বড় বড় ট্যাবলেট। আসবার সময় কিনে এনেছে। কিনে এনেছে, কারণ আগেই নার্সিং হোমে পুলিশের ভয়ে জটিলেশ্বর বলে ফেলেছিল ঘটনাগুলো।
চন্দন বলল, “এইরকম সিরিঞ্জ?”
“হ্যাঁ।”
“তারপর?”
“আমরা চলেই আসছি, লোকটা মেজোবাবুকে বলল, সে যতটুকু মেশাবার, মিশিয়ে দিয়েছে। যদি দরকার হয়, ব্যথা না কমে, আরও একটু করে মিশিয়ে নিতে।”
“জিনিসটা কী?” তারাপদ বলল।
“আমি জানি না।”
কিকিরা বললেন, “তারপর?”
“তারপর গাড়ি ছাড়লাম। মাঝপথে মেজোবাবু আমায় গাড়ি দাঁড় করাতে বললেন। গাড়ি দাঁড় করালাম। মেজোবাবু দেখলাম–ইঞ্জেকশনের শিশিটা ভেঙে ফেললেন। তার আগেই ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জটা বের করে নিয়েছেন। ওষুধ ভরলেন সিরিঞ্জে।”
“তারপর?”
“ওষুধের পাতার পেছনদিকের পাতলা কাগজের মতন রাংতাটায় ছুঁচের মতন ফুটো করে ওষুধ দিতে লাগলেন। সবকটা বড়িতেই। ওই নতুন পাতা থেকে দুটো বড়ি আগেও তিনি খেয়েছিলেন।”
কিকিরা চন্দনকে বললেন, “চাঁদু, ব্যাপারটা কী?”
চন্দন তার হাতের ডিসপোজাল সিরিঞ্জ গুছিয়ে নিল, ওষুধ ভরে নিল
ইঞ্জেকশনের অ্যাম্পুল থেকে। তারপর তার কিনে আনা ট্যাবলেটের পাতার পেছনদিককার পাতলা রাংতার ভেতর দিয়ে দু-তিনটে বড়িতে ওষুধ ছড়াল।
তারাপদ বলল, “হলটা কী?”
চন্দন বলল, “এই সিরিঞ্জের ছুঁচের মুখ এত সরু যে কারও বোঝার সাধ্য নেই, রাংতার ভেতর দিয়ে ওষুধ ঢোকানো হয়েছে। এই নিডল-মানে ছুঁচের গর্ত চোখেও দেখা অসম্ভব!”
কিকিরা জটিলেশ্বরকে বললেন, “তুমি নিজের চোখে এটা করতে দেখেছ?”
“হা স্যার।”
“মেজোবাবু সেই সিরিঞ্জ আর ইঞ্জেকশনের অ্যাম্পুল কী করলেন?”
“নামার সময় গাড়িতে ফেলে রেখেই চলে গেলেন।”
“ট্যাবলেটের পাতাটা?”
“মেজোবাবুর জামার পকেটেই থাকল।”
“তুমি সেই ভাঙা সিরিঞ্জ আর ভাঙা অ্যাম্পুল নিয়ে কী করলে?”
“কী করব। গাড়িতে পড়ে থাকল।”
“পড়ে থাকল! সত্যি কথা বলছ?”
“হ্যাঁ স্যার।”
“শেখরকে দাওনি?”
“না, না। শেখরদাকে কেন দেব! আমি কী অত বুঝেছি।”
“কবে বুঝলে?”
“মেজোবাবু মারা যাওয়ার পর। আমার কেমন সন্দেহ হল। কারখানায় এসে দেখি, গাড়ির মধ্যে সেটা পড়ে আছে। আমি নিয়ে গিয়ে ছোটবাবুকে দিলাম।” বলে মহিমচন্দ্রের দিকে তাকাল। মহিমচন্দ্র চুপচাপ। “শ্রাদ্ধের দিন কাজের ভিড়ের মধ্যে শেখরদাকে দেখেছি। তখনো কিছু বলিনি। পরে নিয়মভঙ্গের দিন কথায়-কথায় বলেছিলাম শেখরদাকে।”
কিকিরা মহিমন্দ্রের দিকে তাকালেন।
মহিমচন্দ্র বললেন, “জটা ঠিকই বলছে।”
কিকিরা চন্দনের দিকে তাকালেন। “চাঁদু, কী ব্যাপার। আমার তো মাথায় ঢুকছে না। ট্যাবলেটের স্ট্রিপ ফুটো করে ইঞ্জেকশনের ওষুধ ঢালা! এ তো জীবনে শুনিনি।”
চন্দন বলল, “আমিও শুনিনি। জানতাম না।”
“কিন্তু কী মেশানো হত ট্যাবলেটে?
চন্দন বলল, “কেমন করে বলব! মনে হয়–মনে হয়–অ্যাপারান্টলি কোনো পেইন কিলার ড্রাগ। মরফিন, কোকেন কত কী হতে পারে। কিংবা হতে পারে কোনো নেশা-নেশার জিনিস!”
মহিমচন্দ্র হঠাৎ বিহ্বল হয়ে পড়লেন। বললেন, “রায়ই, একটা কথাই আপনাকে আমি বলিনি। বলতে লজ্জা করেছে। মেজোবাবু শেষের দিকে কোনোরকম নেশা করতেন। সন্দেহ হত আমার। অফিসে মাঝে-মাঝেই কেমন ঝিম মেরে থাকতেন, আর ওষুধ খেতেন। বলতে পারতাম না। সে সাধ্য আমার ছিল না। সত্যি বলতে কী, আমার এইরকম একটা কথা মনেও হত। মনে হত, কোনো নেশার বিষ বেশি খেয়ে ফেলে মেজোবাবু ওইভাবে হঠাৎ মারা গেলেন। আত্মহত্যা করাও বলতে পারেন। এই কথাটাই আপনাকে আমি কোনোদিন বলিনি। ..আমি আর যাই হই, মেজোবাবুকে ভয় পেতাম। খাতির করতাম। উনি মানুষ হিসেবে একদিকে যেমন ভাল ছিলেন–অন্যদিকে বদরাগী, ক্ষ্যাপাটে। অভিমানী। …আপনাকে আমি সত্যি বলছি–ওই জিনিসগুলো আমি ফেলে দিয়েছি। তখন বুঝিনি, শেখর আমাকে এই ব্যাপারটা নিয়ে প্যাঁচে ফেলতে পারে।
কিকিরা শুনলেন। তারপর উঠে, ঘরে রাখা টেলিফোনের কাছে গিয়ে ডায়াল ঘোরাতে লাগলেন।
বারকয়েক পরে সাড়া পাওয়া গেল।
“নিউ সেন্ট্রাল হোটেল? একবার শেখর গুহনিয়োগীকে ডেকে দেবেন? ভেরি আর্জেন্ট। নার্সিং হোম থেকে বলছি। “
ঘরে সবাই চুপ। মহিমচন্দ্র যেন চোখের পাতাও ফেলছিলেন না।
খানিকটা পরে সাড়া পাওয়া গেল।
“শেখরবাবু?”
শেখর সাড়া দিল ও-প্রান্তে।
“একটা কথা জানাবার ছিল। আমি কিকিরা। আমরা মহিমবাবুর বাড়ি থেকে কথা বলছি। জটিলেশ্বর এখন আমাদের সামনে। তার একটা বয়ান মহিমবাবু পুলিশের দপ্তরে পাঠিয়ে দিতে পারেন রেকর্ড রাখার জন্যে–যদি তিনি মনে করেন! …তা মোদ্দা কথাটা হল, আপনি এর পর আর ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করবেন না বোধ হয়। বরং যে টাকাগুলো নিয়েছেন… ও কি মশাই ফোন ছেড়ে দিচ্ছেন যে! শুনুন– শুনুন।”
শেখর ওপাশে ফোন ছেড়ে দিল।
কিকিরা ফোন রেখে মহিমচন্দ্রকে বললেন, “স্যার, আপনি আপাতত নিশ্চিন্ত। শেখর আর আপনাকে জ্বালাবে না। তার তুরুপের তাস এখন আমাদের হাতে।” বলে কিকিরা হাসলেন।
২.৬ সোনার ঘড়ির খোঁজে
০১.
কিকিরা বাড়ি ফিরে দেখলেন, তারাপদরা বসে আছে।
“কতক্ষণ?”
“পনেরো-বিশ মিনিট। আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?”
“কাছেই।…কীরকম গরম পড়েছে দেখেছ?”
“হাওয়া খেতে বেরিয়েছিলেন?”
“কোথায় হাওয়া! গাছের পাতা পর্যন্ত নড়ছে না। …বসো তোমরা, চোখে-মুখে একটু জলের ঝাপটা দিয়ে আসি।” কিকিরা চলে গেলেন।
