এখন গরমকাল। মাঝ-বৈশাখ। কলকাতা শহর তেতেপুড়ে মরছে। সেই কবে চৈত্রমাসের শেষাশেষি একদিন কালবৈশাখী দেখা দিয়েছিল, তারপর থেকে টানা হপ্তা তিনেক না একটু মেঘ, না মেঘলা; মাঝরাতেও যেন বাতাস তেমন ঠাণ্ডা হয় না। কাগজঅলারা বলছে, এখনো কয়েকটা দিন এইরকম গরম চলবে।
কিকিরা ফিরে এলেন। মনে হল, ভাল করে মুখ মোছেননি, ভিজে ভিজে ভাব রয়েছে।
“আচ্ছা তারাবাবু, ফক্স, অক্স আর বক্স-এর মধ্যে মিলটা কোথায়?” কিকিরা বললেন।
আচমকা এরকম একটা বেয়াড়া প্রশ্ন শুনে তারাপদরা অবাক হয়ে গেল। চন্দন তারাপদর দিকে তাকাল, তারাপদ চন্দনের দিকে। দুজনেই যেন বোকার মতন চুপ করে থাকল।
কিকিরা এবার নিজের জায়গাটিতে বসলেন।
বগলা জল এনে দিল কিকিরাকে। জল খেয়ে কিকিরা চায়ের কথা বলে দিলেন বগলাকে। বগলা চলে গেল।
তারাপদ ঠাট্টার গলায় বলল, “হঠাৎ আপনার মাথায় ফক্স, অক্স, বক্স এল কোথ থেকে?”
“না, ভাবছিলাম!”
“ভাববার আর জিনিস পেলেন না?”
চন্দন মজা করে বলল, “স্যার, ফক্স আর অক্সের একটা মিল আছে। দুটোরই চারটে করে পা; একটা করে লেজ…!”
কিকিরা আড়চোখে চন্দনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “দুটো লেজওলা প্রাণী তুমি দেখেছ নাকি?”
প্রথমটায় খেয়াল না হলেও পর মুহূর্তে কথাটা বুঝতে পেরে তারাপদ জোরে হেসে উঠল। সত্যিই তো, দুটো লেজওলা প্রাণী কে আর কবে দেখেছে! অন্তত তারাপদরা আজ পর্যন্ত দেখেনি। তবে জগতে এত অজস্র হাজারে-হাজারে জীবজন্তু রয়েছে যে, যদি কারও দুটো লেজ থেকে থাকে, অবাক হওয়ার কিছু নেই।
তারাপদ হাসতে-হাসতেই বলল, “ঠিক আছে স্যার, লেজের “একটি’কে খসিয়ে দেওয়া গেল। এখন বলুন তো হঠাৎ ফক্স, অক্স, বক্স নিয়ে আপনার মাথা ঘামানো কেন?”
চন্দন বলল, “ক্রস ওয়ার্ড ধরনের কিছু করছেন নাকি?”
“না, আমি ওই জিনিসটা করি না। দু-একবার চেষ্টা করেছিলাম আগে, মাথা গুলিয়ে যায়।” বলে, নিজের মাথা দেখালেন। কিকিরার মাথার উসকো-খুসকো চুল যেন আরও পেকে গিয়েছে আজকাল।
“তা হলে?”
“একটা সমস্যায় পড়া গিয়েছে। এক ভদ্রলোক কাল আমার কাছে। এসেছিলেন; আজও আসবেন। ফক্স, অক্স, বক্স তিনিই আমার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়ে গিয়েছেন।”
তারাপদ কিকিরাকে দেখল কয়েক পলক। তারপর চন্দনের দিকে তাকাল। কেমন যেন একটা রহস্যের আঁচ পাওয়া যাচ্ছে।
“কে ভদ্রলোক?” তারাপদ বলল।
“কৃষ্ণকান্ত দত্তরায়। …কটা বাজল এখন?”
চন্দন ঘড়ি দেখল। “ছ’টা বাজতে চলল।”
“তবে তো ভদ্রলোকের আসার সময় হয়ে গেল। ছুটা সোয়া ছ’টা টাইম দিয়েছি।”
চন্দনই আবার বলল, “আপনার চেনাজানা কেউ?”
“না। আমার পুরনো বন্ধু অশ্বিনীবাবুর কাছ থেকে এসেছেন।”
“প্রয়োজন?”
“সে এক লম্বা কাহিনী। ভদ্রলোককে আসতে দাও, শুনবে।”
তারাপদ বলল, “আপনার নতুন মক্কেল?”
“এখনো নয়। আমি বলেছি, দাঁড়ান আগে ভেবে দেখি, তারপর কথা বলব। নো ফাইন্যাল টক-বুঝলে তারা, কাল শুধু হিয়ারিং দিয়েছি। আসতে বলেছি আজ। তোমাদের সঙ্গে কথা না বলে মক্কেল নেওয়া কি উচিত? তোমরা আমার পার্টনার।” কিকিরা চোখ মটকে হাসলেন।
“বাঃ, আমরা যদি আজ না আসতাম!”
“সে আবার কী কথা গো! আজ শনিবার, তোমাদের আসার কথা। তা ছাড়া বগলার তৈরি গুজরাতি দুহিবড়া খাবার নেমন্তন্ন আজ তোমাদের! আসবে না মানে? খাবার ব্যাপারে তোমরা ভুল করবে এমন তো দেখিনি।” কিকিরা হাসতে-হাসতে মজার গলায় বললেন।
দহিবড়ার নেমন্তন্ন না থাকলেও যে তারাপদরা আজ আসত, তা ঠিকই। নেহাত আটকে না পড়লে শনিবার তারা কিকিরার কাছে অবশ্যই আসে। যদিবা চন্দন কোনো কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে- হয়ত সে আসে না, তারাপদ ঠিকই আসে।
চন্দন বলল, “কৃষ্ণকান্ত দত্তরায় লোকটি সম্পর্কে না হয় আগেভাগে একটু বলে রাখলেন কিকিরা! কে তিনি, কোথায় থাকেন, কী করেন?”
কিকিরা বললেন, “কৃষ্ণকান্ত ব্যবসায়ী মানুষ। বিল্ডিং কনট্রাকটার। হালে নিজেই দু-একটা ঘরবাড়ি তৈরি করে বিক্রিও করেছেন। তবে সেগুলো বাইরের দিকে। শহরে নয়। পয়সাঅলা মানুষ ঠিকই, কিন্তু বাইরের চালচলন সাদাসিধে।”
“বয়েস কত?” তারাপদ জিজ্ঞেস করল।
“পঞ্চাশ বাহান্ন। স্বাস্থ্য মজবুত বলা যায়। দুঃখের কথা হল, ওঁর বাঁ হাতটি স্বাভাবিক নয়। মানে, হাত আছে, হাতের রিস্ট থেকে তলার দিকটা–আঙুল পর্যন্ত কী বলব-একটা মাংসের পিণ্ডর মতন। ভোঁতা, মোটা। আঙুলগুলো যেন জড়ানো। মনে হয়, হাত মুঠো করে আছেন। এটা তাঁর জন্মকাল থেকেই নয়। দুর্ঘটনায় পড়ে ওই অবস্থা হয়েছে। কিছু করার নেই। উনি বাঁ হাতে একটা সুতির সাদা দস্তানা পরে থাকেন।”
চন্দন মাথা নাড়ল। সে যেন বুঝতে পেরেছে। অ্যাক্সিডেন্টাল কেস।
তারাপদ বলল, “ভাগ্যের মার।”
“তা বলতে পারো। ওই খুঁতটুকু বাদ দিলে কৃষ্ণকান্তকে সুপুরুষ বলা যায়। লম্বা চেহারা, ধারালো নাক-মুখ, গায়ের রং শ্যামলা মাথার চুল দু-চারটে পেকেছে। বেশ ভদ্র মানুষ। ধীরে ধীরে কথা বলেন। আর এমনিতেও কাজের লোক। ব্যবসার কাজকর্ম দেখার জন্যে লোক আছে ঠিক, তবু নিজে সব দিকে নজর রাখেন।”
বগলা চা নিয়ে ঘরে এল।
চা নিতে-নিতে তারাপদ হেসে বলল, “বগলাদা, আমাদের দুহিবড়া কি রাত্তিরে খাওয়া হবে?”
“একেবারে খাওয়া-দাওয়া সেরে যাবে।”
“বাঃ! ফাইন!”
বগলা চলে গেল।
