“মুখার্জির কাছে কেন গিয়েছিলেন?”
“বলেন কি, স্যার! এ কোশ্চেন অব ডেথ! কোম্পানির ফ্যাকড়া কত। শিওর হতে হবে একশো ভাগ। আপনি কপোরেশান থেকে মামার মৃত্যুর পর ডেথ সার্টিফিকেট নিয়েছেন?”
শেখর এবার ফাঁপরে পড়ে গেল। “না।”
“না কেন? এক বছর হয়ে গেল! এখনো ডেথ সার্টিফিকেট বের করতে পারলেন না।”
শেখর ইতস্তত করতে লাগল। “জানতাম না। মানে, সময় হয়ে ওঠেনি।”
“অবশ্য কপোরেশন থেকে কাজ বের করা কঠিন। ভীষণ সময় নেয়। কেউ কিস্যু করে না স্যার।… কিন্তু সার্টিফিকেটটা যে দরকার। লিগলি দরকার।”
শেখর কথা ঘোরাবার চেষ্টা করল। “সোনালি ল্যান্ড ডেভলাপমেন্ট এন্টারপ্রাইজের এই অফিস!”
“অফিস! অফিস কেন হবে! আমাদের মেইন অফিস দুর্গাপুরে, আসানসোলেও বড় অফিস আছে। দু-চার জায়গায় ছোটখাটো অফিসও করেছি। কলকাতায় স্যার আগে কিছু করিনি। ভাল জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। এখন জোকায় একটা নিজেদের জমি কিনেছি।”
শেখর বলল, “কলকাতা ছাড়া ব্যবসা হয়!”
“কলকাতায় স্যার আমাদের কে আর পুঁছবে! এখানে গণ্ডায়-গণ্ডায় প্রোমোটার। মফস্বলে আমাদের কাজকর্ম হয়। কলকাতার লোক এই দশবারো মাইল এলাকা ছাড়া বোঝে না। বাইরের লোক বোঝে। আর আমাদের মেইন কারবার তো বর্ধমান জেলা নিয়ে। কোম্পানিও নতুন বলতে পারেন।”
কিকিরা বুঝতে পারছিলেন শেখর তাঁকে সন্দেহ করছে। তাতে অবশ্য তিনি ঘাবড়ে যাচ্ছিলেন না।
“মামার এই সম্পত্তি নিয়ে এতদিন পরে আপনাদের কোম্পানি মাথা ঘামাচ্ছে! এক বছর পরে?”
কিকিরা হাসলেন। “স্যার ঠিক খোঁজখবর রাখেন না। মৃত মানুষের সম্পত্তির উত্তরাধিকার পেতে হলে এক বছর তো কিছুই নয়, দশ বছরও হতে পারে। আইনের অনেক মারপ্যাঁচ আছে। তা ছাড়া ধরণীবাবু কোথাও লিখে যাননি তাঁর মৃত্যুর পর কে-কে ওয়ারিশান হবে! উনি মারা গেছেন জানতেই আমাদের ছ-সাত মাস কেটে গেল। তারপর খোঁজখবর শুরু করতে গিয়ে এখান-ওখান। ডাক্তার মুখার্জি। …আরে মশাই, কাগজে ওই যে নোটিস–শ্রদ্ধাঞ্জলি ছাপা হল–তারপরই তো বেশি করে টনক নড়ল আমাদের।”
শেখর পকেট থেকে বিলেতি সিগারেটের প্যাকেট বের করল?”ও! ওটা আপনাদের চোখে পড়েছে?”
“পড়বে না! কতখানি জায়গা জুড়ে ছাপা হয়েছে। “সিগারেট খান?”
“দিন। আমি হলাম মিনি চুরুটের ভক্ত। গেঁয়ো লোক স্যার। মানকরে বাড়ি। কলকাতায় একটা আস্তানা রেখেছি নানান কাজ করতে হয় বলে। জ্যাক অব অল ট্রেড়স।”
শেখর লাইটার দিয়ে সিগারেট ধরিয়ে দিল। নিজেও ধরাল।
বগলাকে ডাকলেন কিকিরা।“কী হল চায়ের? ও বগলা?”
সাড়া দিল বগলা।
সিগারেট খেতে-খেতে কিকিরা বললেন, “এবার একটু কাজের কথা হোক।”
“হোক। …তার আগে আমায় একটু জল খাওয়ান যদি! যা গরম!”
কিকিরা বললেন, “সে কী স্যার! আনছি।” বলে নিজেই উঠে পড়লেন ওল আনতে।
ফিরে এলেন সামান্য পরে জল নিয়ে। এগিয়ে দিলেন জলের গ্লাস।
“আপনি আর আপনার দাদা মৃত ধরণীবাবুর সোনালি কোম্পানির জমিজমার ওয়ারিশান,” কিকিরা বললেন, “তাই না!”
“জমি তো মামার। আপনি সোনালি কোম্পানির নাম করছেন কেন?”
কিকিরা আগেভাগেই সব ভেবে রেখেছিলেন। বললেন, “অবশ্য, অবশ্য। ওমি আপনার মামার। কিন্তু একটা শর্ত যে ছিল, স্যার। জমি নেওয়ার সময় বাকি কিস্তি–সে প্রায় কিছুই নয়–পাঁচ-সাত হাজার টাকা শোধ করে দিতে হবে। তারপর দলিল রেজিস্টারি হবে।”
শেখর তাকাল। “ও! তাই!”
“এখন স্যার তিনটে কাজ আপনাকে করতে হবে। মানে আপনাদের। কপোরেশান থেকে ডেথ সার্টিফিকেটটা জোগাড় করুন, বাকি কিস্তিটা দিয়ে দিন, আর আইন মোতাবেক একটা চিঠি দিন আপনারা ব্যস!”
বগলা চা আর মিষ্টি এনে দিল।
“এ-সব আবার কেন?” শেখর বলল।
“কিছু না। আপনি আমার ক্লায়েন্ট। আপনাদের জন্যেই আমরা।”
শেখর হঠাৎ বলল, “ক্লায়েন্টের জন্যে আপনি কী করেন?”
কিকিরা বুঝতে পারলেন। তিনিই টোপ দিয়েছেন যে! হেসে বললেন, “স্যার, অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।”
“ও তো বুঝলাম। এখানে অবস্থা…”
“ডেথ সার্টিফিকেট, উকিল–এ দুটো আমার হাতে ছাড়তে পারে?
“কত লাগবে?”
“সে আর কী বলব! হবে। কিন্তু আপনার দাদা
“বাদ দিতে পারেন না?”
“বা-দ! তা কেমন করে হয়! আইন বলে কথা!”
“রাখুন আইন। আইন মানেই বে-আইন। ..কেন, আমার মামা আমাকে একলা কিছু জমি-জায়গা দিয়ে যেতে পারে না?”
কিকিরা যেন ভাবতে-ভাবতে বললেন, “তা পারেন। তবে ওই পুরনো কাগজপত্রে একটু জাল-জালিয়াতি করতে হবে। মানে, দেখাতে হবে যে–আপনাকেই একমাত্র ওয়ারিশান করেছিলেন জমি-জায়গার।”
চা খেতে-খেতে শেখর বলল, “তাই করবেন।”
“স্যার, অনেক খরচ পড়ে যাবে।”
“আপত্তি নেই। আমি যদি মালিকানা সোনালিকেই বেচে দিই আপনারা তো নেবেন বলেছেন–তা হলে কত পেতে পারি?”
“বাজারদরই পাবেন। সামান্য কম। “
“কত পাব?”
“হিসেব করে বলতে হবে। আন্দাজ চল্লিশ, বেশি হলে পঁয়তাল্লিশ-পঞ্চাশ।”
“বেশ। আপনি পাঁচ পাবেন। …সব মিলিয়ে।”
কিকিরা এবার একটু হাসলেন। বললেন, “কম হয়ে যাচ্ছে। অনেক কাজ স্যার। …তার ওপর এই যে একটা ফ্যাকড়া বাঁধিয়ে রেখেছে।”
“কিসের ফ্যাকড়া?”
“পড়েননি? দেখেননি মন দিয়ে! রাহা কোম্পানির ওই ছাপানো লেখায় যে বলা আছে, মৃত্যুটা রহস্যময়। তার কোনো কিনারা আজ পর্যন্ত হল না। ধরুন, হঠাৎ করে কেউ যদি ওই প্রশ্নটা তোলে!”
