“ও আগে কী করত?”
“এই কাজই করত। কেন একথা জিজ্ঞেস করছেন?”
“করছি। জটার সঙ্গে শেখরের ভাব ছিল?”
মহিমচন্দ্র এবার কেমন চমকে গেলেন। তাকিয়ে থাকলেন। কিছুই আন্দাজ করতে পারছিলেন না।
কিকিরা বললেন, “সেদিন ওই ডেলিভারি ভ্যানে ধরণীবাবু অফিস ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। জটা সেদিন গাড়ির ড্রাইভার ছিল।”
মহিমচন্দ্র বললেন, “রায়মশাই, মেজোবাবু জোর করে জটাকে নিয়ে ডেলিভারি ভ্যানে বাড়ি যাওয়ার জন্যে বেরিয়ে পড়লেন। বললেন, ফেরার পথে কোনো কাজ আছে, সেরে ফিরবেন।”
“কী কাজ আপনি জানতেন না?”
“না।”
“আপনাকে বলেননি?”
“না।”
“পরে, যখন ওইরকম একটা ঘটনা ঘটে গেল–আপনি কিছু জানতে চাননি?”
“পরে চেয়েছিলাম।.. জটা বলল, গাড়িতে সামান্য জিনিস ছিল–স্ট্র্যান্ড রোডের দোকানে নামিয়ে দেওয়ার পর মেজোবাবু বললেন, একবার ডেকার্স লেনে যেতে। সেখানে আধঘণ্টা মতন ছিলেন। তারপর বাড়ি যান।”
“ডেকার্স লেনে কে থাকে?”
“আমি জানি না।”
“আন্দাজও করতে পারেন না?”
“না।”
চন্দন হঠাৎ বলল, “অত শরীর খারাপ সত্ত্বেও ডেকার্স লেনে গেলেন!”
“তাই গিয়েছিলেন।”
“তখনো শরীর খারাপ লাগছিল, না, একটু ভাল মনে করছিলেন?”
“কেমন করে বলব?”
“জটা কী বলল?”
“জটা বলল, তখনকার মতন একটু ভাল।”
“ও!” চন্দন এবার কথা ঘুরিয়ে নিল। “মহিমবাবু, একটা সাধারণ কথা জিজ্ঞেস করছি।”
মহিমচন্দ্র তাকালেন।
চন্দন বলল, “ধরণীবাবুর শুনলাম ওষুধ খাওয়ার খুব বাতিক ছিল। হরদম অ্যান্টাসিড ট্যাবলেট আর মাথা-ধরার বড়ি খেতেন। এই বাতি নিশ্চয় অনেকদিনের?”
“হ্যাঁ। তবে ইদানীং বেড়ে গিয়েছিল।”
“কতদিন?”
“তা দু-তিন বছর।”
“কোন ওষুধ খেতেন বলতে পারেন?”
“বলা মুশকিল। খেয়াল মতন খেতেন। যখন যেটা বাজারে উঠত বা কেউ বলত-সঙ্গে-সঙ্গে সেটা কিনে এনে খেতে শুরু করতেন। আবার কদিন পরে ছেড়ে দিতেন। পাগলামি।”
“এরকম অভ্যেস অনেকের থাকে। নিজেরাই ডাক্তার।… আপনি কি জানেন, সেদিন উনি কোন ওষুধ খাচ্ছিলেন?”
“না মশাই, জানি না।”
“মনে করতে পারেন?”
“না।” মহিম মাথা নাড়লেন। “মেজোবাবুর টেবিলে ওষুধের পাতা স্ট্রিপ পড়ে থাকতে দেখেছি। ওই যে আজকাল যেমন পাওয়া যায়–একদিকে প্লাস্টিক অন্যদিকে রাংতা বা কাগজ–ওই ধরনের।”
চন্দন চুপ করে গেল।
মহিমচন্দ্ৰই হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, সন্দেহের গলায়, “আপনি এসব কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন? ওষুধের সঙ্গে কী সম্পর্ক?”
চন্দন মাথা নাড়ল। সতর্ক হয়ে গেল। বলল, “না–এমনি জিজ্ঞেস করছি। ওষুধ মানেই যে সবসময় ভাল, তা তো নয়। খারাপও হয়ে যায়। ধরণীবাবু যেভাবে আচমকা মারা গেলেন..” কথাটা আর শেষ করল না চন্দন।
মহিমচন্দ্র আর অপেক্ষা করলেন না। বরং হঠাৎ একটু ব্যস্ততা দেখিয়ে কিকিরাকে বললেন, “আমি চলি রায়মশাই।”
“আসুন। তারাপদ আপনাকে গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিক।”
তারাপদ উঠে পড়েছিল।
পা বাড়িয়ে মহিমচন্দ্র কিকিরাকে বললেন, “আপনি শেখরকে হাজির করতে পারবেন কি না আমি জানি না। যদি পারেন, খুব সাবধান! শেখর যত চালাক, তত নিষ্ঠুর। ওর কাছে ছোরা-ছুরি থাকে, হয়ত পিস্তলও। ওর সঙ্গে সাবধানে কথা বলবেন। নজর রাখবেন।”
কিকিরা একটু হেসে বললেন, “মহিমবাবু, আমি তো আদতে ম্যাজিশিয়ান। পিস্তল, ছোরা-ছুরি দেখলে ম্যানড্রেকের মতন ভেলকি দেখিয়ে দেব।”
.
০৭.
তিন-চারদিন পরে এক বিকেলে বগলা এসে বলল, একটি ছেলে দেখা করতে এসেছে।
কিকিরা ঘড়ি দেখলেন। সোয়া পাঁচ। সাড়ে পাঁচ কিংবা পৌনে ছয়ের আগে তারাপদ আসতে পারবে না। তারাপদ বা চন্দন একজন কাউকে দরকার হতে পারে বলে তিনি সেইরকমই ব্যবস্থা করেছেন। জানে যে এসেছে সে যদি শেখর হয়–তবে শেখর চলে যাওয়ার পর তাকে ফলো করতে হবে। লোকটার পাত্তা জানা দরকার কিকিরার।
কিকিরা একটু গুছিয়ে নিলেন নিজেকে, তারপর বললেন, “কেমন ছেলে? চোখে চশমা আছে?”
“আছে।”
“ত্রিশ-বত্রিশ বয়েস?”
“তা হবে।”
“ডাকো।… চা করবে আমাদের জন্যে…।”
বগলা চলে গেল। একটু পরেই ঘরে এল শেখর।
কিকিরা চিনে নিতে পারলেন। ফোটো দেখেছেন। পরনে পাজামা, গায়ে ঝুলওয়ালা রঙিন পাঞ্জাবি। পোশাক পরিচ্ছন্ন। দেখতে বেশ ভালই শেখরকে। মাথার চুল কোঁকড়ানো। গায়ের রং ফর্সা। চিনে নেওয়া সত্ত্বেও কিকিরা অবাক হওয়ার ভান করে তাকিয়ে থাকলেন শেখরের দিকে।
শেখর ঘরে ঢুকে কেমন সন্দিগ্ধভাবে কিকিরাকে দেখতে লাগল। ঘরটাও তাকে রীতিমতন অবাক করছিল।
কিকিরা নিজের পরিচয় দিলেন। “আমার নাম কিরকিশোর রায়। সোনালি ল্যান্ড ডেভলাপমেন্টের একজন এজেন্ট। কলকাতার। আপনি কি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন?”
“হ্যাঁ।”
“কাগজে নোটিস দেখে?”
“হ্যাঁ। আমার নাম শেখর গুহ।”
“শেখর গুহ! …ও! বসুন, বসুন। বসে পড়ন। আমার এই ঘর এইরকমই। ফেয়ারলি প্লেস…!” বলে নিজেই হাসতে লাগলেন।
“ফেয়ারলি প্লেস?”
“লোকে তাই বলে, সাজানো-গোছানো দেখে ঠাট্টা করে বলে। বলুক। নামে কী আসে-যায়!”
“আপনি আমার নামটা যেন শুনেছেন মনে হচ্ছে?” শেখর বলল।
কিকিরা হাসতে-হাসতে বললেন, “আমাদের জানতে হয়, স্যার। যে কাজ করি, সেটা বড় ভজকটো। …মানে, আমাকে ডাক্তার মুখার্জির কাছে যেতে হয়েছিল। তিনি তো ধরণীবাবুর ডাক্তার ছিলেন। শেষ সময়েও দেখেছেন। ডেথ সার্টিফিকেট লিখেছেন, তাই না! তিনি আপনাদের কথা বললেন।”
