“নিউ সেন্ট্রাল হোটেলে?”
“হ্যাঁ, সেখানে যাব। ব্যাঙ্কে যাব। ব্যাঙ্কের কাগজটা বেশি কাজে লাগবে। বেনামা অ্যাকাউন্ট। সেখানে আবার কী ঠিকানা দিয়েছে কে জানে।”
“ফোনের নম্বরটা কার? ওর হোটেলের?”
“বুঝতে পারছি না।”
“মহিমচন্দ্রের নিশ্চয়ই নয়।”
“না। মহিমচন্দ্রের ফোন নম্বর টুকে রাখার কারণ নেই।” বলতে বলতে কিকিরা হঠাৎ চন্দনকে বললেন, “চাঁদু, এক কাজ করে। নিচে চলে যাও। বড় রাস্তায় দীননাথ স্টোর্স পাবে। ফোন আছে দোকানে। আমার নাম করে ফোন করতে চাইবে। টাকা নিতে চাইবে না ছোকরাগুলো। কল-চার্জ দিয়ে দিয়ে জোর করে। নাও, চলে যাও–এই নাও ফোন নম্বর। ধরবার চেষ্টা করে দেখোকার নামের ফোন। …নিচে একটা নম্বরও আছে বারো। কিসের নম্বর?”
চন্দন ফোন নম্বরের টুকরো কাগজ নিয়ে চলে গেল।
কিকিরারা অপেক্ষা করতে লাগলেন।
অন্তত দশ-পনেরো মিনিট পরে ফিরে এল চন্দন। কেমন যেন বিমূঢ়। বলল, “স্যার, এই ফোন তো নার্সিং হোমের। রিপন স্ট্রিটের নার্সিং হোেম। নার্সিং হোম শুনে আমি তাজ্জব! তারপর কী খেয়াল হল, বরো নম্বর আর শেখরের নাম বলতেই নার্সিং হোম থেকে বলল, “পেশেন্ট ঠিক আছে।”
কিকিরা আর তারাপদ মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন।
.
০৮.
গায়ে গা লেগে যাওয়ায় শেখর দাঁড়িয়ে পড়ল। তাকাল। সামান্য রুক্ষ চোখেই।
“স্যরি।”
“গায়ের ওপর এসে পড়ছেন যে!”
“এসে পড়িনি, ঠেলা খেয়ে গায়ে পড়ে গিয়েছি। নার্সিং হোমের বেরুবার জায়গাটা এত ন্যারো।”
“ঠিক আছে। “ শেখর পা বাড়াল।
“আপনার পেশেন্টের কত নম্বর ঘর?”
শেখর রাস্তায় নেমে দাঁড়াল। নার্সিং হোমে লোক ঢুকছে, বেরিয়ে আসছে। জায়গাটায় ভিড়। তাকাল পাশের লোকটার দিকে। “আপনার দরকার?”
“এমনি! আমারও এক পেশেন্ট আছে এখানে। আমি ডাক্তার।”
“ডাক্তার?”
চন্দন হাসল। তার স্টেথসকোপটা প্যান্টের পকেটে উঁকি দিচ্ছিল। গায়ে কোনো অ্যাপ্রন নেই।
চন্দন আলাপি গলায় বলল, “আমার ডিরেক্ট পেশেন্ট নয়। এক বন্ধুর পেশেন্ট। বলেছিল, একবার দেখে যেতে। কেসটা একটু সিরিয়াস। তবে ক্রাইসিস কেটে গিয়েছে অনেকটা।”
“ও! ভাল?”
“আপনার পেশেন্ট …?”
“গাড়ির ধাক্কা। মাথায় লেগেছিল।”
“মাথায়! তবে তো …”
“এখন অনেকটা ভাল।”
“গুড নিউজ!”
বলতে বলতে শেখর আরও খানিকটা ফাঁকায় আসতে পাশের ফুটপাথ থেকে কে যেন এগিয়ে এল। “গুড ইভনিং, স্যার।”
শেখর তাকাল। তাকিয়ে চমকে উঠল। সেই লোকটা। রায়।
কিকিরা আবার বললেন, “গুড ইভনিং স্যার।”
কথার জবাব দেবে না ভেবেছিল শেখর। তাকিয়ে চলে যাবে ভাবছিল, চোখে পড়ল আরও একজনকে-তারাপদকে।
শেখর বুঝতে পারল, পালিয়ে লাভ নেই, মুখোমুখি দাঁড়ালেই ভাল।
“কী দরকার আপনার?” শেখর বলল।
“আমায় চিনতে পারছেন না?”
“বেশ পারছি।”
“আপনি স্যার আমায় ভুল ঠিকানা দিলেন! সব ভুল!”
“আপনি নিজে কি আমাকে সত্যি কথাটা জানিয়েছেন। চালাকি করতে গিয়েছিলেন আমার সঙ্গে! সোনালি ল্যান্ড ডেভালাপমেন্ট …! নিজের ভাঁড়ার ঘরে বসে ল্যান্ড ডেভালাপমেন্ট …!”
“ভাঁড়ার ঘর বলছেন কী! ওটা আমার জাদুঘর। “
“জাদুঘর! মিথ্যেবাদী, ধাপ্পাবাজ! … শুনুন মশাই, বটতলার বই পড়ে ছিঁচকে গোয়েন্দা হওয়া যায়–আসলে মুখ মাথামোটারা আপনার মতন গোয়েন্দা হয়–ভাঁড়!”
“স্যার, আমি গোয়েন্দা নই। আমার বাপ-ঠাকুরদা কোনোকালে গোয়েন্দা ছিল না। বিলিভ মি।”
“আপনি কী?”
“কিকিরা। কিঙ্করকিশোর রায় থেকে কিকিরা। কিকিরা দি ম্যাজিশিয়ান।”
“তা বুঝতে পারছি। পকেটমার ম্যাজিশিয়ান।”
কিকিরা রাগ করলেন না; হাসতে হাসতে বললেন, “শুনুন শেখরবাবু, আপনার সঙ্গে আমাদের কোনো ব্যক্তিগত ঝগড়া নেই। আমরা যদি বসে বসে দুটো কথা বলতাম, ভাল হত। এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলা যায় না। চলুন না, কোথাও বসি। বড়জোর আধঘণ্টা।”
শেখর মাথা নাড়ল। “আপনি ওই মহিম লোকটার ভাড়া করা গোয়েন্দা!”
“কে বলেছে আপনাকে?”
“আমার লোক আছে। আপনারা দুজন হাওড়ায় রঙ কারখানায় গিয়েছিলেন। হেম পালিত লেনের বাড়িতেও আসা-যাওয়া করেন।”
তারাপদ অনেক আগেই কিকিরার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। চন্দন ঠিক শেখরের পেছনে।
কিকিরা বললেন, “কারখানার লোক আপনাকে জানিয়েছে?”
“জানাবার লোক আমার অনেক আছে।”
“আমি স্যার সত্যিই মুখ। তবে গোয়েন্দা নই। … এখন কথা হল–আপনি আমাদের সঙ্গে বসে কথা বলতে চান, না ওই নার্সিং হোমে যে পড়ে আছে, তার ভাল চান!”
“মানে।”
“আমি জটার কথা বলছি। জটিলেশ্বর” বলে চন্দনকে ইশারায় দেখালেন। “ও চন্দন। ডাক্তার। হাসপাতালে আছে। আমার শাগরেদ। .. একটা কথা আছে জানেন তো, দি ফ্ল্যাগ অব ধর্ম ফ্লাইজ উইথ দ্য উইন্ড। ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। কটাকে আমি পতাকা করে নিয়েছি। একটু থামলেন কিকিরা, মুচকি হাসলেন। “যাই বলুন, আপনার মানিব্যাগে পাওয়া টুকরো কাগজগুলো, ওই ফোন নম্বরটাও আমাদের ভীষণ কাজে লেগেছে।”
“বুঝেছি।”
“চন্দন ওই ফোন নম্বরে ফোন করতে ওরা রিপন স্ট্রিটের এই নার্সিং হোম থেকে সাড়া দিল। তারপর চন্দন থতমত খেয়ে আপনার নাম বলল, আর ফট করে বারো নম্বরটা বলে দিল। ব্যসসঙ্গে সঙ্গে জানা গেল ওই নার্সিং হোমে বারো নম্বর পেশেন্ট আপনার লোক। অন্তত চেনা লোক।”
শেখর বলল, “অনেকটাই এগিয়েছেন তা হলে! বাকিটাও এগিয়ে যান। যদি আটকে যান, আমার কাছে আসবেন। আমার হোটেলে। আসল হোটেলে। তবে জানবেন, জটাদার যদি কিছু হয়–সে আমি আপনার মক্কেলকে ছাড়ব না। আমি তাকে খুন করব, যদি দরকার হয়। … নিন, সরুন। ভদ্রলোকের এক কথা। কথা বলতে হয় আমার হোটেলে আসবেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আমায় ভয় দেখাবেন না।” শেখর কিকিরার পাশ কাটিয়ে চলে গেল।
