় ভেঙে পড়েছেন। ভাঙবারই কথা। কিন্তু অত হতাশ হলে তো চলবে না কৃষ্ণকান্তবাবু; মনে একটু জোর আনুন।”
“কেমন করে জোর আনব বলুন! আমাদের ওই একটিমাত্র ছেলে, আর একটি মেয়ে। সে তো এখনো ছেলেমানুষ, মোলো সতেরো বছর বয়েস। মেয়েটা আজ কদিন ধরে শুধু কাঁদছে। বাবলুর মায়ের অবস্থা পাগলের মতন। আমি আর পারছি না রায়মশাই। কোথায় গেল আমার ছেলে? কী হল তার?”
কিকিরা শান্তভাবে বললেন, “পুলিশ কী বলছে?”
“পুলিশের কথা আর বলবেন না। আজ সকালেই অনেক ধরে করে এক বড় অফিসারের সঙ্গে দেখা করেছিলাম। সব শুনে অফিসার বললেন, আজকাল মিসিং লোকজনের সংখ্যা অনেক বেড়ে গিয়েছে। খোঁজখবর করতে সময় লাগে। তাও অর্ধেককে খুঁজে পাই না। কে যে কোথায় ছিটকে পড়ে, ধরতেই পারি না। তার ওপর কেউ যদি নিজে লুকিয়ে থাকতে চায়–তাকে খুঁজে বার করা একরকম অসম্ভব!”
