শেখর চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল। “ও নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। ওটা আমার ব্যাপার। “
কিকিরা কিছু বললেন না।
শেখর এবার উঠে পড়ল। “আপনি এগিয়ে যান, আমি আছি। আমার সঙ্গে দেখা করতে হলে শিয়ালদার মুন হোটেলে যাবেন। তেতলায় বাইশ নম্বর ঘর।”
“বাইশ নম্বর। .তা আপনি একদিন আসুন না স্যার। আমি একটু নাড়াচাড়া করে দেখি সব।”
“আমি আসব?”
“আসুন না?”
“কবে?”
“আসছে হপ্তায়। বুধবার।”
“ঠিক আছে।”
শেখর উঠে পড়ল।
কিকিরা তাকে এগিয়ে দিতে গেলেন।
সিঁড়িতে তারাপদর সঙ্গে দেখা।
তারাপদ কিছু বলবার আগেই কিকিরা বললেন, খানিকটা রাগের গলায়, “বাড়িভাড়া নিতে আসার এটা সময়, মশাই! সারাদিন করছিলেন কী? …ওপরে যান, আমি আসছি।”
তারাপদ দেখল শেখরকে। বুঝতে পারল। ফোটো দেখেছে।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল তারাপদ।
নিচে নেমে শেখর বলল, “আপনার বাড়িওয়ালা?”
“বাড়িওয়ালার কর্মচারী। এদিককার দু-তিনটে বাড়ির মালিক এক মুসলমান ভদ্রলোক। তাঁর অন্য কিছু ছোটখাটো কারবারও আছে। ছোকরা সেখানে কাজ করে।”
নিচে নেমে শেখর সামান্য দাঁড়িয়ে থাকার পর একটা ট্যাক্সি ধরল।
“আসি মশাই।”
“আসুন স্যার।”
“ওহো, ভাল কথা। আপনার ঘরে বোধ হয় আমি সিগারেটের প্যাকেটটা ফেলে এসেছি। খেয়ে নেবেন। “
কিকিরা আরও একটু হেসে বললেন, “আপনি বড় অন্যমনস্ক। পকেটের মানিব্যাগটাও পড়ে গিয়েছিল। এই নিন। নিয়ে যান।” কিকিরা ব্যাগ দিলেন শেখরকে।
.
কিকিরা ফিরে এসে দেখলেন, তারাপদ তার নিজের কোণের জায়গাটিতে বসে আরাম করে সিগারেট টানছে। চোখ প্রায় বোজা। সিগারেটের চেহারাটা লম্বা। বোঝাই যায়, শেখরের ফেলে যাওয়া প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরিয়ে নিয়েছে তারাপদ।
কিকিরাকে বেশ উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল। বললেন, “ হ্যালো, তারাবাবু! কী বলেছিলাম!”
তারাপদ কথার কোনো জবাব না দিয়ে বিলেতি সিগারেটের প্যাকেটটা এগিয়ে দিল।
“ফেলে গিয়েছে। শ্রীমান শেখর গুহ…!” কিকিরা বললেন।
“ফেলে গিয়েছে, না, আপনাকে দিয়ে গিয়েছে?”
“দিয়ে গিয়েছে! গিফট..!”
“উইথ এ নোট–টাকা নয় স্যার, শুধু একটা লাইন। প্যাকেটের মধ্যেই আছে।”
কিকিরা অবাক হলেন। “তাই নাকি? কই দেখি। প্যাকেটের মধ্যে রাংতার আলতো কাগজে লেখা : “চালাকি হইতে সাবধান। কাগজটা পাট করে গুঁজে দেওয়া। দেখলেন কিকিরা। অবাক হয়ে বললেন, “বাঃ, এ তো একেবারে বুনো ওল হে!”
“আপনাকে ভেলকি দেখিয়ে গেল।”
“তা ঠিক। গোড়া থেকেই কারবারের রকম-সকম জানে। তবে বাছাধন পালাতে পারবে না। কমিশন কেটে নিয়েছি।”
“আপনার কমিশন?”
“ওই আর কী! খরচা!”
“চমৎকার।”
“তারাবাবু, শেখর আমায় সাবধান করে দিয়ে গেছে। নিজেও ধরা পড়েছে। যে! ওর মানিব্যাগ থেকে যে আমিও কিছু উদ্ধার করেছি।”
তারাপদ তাকাল। “উদ্ধার করেছেন?”
“পকেট মেরেছি।”
“পকেট মেরেছেন?”
কিকিরার যেন কিছুই হয়নি, স্বাভাবিক ভাব করে শেখরের ফেলে যাওয়া প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে আঙুলে ঠুকতে লাগলেন। বললেন, “ব্যাপারটা কী হয়েছিল জানো! শেখর কথার মধ্যে এক গ্লাস জল খেতে চাইল। আমি উঠে গেলাম বগলাকে বলতে। নিজেই জল নিয়ে এলাম। এরই মধ্যে ও কাজটা সেরে রেখেছিল। আমি ওর পাঞ্জাবির পকেটে চকচকে ডট পেন দেখেছি। তবু বলব, ছোকরা বুদ্ধিমান। আমার ঘরে এসে আমায় বোকা বানিয়ে গেল! কিন্তু নিজেও যে কত বড় বোকা বনে গেছে–হোটেলে গিয়ে বুঝতে পারবে। আগেও পারতে পারে–মানিব্যাগ খুললে।”
তারাপদ বলল, “বুঝলাম না।”
কিকিরা জামর পকেট থেকে কয়েকটা টুকরো কাগজ আর একটা চাবির রিং বের করলেন। রিংয়ে দুটিমাত্র চাবি।
কাগজগুলো কিকিরা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে একবার দেখেছিলেন। এবার ভাল করে দেখলেন। বললেন, “একটা রসিদ। হোটেলের। এই কাগজটা ব্যাঙ্কের। খুচরো। স্লিপে টাকা জমা দিয়েছে। শেখরচন্দ্র গুহনিয়োগী’ নামে। বেনামী অ্যাকাউন্ট। বোধ হয়, অরিখ দেখে মনে হচ্ছে, মহিমচন্দ্রের কাছ থেকে শেষ টাকা নেওয়ার পর সেই টাকার কিছুটা গচ্ছিত রেখেছিল। আর তিন নম্বর কাগজটায় একটা ফোন নম্বর লেখা আছে। তলায় আবার লেখা বারো। কার ফোন নাম নেই।”
“চাবি দুটো?”
“বোধ হয় হোটেলের।” কিকিরা ভাল করে দেখলেন। বললেন, “আমায় ধাপ্পা দিয়ে বলে গেল শিয়ালদার মুন হোটেলের তেতলায় বাইশ নম্বর ঘরে থাকে। রসিদে দেখছি, এটা নিউ সেন্ট্রাল হোটেল। প্রিন্সেপ স্ট্রিট।”
তারাপদ হাসল। “আপনাকে তা হলে…!”
কথা শেষ হওয়ার আগেই চন্দনের গলা পাওয়া গেল।
চন্দন ঘরে আসতেই তারাপদ মজার গলায় বলল, “চাঁদু, কিকিরার সঙ্গে শেখরের মোলাকাত হয়ে গেছে। একটু আগে। শেখর একেবারে স্যারের কৃতিত্বে মুগ্ধ। বিলেতি সিগারেট প্রেজেন্ট করে গিয়েছে। খা। স্যারের কাছে।
তারাপদর রগুড়ে কথাবার্তায় কান দিলেন না কিকিরা। চন্দনকে বসতে বললেন। তারপর কী ঘটেছে বিকেলে, তার বৃত্তান্ত শোনাতে লাগলেন।
চা নিয়ে এসেছিল বগলা।
চা খেতে-খেতে বৃত্তান্ত শোনানো শেষ হল।
চন্দন বলল, “আপনার এত কষ্টের সোনলি তো তা হলে ডকে উঠে গেল কিকিরা। ধরা পড়ে গেলেন।”
কিকিরা মাথা দোলাতে-দোলাতে বললেন, “ধরা না দিলে ধরা যায় না অনেক সময়। শেখরকে যখন একবার খুঁজে পেয়েছি, তাকে কি আর পালাতে দেওয়া যায়! হয় ওকে ফিরে আসতে হবে এখানে, না হয় আমি যাব।”
