কিকিরা তারাপদ আর চন্দনের দিকে তাকালেন। তারাপদ কী মনে করে শেখরকে বলল, “ … আমরা শুনলাম, আপনি বরাবরই মামার অবাধ্য ছিলেন।”
শেখর অস্বীকার করল না। সহজভাবে ঘাড় হেলিয়ে বলল, “ছিলাম। উনি যেমন আমায় পছন্দ করতেন না, আমিও করতাম না। উনি তো মাকে অনেকবার বলেছিলেন–আমায় বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে। ওঁর কথা ছিল–এক গাছের ছাল অন্য গাছে লাগে না। মা আমায় ছাড়তে চাননি। মায়ের জন্যেই ওবাড়িতে থাকতে পারতাম।”
“আপনার নিজের বাবা-মা?” তারাপদ আবার বলল।
“ছেলেবেলা থেকেই কেউ ছিল না। মা মারা যায় অসুখে। বাবা আগুনে পুড়ে। বাবা কারখানায় কাজ করত। কারখানাতেই অ্যাসিডেন্ট হয়। আমি অনাথ হয়ে পড়ি। আমার কেউ ছিল না। ধরণীমামার বিধবা দিদি আমায় নিজের কাছে রেখে পালন করেন। উনি আমার স্ময়ের বন্ধু ছিলেন।”
কিকিরা কী ভেবে বললেন, “ধরণীবাবু আপনার জন্যে কিছুই করেননি–একথা তো ঠিক নয়। আপনাকে সাধ্যমতন ভাল করার চেষ্টা করেছেন। এমন কি, একসময়ে আপনাকে রঙ কারখানায় কাজে ঢুকিয়ে নিয়েছিলেন, যাতে আপনি কাজকর্মে মন দেন, নিজে দাঁড়াতে পারেন। তাই না?”
শেখর এবার ঠিক বিরক্ত হল না, বরং একটু হাসল। তারপর বলল, “মহিদাও ভাল কথা, মহিম রাহাকে আমি বরাবরই “মহিমা বলি। মামা বলি না। মহিমদার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কেমন ছিল একসময়–শুনবেন নাকি?”
“বলুন!”
“মহিমা তখনও রঙের দোকানে বসত–স্ট্র্যান্ড রোডে। বড়বাবু মারা গিয়েছেন। ধরণীমামা আমাকে রঙ কারখানায় নিয়ে এলেন। মায়ের জোরাজুরিতে। আমি রঙ কারখানায় এসে স্টোরে বসতাম। জিনিসপত্রের হিসেব রাখতাম। স্ট্র্যান্ড রোডের দোকানে জিনিস পৌঁছে দিতাম। মহিমদার সঙ্গে আমার গলাগলি হল খুব। দুজনে মিলে বুদ্ধি করে রঙের স্টক গোলমাল করতে শুরু করলাম। মহিদা রোজই কিছু কিছু জিনিস টানতে লাগল।
খাতায়পত্রে হিসেবে তার আঁচড়ও থাকল না। আমরা দুজনে সেই টানা জিনিসের টাকা পকেটে পুরতে লাগলাম।”
তারাপদ বে-খেয়ালে বলে উঠল, “চুরি! এ তো সেরেফ চুরি। নিজেদের জিনিস নিজেই চুরি!”
“আমি কী বলেছি চুরি নয়,” শেখর ঠাট্টার গলায় বলল, “পরের জিনিস চুরি করলে লোকে চোর বলে। নিজের জিনিস সরিয়ে দু পয়সা আড়ালে কামালে তাকে হাতখরচা বলে। … তা আমার বেলায় তিন-চারশো টাকা হাতে আসত মাঝে-মাঝেই। রঙের দামটাম জানেন! জানেন না। যাকগে, এই চুরি ধরা পড়ল। ধরণীমামা আমাকে জুতোপেটা করে তাড়িয়ে দিলেন কারখানা থেকে। মাথা কামিয়ে ঘোল ঢালতে পারেননি এই যা! অকথ্য গালমন্দ শুনতে হল। মহিমা কিন্তু সাধুপুরুষ বনে গেল। বলল, সে কিছু জানে না। চুরিচাপাটি যা করার, আমিই করেছি। আমি আর জটাদা। …”।
“জটাকেও তো চাকরি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন ধরণীবাবু!”
“হ্যাঁ। কেঁদেকেটে সে পার হয়ে গেল। আমি কান্নাকাটি করিনি–হাতেপায়েও ধরিনি, ফলে আমাকে জুতোপেটা খেয়ে কারখানা ছাড়তে হল, বাড়ি থেকেও তাড়িয়ে দিলেন মামা। … মা আর সহ্য করতে পারলেন না, নিজের ছেলের কাছে চা বাগানে চলে গেলেন।”
সামান্য চুপচাপ। কিকিরা কী যেন ভাবছিলেন।
শেখর বলল, “মহিমা তো কোম্পানির মালিক বড় মালিক–চোর হয়েও সে দিব্যি কারখানায় এসে ছোটবাবু হয়ে বসে পড়ল। আর আমি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। বেশ মজার ব্যাপার! তাই না! তখন থেকেই আমি মহিমাকে বলেছিলাম তোমায় আমি কিন্তু ছাড়ব না বলে রাখলাম।”
শেখর ঘরের একপাশে সরে গিয়ে জল খেল। সিগারেট ধরাল। বেপরোয়া ভঙ্গি।
কিকিরা বললেন, “তা হলে তো দেখছি, আপনিই রাগ মেটাতে, প্রতিহিংসা মেটাতে …”
কিকিরাকে কথা শেষ করতে দিল না শেখর। রুক্ষ গলায় বলল, “যা খুশি ভাবতে পারেন আপনারা! রাগ-প্রতিহিংসা তো থাকবেই। পাঁচজনের সামনে জুতো খাওয়ার আর গলাধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া অত সহজে ভোলা যায় না।
“কিন্তু ধরণীবাবু মারা যাওয়ার
“মারা যাওয়া–!” শেখর অদ্ভুত গলায় বলল, তার চোখ কুঁচকে উঠেছে।
চন্দন এতক্ষণ কোনো কথা বলেনি; চুপচাপ কথা শুনছিল। এবার বলল, “মারা যাওয়া সম্পর্কে আপনার দেখছি খুব আপত্তি”
“হ্যাঁ, খুবই আপত্তি!”
“কেন! ডাক্তারবাবু বলছেন, আচমকা হলেও ধরণীবাবুর মৃত্যু অস্বাভাবিক না। “
“আমি তা মনে করছি না।”
কিকিরা বললেন, “আপনি যে তা মনে করছেন না আমরা জানি। খবরের কাগজে আপনি সেটা বোঝাবারও চেষ্টা করেছেন। ওই লেখাটা তো আপনিই পাবার ব্যবস্থা করেছিলেন?”
“আমিই করেছি।”
“কেন? মহিমবাবুকে ভয় দেখিয়ে রাখার জন্যে! অন্য পাঁচজনের যাতে চোখে পড়ে–তার জন্যে?”
“যা মনে করেন আপনারা।”
“আমরা তো মনে করছি, ভয় দেখিয়ে আপনি টাকা রোজগারের ব্যবস্থা ভালই করে নিয়েছেন।”
“খাঁটি কথা,” শেখর মুখ টিপে হাসল।“আমার তো মশাই রঙের কারখানা নেই, বাড়ি নেই কলকাতায়, গাড়ি নেই, টাকা গচ্ছিত নেই ব্যাঙ্কে। ধরণী সেন আমায় দু পয়সা দিয়েও যাননি। … টাকা কার না দরকার। আমারও দরকার বইকি!”
চন্দন বলল, “তা বলে আপনি অনর্থক একজনকে ভয় দেখিয়ে টাকা রোজগার করবেন!”
“অনর্থক যদি হয় তবে সে ভয় পাচ্ছে কেন! যান না–তাকে গিয়ে বোঝান অনর্থক ভয় না করতে।”
কিকিরা এবার উঠে দাঁড়ালেন। ধীর গলায় বললেন, “শেখরবাবু, আপনি দাবার চালটা চেলেছেন আপনার মাথা খাঁটিয়ে। পালটা চালের কথা ভাবেননি। … আচ্ছা, চলি। নমস্কার।”
