কিকিরা হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিলেন মহিমের কাছ থেকে। হাসি-হাসি মুখ করে বললেন, “এ হল ফাঁদ। লোভের ফাঁদ পাতা ভুবনে! কোথায় কে ধরা পড়ে কে জানে! অলি ওয়ান স্টেপ স্যার, অ্যান্ড ইউ ফল। শেয়াল, কুকুর, হাতি, বাঘ, পাখি সব প্রাণীই ফাঁদে ধরা পড়ে। মানুষও।”
মহিমচন্দ্রের ঠিক পছন্দ হল না রসিকতাটা। গুরুগম্ভীর ব্যাপারের মধ্যে হাসি-তামাশার কী আছে! বিরক্ত মুখে বললেন, “একে আপনি ফাঁদ বলছেন! আমি কিছু বুঝলাম না।”
কিকিরা হালকাভাবেই বললেন, “বুঝলেন না কেন, মশাই। জলের মতন সোজা ব্যাপার। শেখরের কোনো একটা ফাঁদে-আপনি পা জড়িয়ে ফেলেছেন। দিস ইজ অ্যানাদার ফাঁদ। সোনালি ফাঁদ, সোনালি ল্যান্ড ডেভলাপমেন্ট এন্টারপ্রাইজের খাতায় ধরণীমোহন সেনের নামে বিঘে দুই বসতবাটিকাম-কমার্শিয়াল প্লট কেনা আছে, আর আছে পাঁচ একর ধানী জমি। জায়গাটা বর্ধমানে। দুর্গাপুর থেকে তিরিশ কিলোমিটার মাত্র। সোনালি ডেভালাপমেন্ট জানতে পেরেছে ক্রেতা ধরণীমোহন মৃত। এখন তাঁর জীবিত ওয়ারিশানরা হয় আইনসঙ্গত প্রমাণ দিয়ে জমিটা নিয়ে নিন নিজেদের হাতে, না হয় এখনকার বাজারদরে সোনালি ডেভালাপমেন্ট এন্টারপ্রাইজকে বেচে দিক।… এই তো ব্যাপার মশাই। ভেরি ইজি।”
মহিমচন্দ্র বললেন, “মেজোবাবু এরকম কোনো জমি-জায়গা কেনেননি।”
“কেনেননি তো বয়েই গেল! কিন্তু এখন কিনেছেন, ১৩৮৬ সনে।”
“কী যে বলছেন আপনি!”
“আমি ঠিকই বলছি। সোনালি কোম্পানির তরফ থেকে এই সাধারণ নোটিসটা পরশু কলকাতার তিনটে বাংলা পত্রিকায় বেরুবে। মনে রাখবেন, সলিসিটার বা আইন-মোতাবেক নোটিস নয়। কোম্পানির সাধারণ নোটিস। বলতে পারেন এজেন্টের নোটিস বা খোঁজখবর।”
“তারপর?”
“তারপর নোটিসেই বলা থাকবে, ওয়ারিশানরা যেন অবিলম্বে সোনালি কোম্পানির কলকাতার অন্যতম এজেন্ট কিঙ্করকিশোর রায়ের সঙ্গে বিকেল চারটে থেকে ছ’টার মধ্যে তাঁর বাড়িতে দেখা করেন। দেখা করে কথা বলেন। তিনি পরবর্তী আইনের ব্যাপারগুলো বুঝিয়ে দেবেন।”
মহিমচন্দ্র মাথা নাড়তে লাগলেন। “এ আপনার ছেলেমানুষি বুদ্ধি।”
“এই বুদ্ধি করেই ধরণীবাবুর ডাক্তারের সঙ্গে আমি আলাপ করেছি। কথাবার্তা বলেছি। শেখর খোঁজ নিলেই সেটা জানতে পারবে।”
“কিন্তু সে খোঁজ নেবে কেন? তা ছাড়া সে জানে, মামা তাকে কিছু দিয়ে যাওয়ার মানুষ ছিলেন না। “।
“হ্যাঁ। কিন্তু সেসব হল জানা ব্যাপার। ধরণীবাবু বেঁচে থাকার সময়। কিন্তু তাঁর হঠাৎ মৃত্যুর পর এই সম্পত্তির ভাগীদার সে তত হতে পারে আইনত। শেখর লোভী। সে একবার কি ব্যাপারটা দেখতে চাইবে না!… কী তারাপদ, তোমার কী মনে হয়?”।
তারাপদ একটু ভেবে বলল, “রিস্ক নিতেই পারে। দেখতে পারে, সত্যি তার মামার এমন কোনো সম্পত্তি আছে কি না? থাকলে সে অনায়াসে তার দাবি জানাতে পারে।”
চন্দন বলল, “কিকিরা স্যার, আপনি একটু কারেকশান করুন বরং। ওয়ারিশানদের নাম দিয়ে দিন। লাইফ ইনসিওরেন্সে যেমন নমিনি দের নাম থাকে–সেইরকম।”
কিকিরা মাথা নাড়লেন। “না। তা হবে না।”
মহিমচন্দ্র বললেন, “আপনি কি মনে করেন শেখর এই নোটিস পড়বে? পড়ে আপনার সঙ্গে এখানে দেখা করতে আসবে?”
“না আসতেও পারে। কিন্তু উপায় কী! শেখরের ঠিকানা যখন আপনি জানেন না–তখন তাকে আমি ধরব কেমন করে? আমার হাতে আর কোনো উপায় নেই। ধরে নিন, এ হল আন্দাজে ঢিল ছোঁড়া, লেগে গেলেও যেতে পারে।”
মহিমচন্দ্র বললেন, “শেখর কলকাতায় আছে আমি জানি। আমার কাছ থেকে সেদিনও সে টাকা নিয়েছে। তা ছাড়া কলকাতা ছাড়া আর যাওয়ার জায়গা আছে বলে আমি জানি না।
“কিন্তু বাড়ি? কোথায় থাকে সে?”
মহিমচন্দ্র যেন বাধ্য হয়েই বললেন, “রায়মশাই, আমি যখন আপনার হাতে সব তুলে দিয়েছি–তখন আর আপনার কাজে বাধা দেব না। যা ভাল বুঝবেন করবেন। তবে একটা কথা বলি, সোনালি না কী নাম বললেন কোম্পানির–সেই লোকের সঙ্গে দেখা করতে শেখর এবাড়িতে আসবে? এটা কী অফিস? এলেই তো সন্দেহ করবে?”
কিকিরা বললেন, “আমি সব ভেবেছি স্যার! একটা দু হাতের অফিস ভাড়া করে বসে থাকা আরও রিকি হবে। কার মুখে কী শুনবে কে জানে! তার চেয়ে এই ভাল। সে তো অফিসে আসছে না–এজেন্টের সঙ্গে দেখা করতে আসছে। লেখা আছে বাড়িতে যোগাযোগ করতে।”
“না-হয় এল! তারপর?”
কিকিরা হাসলেন। “একবার আসুক। যদি আসে তার পরের ভাবনা আপনাকে ভাবতে হবে না।” বলে তারাপদদের দেখালেন, “আমার দুই শাগরেদকে দেখছেন তো? বগলাও আছে।”
মহিমচন্দ্র আরও খানিকক্ষণ বসে উঠে পড়ছিলেন।
কিকিরা বললেন, “আপনার কিছু খরচপত্র লাগবে! এই বিজ্ঞাপনটা কাল তারাপদ কাগজের অফিসে-অফিসে দিয়ে আসবে। স্পেশ্যাল বিজ্ঞাপন। “
মহিমচন্দ্ৰ অ্যাটাচি খুলে টাকা বের করলেন। কী ভাবলেন যেন, তারপর দু-তিন হাজার টাকা এক থেকে বের করে এগিয়ে দিলেন।
“আমি উঠি?”
“আসুন।”
“তারা আপনাকে নিচে গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসুক।”
“না না, কী দরকার!”
“যাক না!… আচ্ছা মহিমবাবু, আপনার গাড়ি কে চালায়?”
“দুর্গা।”
“বিশ্বাসী!”
“বলেন কী! কবে থেকে গাড়ি চালাচ্ছে।”
“জটা বলে আপনাদের কোম্পানিতে এক ড্রাইভার আছে না?”
মহিমচন্দ্র অবাক হলেন। “হ্যাঁ। কেন?”
“সে ভ্যান চালায়?”
“চালায়। ডেলিভারি ভ্যান। রঙের ছোটবড় কৌটো ডেলিভারি দিতে যেতে হয় দোকানে। অন্য কাজও থাকে খুচররা। জটা শুধু ড্রাইভার নয়, বিল আদায়ও করে।”
