মহিমচন্দ্র চুপ করে থাকলেন।
কিকিরা একটা চুরুট ধরিয়ে নিলেন। যেন সময় নিলেন কথা বলার। পরে বললেন, “জটা আপনার লোক, না, শেখরের?”
“আমার কারখানায় কাজ করে। লোক আমার।”
“না, না, তা বলছি না। বলছি, কার দলে সে? আপনার, না শেখরের?”
অল্পসময় চুপচাপ থাকার পর মহিমচন্দ্র বললেন, “এখন দেখছি, শেখরের। আগে এতটা বুঝিনি। মেজোবাবু মারা যাওয়ার পর থেকে সে যে শেখরের লোক হয়ে যাবে পুরোপুরি বুঝতে পারিনি।”
কিকিরা কথা পালটালেন, “জটার অ্যাকসিডেন্টের খবর আপনি আগে আমাদের বলেননি কেন?”
“বলার মতন কী ছিল রায়মশাই! কলকাতার রাস্তায় লোকে হোঁচট খেয়ে পড়বে, গাড়ির খোলা দরজায় হেলান দিতে গিয়ে রাস্তায় পড়ে যাবে–একে কি অ্যাসিডেন্ট বলে! আমি শুনেছিলাম, জটা দোকান থেকে পান কিনে মুখে পুরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল, আমাদের ভ্যানগাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে। সামনের চাকা হঠাৎ গড়িয়ে যায়। টাল সামলাতে না পেরে সে রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল। হাতে-পায়ে লেগেছিল সামান্য। ব্যস। একে অ্যাসিডেন্ট বলে?”
“ভ্যানটা ফিরিয়ে আনল কে?”
“কেন, শাঁটুল। শটুল তো ভ্যানেই থাকে। জটার হেল্পার। গাড়ি চালাতেও পারে। সে তো সঙ্গেই ছিল।”
“জটার কাছ থেকে আপনি কোনো খবর পাননি?”
“শুনেছিলাম, হাত-পা ছুঁড়ে গিয়ে খুব ব্যথা হয়েছে, একটা হাতের কব্জি মুচড়ে গিয়েছে। সে বাড়িতেই আছে।”
“তাকে দেখতে যাননি?”
“না।”
“আপনি তাকে দেখতে গেলেন না, অথচ শেখর তাকে নিয়ে নার্সিং হোমে ভর্তি করিয়ে দিল!”
“তাই তো শুনলাম আপনাদের মুখে। “
“তারপরও–।”
“না, আমি নার্সিং হোমে যাইনি। কেন যাব? জটার যদি অতবড় জখম হত, সে আমায় জানাতে পারত না লোক দিয়ে? আমি তাকে হাসপাতালে ঢুকিয়ে দিতে পারতাম না? না, বড় ডাক্তার দেখাতে পারতাম না! …রায়মশাই, একটা কথা বলি–মনে কিছু করবেন না। জটার এই নার্সিং হোমে যাওয়ার ব্যাপারটা প্ল্যান করে করা সাজানো।”
কিকিরা আর তারাপদ চোখ চাওয়াচাওয়ি করল।
কিকিরা বললেন, “কেমন করে বুঝলেন?”
“বুঝলাম। বুঝলাম, শেখর যখন এই কদিন আগে আবার আমায় বাড়িতে ফোন করে হঠাৎ হাজার পনেরো টাকা চাইল। বলল, জটার জন্যে দরকার। শেখর টাকা চেয়েছিল এ কথা আপনাকে আমি বলেছি।”
মাথা নেড়ে কিকিরা বললেন, “বলেছেন। আমিও শেখরকে স্পষ্ট বলে দিয়েছি, টাকা আর সে পাবে না।”
মহিমচন্দ্র বললেন, “শেখর ভয় পাওয়ার ছেলে নয়।”
“এবার পাবে।”
“কেমন করে?”
“ব্যবস্থা করেছি। আর খানিকক্ষণ অপেক্ষা করুন। দেখতেই পাবেন।”
.
ঘড়িতে আটটা বাজতে চলেছে, চন্দন এল। সঙ্গে জটিলেশ্বর।
জটিলেশ্বরকে দেখে মহিমচন্দ্র চমকে গেলেন। “এ কী, তুই?”।
জটিলেশ্বর একটিও কথা বলল না। তার পরনে পাজামা, গায়ে শার্ট। বাঁ হাতের কব্জির কাছে একটা ব্যান্ডেজ। তাকে দেখে মনে হল না, সে মাথায় চোট নিয়ে নার্সিং হোমে শুয়ে ছিল একদিন।
কিকিরা চন্দনকে বললেন, “সব ব্যবস্থা ঠিক-ঠিক হয়েছে?”
“হ্যাঁ। মনোজদা নার্সিং হোমকে যা-তা বলেছে। ওদিকে আবার মনোজদার বন্ধু লালবাজারে পুলিশের বড় অফিসার। লাহিড়ী সাহেব। ফোন তুলে নার্সিং হোমে ধমক মারতেই সব ঠাণ্ডা। নার্সিং হোমটা লোক লুকিয়ে রাখার জায়গা নয়। ওদের মালিকরা ঝামেলায় পড়ে গেছে। আমি জটিলেশ্বরকে নার্সিং হোম থেকে নিয়ে চলে এসেছি। অবশ্য খাতাপত্রে লেখাপড়া করে। জটিলেশ্বরও লিখে দিয়েছে, সে স্বেচ্ছায় নার্সিং হোম ছেড়ে চলে যাচ্ছে। তার কোনো কমপ্লেন আর নেই।”
জটিলেশ্বর একপাশে দাঁড়িয়ে থাকল মুখমাথা নিচু করে।
কিকিরা জটিলেশ্বরের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, “তোমায় আমি কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করব। ঠিক-ঠিক জবাব দেবে। কথা ঘোরাবে না, মিথ্যে কথা বলবে না।”
জটিলেশ্বর মুখ নিচু করেই দাঁড়িয়ে থাকল।
কিকিরা বললেন, “মেজোবাবু যেদিন মারা যান–সেদিন বিকেলের গোড়াতেই কারখানার ডেলিভারি ভ্যান আর মেজোবাবুকে নিয়ে তুমি বেরিয়ে যাও?”
“হ্যাঁ, স্যার।”
“সঙ্গে আর কে ছিল?”
“কেউ নয়।”
“কোথায় যাও?”
“আমাদের বড় দোকানে।”
“সেখানে কী হয়?”
“মেজোবাবু দোকানে যান। দোকানের লোক এসে গাড়ি থেকে কিছু জিনিস নামিয়ে নিয়ে যায়।”
“আরও জিনিস ছিল?”
“না বোধ হয়।”
“দোকানে কতক্ষণ ছিলেন মেজোবাবু?”
“বিশ-পঁচিশ মিনিট, বড়জোর আধঘণ্টা।”
“তারপর তোমরা কোথায় যাও?”
“ডেকার্স লেন-এ যেতে বলেন মেজোবাবু।”
“ডেকার্স লেন-এ কোথায়?”
“একটা বাড়িতে। পুরনো বাড়ি। পাশে ভাঙাচোরা গ্যারাজ।”
“কার কাছে?”
“আমি জানি না।”
“আগে কোনোদিন সেখানে যাওনি?”
“না স্যার।”
“সেখানে মেজোবাবু কতক্ষণ ছিলেন?”
“ওই আধঘণ্টা কি চল্লিশ মিনিট।”
“তারপর ফিরে এসে গাড়িতে বসলেন?”
“হাঁ, আমার পাশেই। আমাদের ভ্যানগাড়িতে সামনেই যা বাড়তি “একজন বসতে পারে। পেছনে বসার জায়গা নেই।”
“মেজোবাবু বসার পর–তোমরা চলে এলে?”
“না। যখন চলে আসছি তখন একটা লোক এসে একপাতা ওষুধ দিল, গোলাপি-গোলাপি দেখতে। মেজোবাবুর হাতে দিল। সেইসঙ্গে একটা ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ আর ছোট মতন এক ইঞ্জেকশনের শিশি–ওই যেগুলো ভেঙে ভেঙে ইঞ্জেকশন দেয়…। চন্দনবাবুকে আমি সব বলেছি স্যার।”
“তুমি নিজের চোখে দেখেছ?”
“হা স্যার।”
চন্দন একটু অপেক্ষা করতে বলল। তারপর পকেট থেকে নতুন একটা ডিসপোজাল সিরিঞ্জ, একটা ইঞ্জেকশনের অ্যাম্পুল, আর একপাতা নতুন ওষুধ বের করল।
