ঘটনাটা যেমন আকস্মিক, তেমনই নাটকীয়।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কিকিরা বললেন, “চলো।”
প্রায় চুপচাপ খানিকটা এগিয়ে এসে কিকিরা চন্দনকে বললেন, “চাঁদু, জটিলেশ্বরের ইনজুরি কেমন?”
“সিরিয়াস নয়।”
“তবে যে বলছে ..”
“হাতে রেখে বলছে।”
“জটার এই অ্যাসিডেন্টের কথা মহিমচন্দ্র আমাকে বলেননি। চেপে গেছেন। আর একটা ব্যাপার দেখেছ? ঘটনাটা ঘটেছে মাত্র তিন-চার দিন আগে। মানে, মহিমের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের পর–”।
তারাপদ বলল, “স্যার, আপনার সোনালির নোটিশ যেদিন কাগজে ছাপা হল, সেই দিনই বোধ হয়।”
কিকিরা চুপ করে থাকলেন।
চন্দন বলল, “এই নার্সিং হোমে আমার নিজের জানা চেনা তেমন কোনো ডাক্তার নেই। তবে মনোজদা এখানে কেস নেয়। মনোজদার পেশেন্ট থাকে। তাকে বলে নার্সিং হোমে ঢুকেছি। দু-একজনের সঙ্গে আলাপ জমাবার চেষ্টা করছি। ডাক্তারে-ডাক্তারে চট করে ভাব হয়ে যায়, জানেন তো! আপনি ভাববেন না, এদিকটা আমি ম্যানেজ করব!”
কিকিরা একটা চুরুট ধরাবার জন্য দাঁড়ালেন। তারপর হাঁটতে লাগলেন। বললেন, “জটার হল অ্যাসিডেন্ট, আর তাকে নার্সিং হোমে ঢুকিয়ে দিল শেখর। ব্যাপারটা মন্দ নয়।”
তারাপদ বলল, “তা এখন কী করবেন আপনি?”
“কী করব! কেন, শেখর তো বলেছে সে ভদ্রলোক। এক কথার মানুষ সে। তার হোটেলে গিয়ে কথা বলতে বলেছে–অবশ্য যদি আমরা কথা বলতে চাই। … তা যাব বইকি! শেখরের হোটেলেই যাব। দেখা যাক কী হয়!”
.
০৯.
দরজা খুলে দিল শেখর। দরজায় কিকিরা। দেখল কিকিরাকে।
“কী, ভেতরে আসব?”
“আসুন।”
“আমার সঙ্গীরাও আছে।”
“সঙ্গী! ডাকুন তাদের।”
কিকিরা তারাপদদের ডাকলেন।
দরজা বন্ধ করে দিল শেখর।
হোটেলের ছোট ঘর। মামুলি আসবাব। বিছানা ছাড়া বসবার চেয়ার দুটি মাত্র।
কিকিরা বললেন, “ভদ্রলোকের এক কথা, আপনিই বলেছিলেন। বলেছিলেন, দরকার থাকলে দেখা করতে পারি। কালই আসতাম, পারিনি। আজ এলাম।”
“বসুন।”
হোটেল-ঘরের বিছানাতেই বসলেন কিকিরা। তারাপদদের বসতে বললেন। ইশারায়। ওরা চেয়ারে বসল।
কিকিরা কিছু বলার আগেই শেখর বলল, “বলুন, কী বলতে চান?”
কিকিরা বললেন, “আপনি কাল মহিমবাবুকে ফোন করেছিলেন?”
শেখর দু মুহূর্ত দেখল কিকিরাকে। “হ্যাঁ।”
“আবার টাকা চেয়েছেন?”
“চাইতেও পারি। মহিম রাহা বলেছে আপনাকে!”
“টাকা তো আর পাবেন না।”
শেখর ভুরু কোঁচকাল। “পাব কি পাব না, আপনি কেমন করে জানলেন? রাহা আপনাকে পাঠিয়েছে?”
“হ্যাঁ বলতে পারেন, আবার নাও বলতে পারেন। আমি নিজে এসেছি। … আপনার তহবিলে তো অনেক টাকা জমা পড়েছে। আর কেনই
“আরও পড়বে। আসলের সঙ্গে মাঝে-মাঝে সুদ দিতে হয়। আপনাদের যখন লাগিয়েছে, তখন সুদ তো দিতেই হবে।”
কিকিরা দেখলেন শেখরকে। একটু হাসলেন। “কাউকে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করা অপরাধ, তা আপনি জানেন! যে-কোনো ধরনের ব্ল্যাকমেইলিং–ক্রিমিন্যাল অফেন্স!”
“জানি।”
“ব্যাপারটা পুলিশ পর্যন্ত গড়াতে পারে।”
“মহিম রাহা পুলিশের কাছে না গিয়ে আপনাদের পাঠাল কেন? তাকে বলুন না, পুলিশের কাছে যেতে।”
কিকিরা সামান্য অপেক্ষা করে বললেন, “অগত্যা তাই যেতে হবে। … আর পুলিশের কাছে গেলে আপনিই কি ছাড়া পাবেন, নানা জালে জড়িয়ে পড়বেন। “
“তাই নাকি! যেমন?” শেখর মুখ টিপে হাসল যেন।
“আপনি জানেন না বুঝি কোন-কোন জালে জড়াতে পারেন!” বলতে বলতে কিকিরা পকেট থেকে কী যেন বের করলেন। দেখালেন না। বললেন, “যদি বলি, ধরণীমোহন সেন–আপনার মামাকে–আপনি মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করেছিলেন।”
শেখর হঠাৎ চটে গেল। “না। আমি কোনো ষড়যন্ত্র করিনি। আর ধরণী সেন আমার মামাও নয়।”
কিকিরা কেমন থমকে গেলেন। তাকালেন তারাপদদের দিকে। তারাও অবাক হয়ে শেখরকে দেখছিল।
“মামা নয়! কী বলছেন! সবাই জানে আপনি ধরণীবাবুর ভাগ্নে।”
“সবাই কী জানল, তাতে আমার কী এসে-যায়! আমি ধরণী সেনের ভাগ্নে নই।”
“তবে আপনি কে?”
“ধরণী সেনের সঙ্গে আমার কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। আমি ওঁর দিদির নিজের ছেলে নই। পালিত পুত্র। ছেলেবেলা থেকেই। ওঁকে আমি “মা’ বলতাম। ধরণী সেনকে “মামা বলতাম ঠিকই। কিন্তু তাঁর কাছ থেকে আমি কোনোদিন ভাগ্নের মতন ব্যবহার, আলাদা কোনো স্নেহ-মমতা পাইনি। তিনি আমায় পছন্দ করতেন না।”
কিকিরা অবাক হয়ে গেলেন। তারাপদরাও যেন বোকার মতন শেখরের দিকে তাকিয়ে থাকল।
শেখরের চোখমুখের ভাব, তার স্পষ্ট ও শক্ত কথা বলার ধরন থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, সে মিথ্যে কথা বলছে না। তবু কিকিরা সামান্য সন্দিগ্ধ গলায় বললেন, “মহিমবাবু তো আমাদের এ-কথা বলেননি?”
“সে আপনারা জানেন। মহিম রাহা আপনাদের কানে কানে কী বলেছে-আপনারই বুঝবেন। আমি নয়।” শেখর কঠিনভাবেই বলল।
“ডাক্তার মুখার্জিও একবার বললেন না?”
“দরকার মনে করেননি। বা বলতে চাননি। ধরে আনুন না তাঁকে, দেখি তিনি কী বলেন? … আপনি ভাববেন না, ভদ্রলোক আমার ওপর সদয়। আমার ধরণীমামাটি যেমন বোঝাতেন, তিনি তেমনই বুঝতেন। কতার ইচ্ছেয় কর্ম!”
কিকিরা হঠাৎ বললেন, “আপনি শেখর গুহনিয়োগী নামে একটা চোরাই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রাখেন। তার কাগজ আমি ..”
“রাখি; ওই নামেই রাখি। ওটাই আমার আসল নাম ও পদবি। ধরণী সেনের নিজের ভাগ্নের পদবিও অবশ্য গুহ। আমি গুহনিয়োগী। আমার বাবা নিয়োগী ছিলেন। মা–যিনি আমায় পালন করেছেন–ধরণী সেনের বিধবা দিদি–তিনি নিজেদের গুহ পদবিটা বাড়তি লাগিয়ে দিয়েছিলেন। হয়তো মা ভাবতেন তাতে ভাল শোনাবে।”
