.
হোটেল থেকে বেরুবার আগে কিকিরা তারাপদকে বললেন, “তারা একবার অফিস-ঘর ঘুরে আসছি; তোমরা এগোও।”
তারাপদরা বাইরে এসে দাঁড়াল। রাস্তায়।
এই হোটেল-পাড়াটা নানা ধরনের মানুষের। আশেপাশের দোকানগুলোও যেন সাধারণ পাড়ার মতন নয়; কোথাও পাঞ্জাবি খানাপিনার দোকান, কোথাও চিনে ছেলেরা জটলা করছে, চা-শরবতের ব্যবস্থা, বেশ জাঁকালো পানের দোকান–এস্তার ঠাণ্ডিপানি আর পান বিক্রি হচ্ছে, কোথাও বা একনাগাড়ে রেকর্ড বাজছে হিন্দি গানের। এরই মধ্যে মামুলি এক ডিসপেনসারি, এমন কি, ফলের দোকানও।
এখন রাত নয়। সন্ধে শেষ হয়ে আসছে। দু-একটা সাধারণ দোকান বন্ধ হয়ে এল।
তারাপদ হঠাৎ বলল, “চাঁদু, কী বুঝছিস?”
চন্দন প্রথমে কোনো জবাব দিল না কথার, পরে বলল, “কী বুঝব! দুই-ই সমান।”
“মানে?”
“যেমন মহিমচন্দ্র, তেমনই শেখর। সেয়ানে-সেয়ানে কোলাকুলি আর
“যা বলেছিস! কিকিরা বড় প্যাঁচে পড়ে গেছেন।”
চন্দন কিছু বলার আগেই কিকিরা এসে পড়লেন।
“নাও, চলো।” কিকিরা বললেন।
তিনজনে হাঁটতে হাঁটতে খানিকটা এগিয়ে আসার পর তারাপদ বলল, “স্যার, এর পর?”
কিকিরা অন্যমনস্ক ছিলেন। জবাব দিলেন না।
চন্দন বলল, “কিকিরা, আপনি বরং মহিমকে বলুন : পেটে কথা রেখে মুখে শেখরকে “ব্ল্যাকমেইলার বলে লাভ নেই। সাফসুফ কথা বলতে বলুন। মহিম যে নিজেও সাধুপুরুষ নয়- এ তো জানতেই পারলেন।”
তারাপদ বলল, “নিজেদের কোম্পানির জিনিস নিজেই টানত। ডেঞ্জারাস।”
কিকিরা কোনো জবাব দিলেন না।
হাঁটতে-হাঁটতে ট্রাম রাস্তা।
কিকিরা হঠাৎ বললেন, “চাঁদু, জটার অ্যাসিডেন্টটা কবে যেন হয়েছে?”
চন্দন নির্দিষ্ট করে দিনক্ষণ বলতে পারল না।
তারাপদ বলল, “এই তো গত হপ্তায়। আপনাকে না বললাম সেদিন।
“কাগজে সোনালি ল্যান্ড ডেভলাপমেন্টের নোটিসটা বেরুবার পর-পর। তাই না?”
“হ্যাঁ। “
“কোথায় যেন হয়েছে?”
চন্দন বলল, “বলছে তো মিশন রো-য়ে। তাই শুনেছি।”
“জটার বাড়ি কোথায়?”
“কলুটোলা।”
“যাঃ, কলুটোলা নয়-বউবাজার,” তারাপদ বলল।
কিকিরা মাথা নাড়লেন। সামান্য পরে বললেন, “মহিমচন্দ্র বড় অদ্ভুত মানুষ। জটার অ্যাকসিডেন্টের কথা নিয়ে মাথা ঘামাতে চাইলেন না সেদিন। আমি যখন বললাম, উনি শুধু বললেন—া, গাড়ির দরজা খুলে পড়ে গিয়েছিল শুনলাম। হাত-পায়ে খানিকটা চোট লেগেছে। … পরে যখন শুনলেন, ও নার্সিং হোমে আছে–তখন অবাক হয়ে বললেন, সে কী। কে ওকে নার্সিং হোমে ভরতি করল? আমি তো করিনি। তারপর যখন শুনলেন, শেখর জটাকে নার্সিং হোমে ঢুকিয়েছে, তখন কেমন নার্ভাস হয়ে গেলেন।” কিকিরা দাঁড়িয়ে পড়লেন। কী ভাবছিলেন কে জানে! শেষে আচমকা বললেন, “চাঁদু, জটাই আমাদের চাবিকাঠি। হ্যাঁ, জটা। … ওর দায়িত্ব তোমার। ওকে ছাড়বে না। যা সম্ভব সবই করবে।”
.
১০.
মহিমচন্দ্রকে বড় অসহায় দেখাচ্ছিল। তিনি কোনো কথাই যেন আর বলতে পারছেন না।
কিকিরারা আজ অনেকক্ষণ হল এসেছেন মহিমের বাড়িতে। তখন আর আলো নেই। সন্ধেও হয়নি পুরোপুরি। খানিকটা আগে কালবৈশাখীর ঝড়ের মতন ঘুর্ণি উঠেছিল। ঝড়ও হয়েছে এক দমকা। আকাশ মেঘলা; আবহাওয়াও গুমোট।
মহিমের বসার ঘরে অনেকক্ষণ ধরেই কথাবার্তা হচ্ছিল। কিকিরা আর তারাপদ সামনে বসে। চন্দন নেই।
কিকিরা বললেন, “শেখরের সব কথাই আপনাকে বলেছি। সে যা বলেছে, আপনি অস্বীকার করতে পারেন? শেখর যে ধরণীমোহনের নিজের ভাগ্নে নয়, এটা তো ঠিকই!”
মহিমচন্দ্র সামান্য মাথা নাড়লেন। হা।
“ধরণীমোহন তাকে কখনোই নিজের আত্মীয়-পরিজন বলে মেনে নিতে পারেননি, এটাও ঠিক!”
“হ্যাঁ।”
“শুধু দিদির জন্যে কাছে রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন?”
“শেখর নিজেও ভাল ছিল না। মেজোবাবুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারত না। বড় অ্যারোগান্ট ছিল।”
“সে অন্য কথা। তার স্বভাব।… এটাও আপনি স্বীকার করবেন যে, কোম্পানির জিনিস কারখানা থেকে সে বের করে নিত খাতাপত্রে না দেখিয়ে। মানে দোকানে জিনিস নিয়ে যাওয়ার সময় চুরি করত। আর আপনি তখন দোকানে বসতেন। চোরাই জিনিস বিক্রির টাকা দুজনে ভাগবাঁটরা করতেন।”
মহিমচন্দ্র মাথা নিচু করে নিলেন।
“আচ্ছা মহিমবাবু, আমি ধরে নিচ্ছি যে, অন্যায়টা আপনারা ভাগাভাগি করে করতেন। কিন্তু আপনি নিজেও যে-অন্যায় করতেন, সেই একই অন্যায় কাজ করার জন্যে যখন ধরণীবাবু শেখরকে পাঁচজনের সামনে অপমান করে তাড়ালেন–তখন একটা কথাও কেন বললেন না?”
ইতস্তত করে মহিমচন্দ্র বললেন, “বলে লাভ হত না। মেজোবাবু শেখরকে রাখতেন না।”
“আপনার দাদা তখন বেঁচে?”
“প্রাণে বেঁচে ছিলেন–তবে অসুস্থ। হার্টের রোগ ছিল। তিনি মারাও যান মাস কয়েক পরে।”
“তার মধ্যেই আপনি দোকান ছেড়ে কারখানায় চলে এসেছেন।”
“এসেছি। “
“জটা-জটিলেশ্বরকে তা হলে কে বাঁচাল? আপনি, না আপনার দাদা?”
“জটা মেজোবাবুর হাতে-পায়ে ধরেছিল। আর
“আপনিও বলেছিলেন, তাই তো?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“জটার অবস্থা ভাল নয়। চাকরি গেলে…”।
কিকিরা একটু বাঁকা করে হাসলেন, “তা ঠিক নয় মহিমবাবু! জটাকেও আপনারা দুজনে-শেখর আর আপনি চোরাই জিনিসের ভাগবাঁটরা থেকে টাকা দিতেন। দিতেন, কেননা সে শুধু ভ্যান নিয়ে দোকানে আসত না–আপনাদের চোরাই কাজে পার্টনার ছিল। …ওকে হাতে রাখায় আপনার লাভ হবে ভেবেছিলেন।”
